Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মার্চ ২৯, ২০২৬

বড়ো নির্মাণের স্থপতি

সঞ্জীব দেবলস্কর
বড়ো নির্মাণের স্থপতি

আমাদের এই ঈশান বাংলায় একটি ছোট্ট শূন্যের শহর আছে। সেখানে গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, আছে মরচে ধরা টিনের কুচি-লোহার টুকরো—যারা নরম ঘাসের আদর পেতে পেতে সুখে নিদ্রা যায়।

এরকম এক আধা-বস্তি এলাকায়, ছারপোকার আঁচড় এড়িয়ে, একজন কারিগর সারাটা জীবন কাটিয়ে গেলেন। রেখে গেলেন কলমের আঁচড় লাগা দিস্তা দিস্তা কাগজের স্তূপ; কোনো গোপন তোরঙ্গের ভেতর হয়তো কিছু অপ্রকাশিত গল্পের পাণ্ডুলিপিও। অস্থায়ী বারান্দায় বিরক্তির গন্ধমাখা উষ্ণ হাওয়া—হ্যাঁ, অম্বুবাচীর গন্ধও এসে ছড়িয়ে আছে তাতে, এ হাওয়ার আদর গায়ে মেখে সম্প্রতি বিদায় নিয়েছেন, চলে গেলেন শূন্যতায়।

মোকামের পোড়া ইটরঙ ছড়ানো গলিপথে চার-পাঁচ দিন আগের রঙ্গহোরির স্বাক্ষর—ফ্যাকাসে আবির, পথচারির মোবাইল থেকে ভেসে আসা এক কলি উর্দু শের, দু-একখানা পরিত্যক্ত চটির লাশ আর চোখের সামনে ভ্রুকুটি করা এক উদ্যত প্রাসাদ—‘রিভারভিউ এনক্লেভ’।

এক জোড়া শালিখের নীরব রগড় জানিয়ে দেয়—এই গেরামের মহারাজা আপাতত নেই। তিনি বোধহয় বরাকের জলস্রোতের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পুবের কোণা-মোহনপুর-মেনিপুর পেরিয়ে দিকশূন্যপুরের দিকে সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছেন। অনেক দিন আগে সেই লোকটির সঙ্গে তাঁর কিছু কথা বলা বাকি ছিল —যে লোকটি হাটে হাটে মধু ফিরি করে; বুকে তার দীর্ঘশ্বাস, এমনি করে সংসার চলতে পারে না। তবু লোকটির ভয় শুধু নিঃসঙ্গতাকে। সন্ধ্যার আকাশে ফুটে ওঠা একটি- মাত্র তারা দেখে তার পা আটকে যায়—আরেকটি তারা না দেখা পর্যন্ত সে দাঁড়িয়েই থাকবে।

আমাদের এই প্রক্ষিপ্ত মেগাপোলিসের ছত্রছায়ায় বস্তি-শহরের গলি পেরিয়েই যে একটি গোপন স্বর্গ আছে—যেখানে তুলসীতলার বিন্দু বিন্দু জলের ধারা হয়ে ওঠে বিশাল সৃজন উপলক্ষ—কে জানত! এমনই এক আশ্চর্য জগতের বাসিন্দা ছিলেন কথাকার শেখর দাশ।

আকবর বাদশার সঙ্গে কিনু গোয়ালার গলির বাসিন্দা হরিপদবাবুর মিল দেখেছিলেন কবিসম্রাট। আমাদের এই রিভার ভিউ এর মহারাজকে কার পাশে দাঁড় করানো যায় ? বরাকের আবর্জনা-বাহিত ঘোলাটে জলের তীরে বসে তিনি রচনা করেন তাঁর নিজস্ব স্বর্গ। এখানে ব্রাত্যজনের প্যালেসের বেডরুমের পাশে দুই ইটের উপর পা দিয়ে রাজকীয় প্রবেশ- প্রস্থানের সুব্যবস্থা। যে মহারাজ তাঁর অকিঞ্চিৎকর সঞ্চয় ভেঙে আস্ত একখানা আকাশযান ভাড়া করে জীবনসঙ্গিনীকে নিয়ে শূন্যে উড়ে যেতে পারেন—তাঁর তুলনায় তাজমহলের নির্মাতা বাদশাহ শাজাহান আর কতখানিই বা বড় হতে পারেন ? কোনও এক গল্পে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উপদেশ দিয়েছিলেন —“রোজ রোজ স্বপ্ন দেখা ভালো নয়।” শেখর দাশ তো নিত্য-নৈমিত্তিক স্বপ্নের চেয়েও বড় স্বপ্নকে হাতের মুঠোয় দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলেছেন।

তাঁর গল্পে ছড়িয়ে আছে কবিতা পাঠের এক অদ্ভুত আমেজ। তাঁর বাসস্থানের ব্যাকগ্রাউন্ডে চতুর বিড়ালের মতো ঘাপটি মেরে বসে থাকে আস্তো একখানা বড়াইল পাহাড়। এই শহরকে তাঁর কাছে অবাস্তব শহর বলে মনে হয়। এ তো এক অস্থায়ী ছাউনি। এখানে কেউ থাকার জন্য থাকে না; যারা আছে, তারা অগত্যা রয়েছে।

সাতের দশকে শেখর দাশ এ সংকেত পেয়েছিলেন—আজ আরও স্পষ্ট হল যা। স্থায়ী কর্মসংস্থান, গগনচুম্বী মাইনে, সামাজিক প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পরও বাবু-বিবিদের মন পড়ে থাকে, দূরবর্তী কোনও এক মহানগরীতে। সঞ্চিত ধন নিয়ে সেদিকে পাড়ি জমানোর টান তারা ছাড়তেই পারে না।

এদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে বুকে ছত্রিশ টানেলের ক্ষত নিয়ে বড়াইল পাহাড়। শেখর দাশের গল্পে এই ছাউনি-শহরের আরেক ভিন্ন ছবিও ফুটে ওঠে, অদ্ভুত কন্ট্রাস্টের ভেতর দিয়ে। কখনও প্রাণখোলা হাসির মতো প্রসারিত – ট্রাঙ্ক রোড, কখনও সময়ের সাক্ষী হয়ে পাঁচিল-ঘেরা মাঠের মধ্যে নিহত গান্ধীমেলার কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু একটা। সবকিছুকে পাশে রেখেই তাঁর পথ চলতে ভালো লাগত ।

কয়েকখানা উপন্যাস, শতাধিক গল্পের লেখক বাউণ্ডুলে শেখরদার বুকের ভিতর বাস করতেন এক মহারাজ। তিনি এই ঘিঞ্জি মোকাম রোডের মধ্যে কুড়িয়ে পেয়েছেন একটুকরো স্বর্গ যেখানে তিনি পেতেছিলেন তাঁর রাজকীয় সংসার- আমরা দেখে এসেছি। তবে তিনি রাজধানী ছেড়ে চলে যাবার পর–  এটা আরেক আক্ষেপ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!