- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মার্চ ২৯, ২০২৬
জুম-ইন করে দেখছি
অসমের বিধানসভা ভোটকে স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে দেখলেন বরাকের দুই উজ্জ্বল সংস্কৃতি কর্মী। তাঁদের একজন কৃতি কথা সাহিত্যিক, আরেকজন প্রতিশ্রুতিময় কবি। পড়ে দেখা দরকার, সমষ্টির পছন্দ আর অপছন্দ নিয়ে কী ভাবছেন ওঁরা।
‘এবার ভোটে জিতবে কে
‘অমুক’ ছাড়া আর কে…’
কিংবা
‘অমুক চিহ্ন দেখিয়া
ভোট দেও তাসিয়া….’
বড়াইল পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নেমে আসা নিথুয়া বাতাসে মিশে যাচ্ছে স্লোগান, হুল্লোড়। গঞ্জের চা-দোকানের নিয়ন আলোর নীচে ঘামে ভেজা গতর নিয়ে বসা মধ্যবয়সি মেহনতি মজদুর লোকের মুখে গরম চায়ের চুমুক আর ভোটের বিশ্লেষণ, তর্ক আর আলোচনা। তবে গঞ্জের এই আবহাওয়া উপত্যকার শহরাঞ্চলে তেমন একটা নেই। গণতন্ত্রের প্রাকৃতিকতা ও সাংস্কৃতিক দিক কিংবা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উৎসবমুখর হয়ে ওঠার প্রবণতা হারিয়ে গেছে আজকাল। চুনকামে দেওয়াল আর সফেদ হয় না। কবিগান হয় না। কাঁধে পার্টির ঝাণ্ডা নিয়ে যুবক ছেলেমেয়েরা হাঁটে না। বড়ো বড়ো হোর্ডিং লাগে ঠিকই। ব্যানার ঝুলে আর তাতে বড়ো বড়ো ফোটো করে দেওয়া হয় বাতাসের বিঘ্ন থেকে বাঁচাতে, যেভাবে উন্নয়ন ফোটো করে দেওয়া হয় বৃহত্তর গণতন্ত্রের স্বার্থে।
আমরা উপত্যকার মানুষ, আমরা আশায় বাঁচি। উপত্যকার মাটির ঘ্রাণ মেখে, বুধুরাইলের মলিন হওয়া বুকে ভরে, বরাক নদীর সুরমা হয়ে বয়ে যাওয়া জলে লাই খেলে, মাছ ধরে।”
আমার এক প্রিয়জন, বেবিদা মানে লেখাশ্রমিক অমিতাভ প্রহরাজ প্রায়ই বলতেন যেকোনো কিছু দেখতে হলে জুম-ইন, জুম-আউট করে দেখতে হয়। এই পরামর্শে যদি উপত্যকার নির্বাচনকে জুম-আউট করে দেখি তাতে তেমন হেলদোল দেখা যায় না। বরাকের শান্ত প্রকৃতির মতোই কোনো বিশেষ ঢেউ, জোয়ার-ভাটা, বিশেষ আকর্ষণ ছাড়াই চলছে এবারের নির্বাচন। নমিনেশন জমা পড়েছে। উপত্যকায় লড়াই এনডিএ বনাম মিত্রজোটেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে উন্নয়নের খসড়া ছাড়াই চলছে সব তোড়জোড়। দোষারোপ আর রাজনীতির আক্রমণ প্রতি-আক্রমণের বাইরে কারও হাতে ব্লুপ্রিন্ট নেই। শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি।
বড়ো বড়ো হোর্ডিং লাগে ঠিকই। ফ্লেক্স ব্যানার ঝুলে আর তাতে বড়ো বড়ো ফোটো করে দেওয়া হয় বাতাসের বিঘ্ন থেকে বাঁচাতে, যেভাবে উন্নয়ন ফোটো করে দেওয়া হয় বৃহত্তর গণতন্ত্রের স্বার্থে।
বরাক উপত্যকার ইতিহাসে চন্দ পরিবার, মহিতোষ পুরকায়স্থ, এফ এম গোলাম ওসমানী, মইনুল হক চৌধুরী, আব্দুল মুহিম মজুমদারের মতো বৌদ্ধিক রাজনীতিবিদের উত্থান হলেও বেশ ক-দশক এমন কোনো তাবড় রাজনেতার উত্থান ঘটেনি। নিঃসন্দেহ ক্ষতি, উপত্যকার মাটি আর মানুষের। যাইহোক, এবার জুম-ইন করে উপত্যকার নির্বাচনের দিকে যদি নজর রাখি, তাতে কিছুটা নড়াচড়া অনুভূত হবে। ‘টিকিট বঞ্চিত’ শাসকদলের নেতারা কোথাও পার্টি লাইনের ভেতরে আপোশ করছেন, কোথাও বিদ্রোহ। এরকম অবস্থায়, ভোটের মানচিত্রে অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে। ডিলিমিটেশনের করাল গ্রাস উপত্যকার দুটি আসন খেয়ে ফেলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও দুটি আসন ছেঁটে ফেলার জন্য উপত্যকার গুরুত্ব ক্যাবিনেটে কমবে। প্রভাবও কমবে বিধানসভায়। পুনর্বিবেচিত আসনগুলোতে অনেকাংশে জনগণতান্ত্রিক ভারসাম্য ভেঙেছে। এবারের ভোটে এরকম বৈষম্যের প্রতিফলন হতে পারে।
আমরা যারা লেখক, লেখাকর্মী, সাংস্কৃতিক জগতের সহযোগী, তাঁদের প্রায় সবাই চাই, নির্বাচিতরা সাংস্কৃতিক জগতের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন করবেন। সংস্কৃতি, সাহিত্য ও উপত্যকার ইতিহাস সংরক্ষণ আর সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ গঠনে বিশেষ প্রকল্প, সুপরিকল্পিত ভাবনা-চিন্তা প্রত্যাশা করি। আমরা উপত্যকার মানুষ, আমরা আশায় বাঁচি। উপত্যকার মাটির ঘ্রাণ মেখে, বুধুরাইলের মলিন হওয়া বুকে ভরে, বরাক নদীর সুরমা হয়ে বয়ে যাওয়া জলে লাই খেলে, মাছ ধরে। বাংলা ভাষা জবানে লালন করে আবহমান কাল জুড়ে ছুটছে আমাদের যাপন। আমাদের ভোট আমাদের ভাষা সংস্কৃতি আমাদের বিবেকস্পর্ধার প্রতিফলন হয়ে উঠুক।
❤ Support Us








