- এই মুহূর্তে বৈষয়িক
- সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫
জিএসটি কমলেও নিত্যপণ্যের দামে আগুন! উৎসবের মুখে স্বস্তির আশা ফিকে, মূল্যবৃদ্ধির স্বীকৃতি খোদ কেন্দ্রীয় রিপোর্টে
নতুন জিএসটি কাঠামোর ঘোষণা যতই আশার আলো দেখাক, বাস্তব বাজার পরিস্থিতি সে আশার জল ঢেলে দিয়েছে। সরকার একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তুতে জিএসটি কমানোর মাধ্যমে জনসাধারণকে স্বস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারেরই প্রকাশিত রিপোর্টে উঠে এসেছে অন্য ছবি। রিপোর্টে উল্লেখ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আবার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এবং মূল্যবৃদ্ধির শুরুয়াৎ উৎসবের মরশুম শুরুর মুখেই।
গত সোমবার কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান দফতরের প্রকাশিত পাইকারি মূল্য সূচক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, আগাস্ট মাসে পাইকারি মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৫২ শতাংশে। অথচ কয়েক মাস ধরেই এই সূচক ছিল ঋণাত্মক। নয়া ঊর্ধ্বমুখী গতি স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলবে খুচরো বাজারে। অর্থাৎ, যা সাধারণ মানুষ সরাসরি টের পাবেন পকেটের টানেই। সরকারি রিপোর্ট বলছে, দাম বেড়েছে খাদ্যপণ্য, বস্ত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, পরিবহণের যন্ত্রাংশ, নন-মেটালিক খনিজ দ্রব্য সহ একাধিক পণ্যে। তালিকায় রয়েছে রান্নাঘরের প্রতিদিনকার খাদ্যসামগ্রী থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিন পণ্য পর্যন্ত। বিশ্লেষকদের মতে, এই দামবৃদ্ধি শুধুমাত্র বাজারি চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নয়, বরং সরাসরি উৎপাদন খরচ ও এমআরপি বৃদ্ধির ফল। যদিও সরকারি রিপোর্টে এমআরপি বাড়ার কথা সরাসরি বলা হয়নি, তবে পণ্য তালিকা দেখে বিশ্লেষকদের দাবি, এগুলি এমআরপি নির্ধারিত পণ্য, কেজি দরে বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। কাজেই এমআরপি না বাড়িয়ে এ ধরণের মূল্যবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হচ্ছে নতুন জিএসটি কাঠামো। নতুন কাঠামোয় অনেক নিত্যপণ্যের উপর জিএসটি হার কমানো হয়েছে। সরকারের বক্তব্য, এর ফলে দাম কমবে, এবং মানুষের উপর চাপ কিছুটা হালকা হবে। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি অনেক যোজন দূর। ঠিক যখন সাধারণ মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিলেন, তখনই এল মূল্যবৃদ্ধির রিপোর্ট। উৎসবের মরশুমে বাজার চাঙা হওয়ার কথা, কিন্তু উল্টে ভোক্তাদের কাঁধে বাড়তি চাপ চাপিয়ে দেনে দামের ঊর্ধ্বগতি। অনেকেই বলছেন, ‘জিএসটি কমলেও, দোকানে গিয়ে সে সুবিধা তো পাচ্ছি না। উল্টে চাল, ডাল, তেল সব কিছুর তো দাম প্রতিদিনই তো বেড়ে চলেছে।’ মাত্র এক মাস আগে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নীতি নির্ধারণ কমিটির বৈঠকে জানানো হয়েছিল, মূল্যবৃদ্ধির হার ৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু রেপো রেট কমানো হয়নি। অর্থনীতিবিদরা তখনই জানিয়েছিলেন, এটি সতর্কতা—কারণ মূল্যবৃদ্ধির গতি আবার উল্টে যেতে পারে। বাস্তবে ঠিক সেটাই ঘটেছে। পিডব্লিউসি ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বলছে, ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কেবল খাবারের বাজার করেই কোনওরকমে দিন চালাচ্ছেন। তাদের হাতে আর কিছু খরচ করার মতো অর্থ থাকছে না। এ অবস্থায় মূল্যবৃদ্ধি আরো প্রকট হওয়া মানেই জিএসটি হ্রাসের সুবিধাও অধরা হয়ে যাওয়া।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভ্যন্তরীণ কারণ নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও প্রভাব পড়ছে দেশের বাজারে। যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্কের কারণে টেক্সটাইল ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্যের রপ্তানি ধাক্কা খেয়েছে। আমেরিকায় চাহিদা কমে যাওয়ায় দেশীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতি পুষিয়ে নিচ্ছেন দেশীয় বাজারে দাম বাড়িয়ে। একই পরিস্থিতি রত্ন ও অলঙ্কারের ক্ষেত্রেও। সরকার অবশ্য দাবি করছে, জিএসটি হ্রাসের সুবিধা যেন ভোক্তারা পান, তার জন্য কড়া নজরদারি চলছে। ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে, জিএসটি কমলেও যেন পণ্যের দাম বাড়ানো না হয়। কিন্তু বাজারের হালচিত্র বলছে, সেসব নজরদারির সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন না। বরং অনেকক্ষেত্রেই ঠিক সেই সব পণ্যের দামই বাড়ছে, যেগুলির উপর জিএসটি কমানো হয়েছে। তাই একদিকে সরকার বলছে, জিএসটি হ্রাসে বাজেট সামলানো সহজ হবে। অন্যদিকে বাজারে দাম বাড়ছে। ফলত সাধারণ মানুষের স্বস্তির আশাতে আবার চিড় ধরছে। বিশেষত উৎসবের মরশুমে, যখন কিছুটা বাড়তি খরচ হয় পরিবারে, তখন মূল্যবৃদ্ধি আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এর মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টান্ত মাদার ডেয়ারির। জিএসটি সংস্কারের ফলে নিজের পণ্যের দাম কমাল সংস্থাটি, ফলে সস্তা হচ্ছে দুধ-ঘি-মাখন-আইসক্রিম। মাদার ডেয়ারি ঘোষণা করেছে, তারা ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে দুধ ও বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কমাচ্ছে। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, দুধ, পনির, মাখন, ঘি, মিল্কশেক ও আইসক্রিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবার অনেকটাই কমবে। উদাহরণস্বরূপ, ৫০০ গ্রাম মাখনের প্যাকেটের দাম ৩০৫ টাকা থেকে কমে ২৮৫ টাকা করা হয়েছে। বাটারস্কচ কন আইসক্রিমের দাম ৩৫ টাকা থেকে কমিয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছে। এক লিটার টোনড ইউএইচটি (UHT) টেট্রা প্যাক দুধের দাম ৭৭ টাকা থেকে কমে দাঁড়াচ্ছে ৭৫ টাকায়। যদিও রেগুলার পলিপ্যাক দুধের (যেমন ফুল ক্রিম, টোনড, গরুর দুধ ইত্যাদি) দামে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না, কারণ এই পণ্যগুলি আগে থেকেই জিএসটি মুক্ত ছিল। মাদার ডেয়ারি বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘প্রতিদিন ব্যবহৃত পলিপ্যাক দুধে কোনো পরিবর্তন আসবে না, কারণ এগুলি সবসময়ই জিএসটি মুক্ত।’ একইসঙ্গে আমূলও জানিয়েছে, তারা পাউচ দুধের দাম কমাবে না কারণ এই দুধে জিএসটি ছিল না। জিএসটি সংস্কারের ফলে এখন মাদার ডেয়রির অধিকাংশ পণ্য হয় শূন্য করের আওতায় পড়ছে অথবা সর্বনিম্ন ৫% জিএসটি স্ল্যাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই পদক্ষেপের ফলে অন্যান্য এফএমসিজি কোম্পানিগুলিও ভবিষ্যতে এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে কি না, তা দেখার বিষয়।
❤ Support Us







