Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৫

বিভাজনের নয়া ফন্দি

সঞ্জীব দেবলস্কর
বিভাজনের নয়া ফন্দি

 
উত্তরপূর্বের রাজ্যে প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে, কাছাড়ের লক্ষীপুর মহকুমার ১৯টি গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে ডিমাহাসাও জেলার সঙ্গে যুক্ত করার । এর উপর আরেকটি আবদার, সঙ্গে চন্দ্রনাথপুর থেকে জিরিঘাট বাজার পর্যন্ত অঞ্চলের ৯৬টি গ্রামও পার্বত্য জেলার সঙ্গে দিয়ে দিতে হবে । এ প্রসঙ্গে, প্রাক্তন জঙ্গিদের সঙ্গে সরকারের একাংশের আঁতাতের কথাও সামনে আসছে । এ কোন ভারতবর্ষের চেহারা ! প্রস্তাবটি নিছক প্রশাসনিক পুনর্গঠনের প্রস্তাব নয়। বরং এটি ঔপনিবেশিক আমলের বিভাজন নীতির আধুনিক সংস্করণ ।
 
বহুকাল থেকে কাছাড়ে ডিমাসা ও বাঙালি সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ছিল সুসমন্বিত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ । বঙ্গভাষীদের সাহচর্যে কাছাড়ে ডিমাসা অধ্যুষিত অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেছে, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ প্রশস্ত হয় । মাইবং রাজসভা থেকে সমতলে ডিমাসা রাজত্ব সম্প্রসারিত করার প্রক্রিয়ায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। রাজসভার নথিপত্র, সনদ, প্রস্তরলিপি ও মুদ্রায় বাংলাভাষার ব্যবহার, এমনকি স্বয়ং রাজাদের বাংলায় রচিত শাক্তগীতি, বৈষ্ণবীয় পদ, রাসোৎসব গীতামৃত প্রমাণ করে এই সহযোগিতা এবং সহাবস্থানের ভিত্তি অতি দৃঢ় ।
 
আজ সেই অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে বিভেদের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া অতঙ্কের সৃষ্টি করছে । বিশেষত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি, এবং সঙ্গে মণিপুরি, রাজবংশী, খাসি, হিন্দিভাষীসহ অন্যান্যদের, প্রশাসনিকভাবে নিজ জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভিন্নতর ভূমি-আইনের অধীন পার্বত্য জেলার অন্তর্গত করার কথা সরকারের বিবেচনাধীন । এর অর্থ, বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে নিজ ভূমিতেই পরবাসী করে দেওয়া । এই সিদ্ধান্ত জনকল্যানমুখী রাষ্ট্রে একটি নিছক প্রশাসনিক নয়, গভীর রাজনৈতিক চক্রান্তও বটে ।
 

ভাষা আন্দোলনে ডিমাসা সহ নানা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে লক্ষীপুরের ঐক্যবদ্ধ রূপের প্রকাশ দেখেছি আমরা । কিন্তু এখন এই ঐতিহ্যের পরিপন্থী একতরফা সিদ্ধান্ত জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে । এতে  বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি হবে। বহু শতাব্দী ধরে বসবাসকারী বাঙালিসহ অন্যান্য সম্প্রদায় তাদের জমি ও অধিকার হারানোর আশঙ্কায় পড়বে । সামাজিক সৌহার্দ্যের ভাঙন ঘটবে, যার ফল হবে অশান্তি

 
অঞ্চলটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মনে করলেই স্পষ্ট হবে এ অযৌক্তিক প্রস্তাবের অন্তসারশূন্যতা । আঠারোশ শতকের পূর্ব থেকেই লক্ষীপুর অঞ্চলে বাঙালির বসতি, কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা ও অর্থনৈতিক জীবনকে সুসংহত রূপ দান করার অবদান ইতিহাস স্বীকৃত । ওই পর্ব থেকে বিশ শতকের দিকে এগিয়ে এলে দেখা যাবে এ ভূমির চেহারা পাল্টে গেছে । মানুষজনের মধ্যে জাতীয় চেতনার সঞ্চারও ঘটেছে ।
 
১৯২১ সালে গঙ্গাদয়াল দীক্ষিতের নেতৃত্বে এ এলাকার মানুষ স্বদেশী আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন । ইতিপূর্বে ১৯১৪ সালে বড়খলার রায়বাহাদুর বিপিনচন্দ্র দেবলস্কর, যিনি লক্ষীপুরের মৌজাদার এবং আসাম বিধান পরিষদের সদস্যও ছিলেন, তাঁরই উদ্যোগে অসমের গভর্নর এসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি ও অর্থদান করেন, আজও সেই আর্ল হাইস্কুল বহুভাষী অঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দিচ্ছে । বিপিনচন্দ্রের নামে লক্ষীপুরের একটি মধ্যবঙ্গ স্কুলও এর সাক্ষ বহন করছে ।
 

১৯৬০-এর ভাষা আন্দোলনে ডিমাসা সহ নানা জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে লক্ষীপুরের ঐক্যবদ্ধ রূপের প্রকাশ দেখেছি আমরা । কিন্তু এখন এই ঐতিহ্যের পরিপন্থী একতরফা সিদ্ধান্ত জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে । এতে প্রথমত, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, বহু শতাব্দী ধরে বসবাসকারী বাঙালিসহ অন্যান্য সম্প্রদায় তাদের জমি ও অধিকার হারানোর আশঙ্কায় পড়বে । তৃতীয়ত, সামাজিক সৌহার্দ্যের ভাঙন ঘটবে, যার ফল হবে অশান্তি ।
 
খবরে প্রকাশ, একটি গোষ্ঠী ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেছেন, যেখানে এই সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক ও ইতিহাসবিরোধী বলা হয়েছে । জনগণের দাবি, যা এখনও সুসংহত দাবির রূপ ধারণের অপেক্ষায় তা হল — ১. অবিলম্বে লক্ষীপুরের ১৯ এবং সঙ্গে কাছাড়ের আরো ৯৬ গ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা। ২. বাঙালি জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। ৩. নীতি প্রণয়নে স্থানীয় জনগণের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া ।
 

কাছাড়ের এক শিক্ষাবিদ, যিনি লিখেছেন, ‘ইতিহাসের আলোকে লক্ষীপুর মহকুমা’। বিনামূল্যে বই বিলি করেছেন হাতে হাতে, কিন্তু কেউ কি পৃষ্ঠা খুলে দেখেছেন ? অন্তত বইতে সংযোজিত ১৯২১-২২-এর অসহযোগ আন্দোলন, ১৯৩০ এর আইন অমান্য, ১৯৪২ সালে ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী,  প্রায় চল্লিশটি নামের তালিকাটি দেখলেই ঘুম ভেঙে যাবার কথা । আরেকটি তালিকায় অঞ্চলটিতে পাঠশালা থেকে ডিগ্রি কলেজ পর্যন্ত যে ৬৬টি তিলে তিলে গড়ে ওঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে, এর পেছনে কাদের স্বপ্ন, অর্থ, শ্রম ও ত্যাগ এটা বিবেচনায় না এনে আজ প্রধান হয়ে গেল কতিপয় বন্দুকধারী প্রাক্তন বিচ্ছিন্নতাকামীদের প্রস্তাব । যাদের প্রয়াসে লক্ষীপুর আজকের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, এদের উত্তরপুরুষদের অধিকারের কথা কি কেউ বলবে না ? শতাব্দীপ্রাচীন “খিলঞ্জিয়া” বাঙালি, মণিপুরি, ডিমাসা এবং অন্যান্যদের সঙ্গে দেশভাগের বলি উদ্বাস্তুদের মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই শান্ত, সমৃদ্ধ অঞ্চলটিকে আবার উদ্বাস্তু শিবির বানানোর কুটিল পরিকল্পনা কি কারো চোখে পড়বে না ?
 
আমাদের ব্রাত্যজনের এ ভাষাচার্য যে-হরিনগরে বসে গভীর মমতা দিয়ে মাতৃভাষার অভিধান লিখেছেন, তাঁর প্রিয় মাতৃভূমির পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলে তাঁর কষ্ট কি আর কারো বুকে বাজবে না ? এই প্রস্তাবিত সিদ্ধান্ত কার্যকরী হলে কেবল অঞ্চলটির মানচিত্রের পরিবর্তন নয়, এক ঐতিহাসিক অঞ্চলের জনগোষ্ঠী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হয়ে হবে ।
 
এ প্রস্তাব প্রত্যাহার না হলে কাছাড় তথা বরাকের জন্য এটি হবে ১৯৪৭-এর দেশভাগের মতোই আরেকটি বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সূচনা ।
 

♦–♦♦–♦♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!