- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- অক্টোবর ১৭, ২০২৫
‘জুলাই সনদ’ ঘিরে উত্তাল বাংলাদেশ ! সংসদ ভবনে শহিদ পরিবার-আহতদের অবস্থান। চাপে পড়ে পঞ্চম দফায় জরুরি সংশোধন ইউনূস সরকারের
বাংলাদেশে ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা ও সাক্ষর অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঢাকার রাজপথ বৃহস্পতিবার রাত থেকেই মুখর। একদিকে সংসদ ভবনের গণআন্দোলনে শহীদ পরিবার ও আহতদের বিক্ষোভ, তাঁদের সরাতে পুলিশের বলপ্রয়োগ, অন্যদিকে চাপের মুখে পড়ে সনদের পঞ্চম দফায় সংশোধন। রাজনৈতিক দলগুলির ঐক্য ও অনৈক্যের দোদ্যুল্যমান অবস্থায় ‘অন্য হাওয়া’ বইছে নদীমাতৃক দেশে।
গত আগস্টে, ইউনূস সরকার সনদের খসড়ায় যে প্রস্তাবনা তুলে ধরেছিল, তাতে বলা হয়েছিল — বিদ্যমান সংবিধান বা অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর কিছু থাকলে, সে ক্ষেত্রে এই সনদের বিধান/প্রস্তাব/সুপারিশ প্রাধান্য পাবে — আর এ নিয়েই শুরু হয়েছিল বিতর্কের ঝড়। প্রশ্ন উঠেছিল, যদি সংবিধানই প্রশ্নবিদ্ধ না করা যায়, তাহলে একটি ‘সনদ’ কীভাবে তার উপরে বসতে পারে? সমালোচনা একপর্যায়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, চূড়ান্ত স্বাক্ষর সনদটি তৈরি হয়, তাতে সেই ‘ঊর্ধ্বাধিকার’ ও ‘চ্যালেঞ্জবিহীনতা’ ধারা বাদ দেওয়া হয়; অর্থাৎ, সনদ আর সংবিধানের উপরে নয় বলে পরিষ্কার করা হলো।
কী এই জুলাই সনদ ? কেনই বা এত বিতর্ক ?
বাংলাদের এই নতুন সনদে বলা হয়েছে — জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে না, উপরন্তু আদালত সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করব।” অর্থাৎ, উচ্চ আদালতে রিট করা যাবে না — এমন একটি ব্যবস্থাই এতে রাখা হয়েছে। জুলাই সনদের ৮৪ টি ধারায় সংবিধান, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ ইত্যাদি ক্ষেত্রে সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সনদের ৭ নম্বর ধারা সংযুক্ত করেছে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’। সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দিয়ে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ রাখা হয়েছে। তবে প্রবল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে ১৪ ও ১৫ নম্বর ধারা। যেখানে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর পদের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর’ ও ‘প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান একই ব্যক্তি হতে পারবে না।’ সংবিধান পরিবর্তনের দাবিও রাখা হয়েছে। কিন্তু এই বিধান নিয়ে পাঁচটি দল ও জোট নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। আবার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন প্রস্তাবেও প্রশ্নের ঘূর্ণি। প্রস্তাবনায় উল্লেখ, উচ্চকক্ষে সদস্যরা সরাসরি নির্বাচিত হবেন না, বরং পার্টির প্রাপ্ত ভোট অনুযায়ী বণ্টন হবে — প্রশ্ন উঠতে এ তো এক ধরণের মনোনীত বা সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা, এ নিয়ম কি জনসাধারণের প্রতিনিধিত্বের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক অধিকারের বিপরীত নয় ! কয়েকটি প্রধান দল ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে — আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট না থাকলে তারা স্বাক্ষরে অংশ নেবে না। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের মুখ, ছাত্রনেতাদের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঘোষণা দিয়েছে — ‘সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটি একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র’ এবং ‘আইনি ভিত্তি নেই’ বলে তারা অংশ নেবে না। এছাড়া, বিএনপি তাদের মতামত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে জমা দিয়েছে, খসড়ায় কিছু অসামঞ্জস্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন তুলে। তাঁরা বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনগত বাধা নেই, মৌলিক সংবিধানবিরোধিতা প্রশ্ন থেকে যায়।
এদিকে এই সনদ অনুষ্ঠান ঘিরে ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবননের সামনে বিক্ষোভে বসেছেন এক ঝাঁক মানুষ। তাঁদের পরিচয় ‘জুলাই শহিদ পরিবার ও আহত যোদ্ধা’। তাঁদের দাবি, তাঁরা চান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। চান একটি সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা ও দায়মুক্তি আইন, যা শুধু তাঁদের নিরাপত্তাই দেবে না, দেবে ন্যায্যতা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যতের গ্যারান্টি। তাঁদের বক্তব্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যাঁরা আন্দোলনের অংশ হয়ে রক্ত ঝরিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, তাঁদের স্থান যেন দেশের আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে অম্লান হয়। আর এ দাবিগুলোই তাঁরা চান অন্তর্ভুক্ত করতে আজকের অনুষ্ঠানে সই হতে যাওয়া ‘জুলাই সনদ ২০২৫’-এ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির নাটকীয় মোড় নেয়। আন্দোলনকারীদের উপর বলপ্রয়োগ করে পুলিশ। শুরু হয় ধস্তাধস্তি, পরে তা রূপ নেয় সংঘর্ষে। আন্দোলনকারীরা ইট-পাটকেল ছুড়তে থাকেন। পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে। পরিস্থিতি এতটাই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে যে আন্দোলনকারীরা রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দেন, ভাঙচুর করা হয় কয়েকটি যানবাহন। এমনকি বাইরে সাজিয়ে রাখা তাঁবুগুলোকেও জ্বালিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ জনতা। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, এই সংঘর্ষে কয়েকজন আহত। ঢাকা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
বিক্ষোভের চাপে শেষ পর্যন্ত পঞ্চম দফায় জরুরি সংশোধন আনে বাংলাদেশের ‘সনদ কমিশন’। দুপুরের দিকে দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে আলী রীয়াজ সংশোধিত দফাটি পড়ে শোনান। সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহিদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হবে। তাঁদের পরিবারকে পুনর্বাসন, ভাতা ও সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে তাঁদের আইনি দায়মুক্তি ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিও নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক, বদিউল আলম মজুমদার, মনির হায়দার সহ অনেকে। এই ঘোষণার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এবার অবস্থান উঠবে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটেনি। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবায়নের রূপরেখা নেই। তাঁরা কাগজে লেখা কথা নয়, বাস্তব নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চান। তাঁরা হুঁশিয়ারি দেন, জোর করে তাঁদের সরানো হলে প্রতিরোধ হবে।
এর মধ্যেই বিকেল ৪ টে ‘সনদ অনুষ্ঠান’ শুরু হয়েছে। সেখানে উপস্থিত আছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তাঁর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্বরা। অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামাত প্রধান সৈয়দ তাহের, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতির জোনায়েদ সাকি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তবে সনদ নিয়ে সব দলের ঐক্য এখনো তৈরি হয়নি। জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তারা অনুষ্ঠানে এলেও এখনো সনদে স্বাক্ষরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ বাস্তবায়নের খসড়া ড্রাফট এখনো তাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। একইভাবে বামপন্থি ৪ টি দল— বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ— ঘোষণা করেছে, সংশোধিত খসড়া হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তারা সই করবে না। আশ্চর্যের বিষয়, সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে ছাত্রদের জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, ইউনূস সরকার বিএনপির মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে একতরফা সনদ তৈরি করেছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই তাদের ৩ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত সই নয়, যোগদানও নয়।
❤ Support Us







