- দে । শ
- জানুয়ারি ১৬, ২০২৬
মেদিনীপুরের সভায় ফের রাম-বাম তত্ত্বে সরব অভিষেক
মেদিনীপুরে বিজেপি একটি আসনেও লিড পেলে তার অর্থ সিপিএমকে অক্সিজেন জোগানো— পশ্চিম মেদিনীপুরের ‘সংকল্প সভা’র মঞ্চ থেকে স্পষ্ট ভাষায় এ বার্তাই দিলেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি ও সিপিএমকে একই বন্ধনীতে রেখে আক্রমণ শানিয়ে দলের কর্মীদের লক্ষ্য বেঁধে দিলেন— মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের মোট ১৯টি বিধানসভা আসনে ফল হতে হবে ১৯–০, তৃণমূলের পক্ষে। অভিষেকের অভিযোগ, একদা বামেদের দুর্গ বলে পরিচিত মেদিনীপুরে দশকের পর দশক ধরে সিপিআইএম সন্ত্রাসের রাজনীতি চালিয়েছিল। সে সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত বহু নেতা আজ বিজেপির ছাতার তলায়। ছোট আঙারিয়া গণহত্যা মামলার অভিযুক্ত সুশান্ত ঘোষের ডান ও বাঁ হাত বলে পরিচিত সুকুর আলি, তপন ঘোষদের নাম উল্লেখ করে তাঁর কটাক্ষ—‘বোতল নতুন, মদ পুরনো। জার্সি পাল্টেছে।’ সভামঞ্চ থেকে মহিলাদের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান— ‘বিজেপিকে যেন খাঁচাবন্দি’ করা হয়।
এদিনের সভায় সবচেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়ায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। বাঁকুড়ায় একটি গাড়ি থেকে হাজার হাজার ফর্ম–৭ উদ্ধারের প্রসঙ্গ টেনে অভিষেক বলেন, বিজেপির লক্ষ্য বাংলার যোগ্য ভোটারদের নাম কেটে দেওয়া। শেষ মুহূর্তে পরিকল্পিতভাবে এই কাজ চালানো হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ। এই প্রেক্ষিতেই দলের কর্মীদের উদ্দেশে একাধিক নির্দেশ দেন তিনি। ১৬ থেকে ১৯ জানুয়ারির মধ্যে যদি কোনও বিজেপি নেতা ইআরও দফতরে ১০টির বেশি ফর্ম–৭ জমা দিতে আসে, তা হলে কোনো রকম উত্তেজনা নয়—ভদ্র, শান্ত মেজাজে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে একটু ডিজে বাজিয়ে প্রতিবাদ জানাতে হবে। প্রয়োজনে এলাকার বিজেপির ছোটো-বড়ো নেতাদের বাড়ি ঘেরাও করার কথাও বলেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, লড়াই হবে, কিন্তু তা হবে গণতান্ত্রিক ও প্রকাশ্য।
বিজেপি ও সিপিএমকে একসূত্রে বেঁধে আরো কড়া ভাষায় আক্রমণ করতে গিয়ে অভিষেক বলেন, ‘এদের থাকতে দিলে আলসার, আর বাড়তে দিলে ক্যানসার’। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় যোগ্য ভোটারদের মৃত দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকেও কটাক্ষ করতে ছাড়েননি তিনি। তাঁর ব্যঙ্গ, জ্ঞানেশ কুমারের জন্য বাংলায় নতুন প্রকল্প চালু করতে হবে— ‘ছানিশ্রী’, বিজেপি নেতাদের ছানি কাটাতে হবে। সভামঞ্চের নীচ থেকে তখন দাবি ওঠে, বিজেপি নেতাদের যেন তৃণমূলে না নেওয়া হয়। সে দাবির জবাবে অভিষেক জানান, মানুষের কথা মেনেই বিজেপির একাধিক বিধায়ককে দলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। খড়গপুরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ তৃণমূলে যোগ দিতে চাইলেও তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর কথায়, তৃণমূল সিপিএমের হার্মাদ বা বিজেপির জল্লাদদের সম্পত্তি হবে না।
কেন্দ্রীয় এজেন্সি ব্যবহার করে বাংলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানোর অভিযোগও তোলেন অভিষেক। বলেন, সব পাপের হিসাব হবে, তালিকা তাঁর কাছে আছে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও ২০ লক্ষ মানুষকে আবাস যোজনার ঘর দেওয়া হবে। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতদিন আছেন, মানুষের অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়েও বিজেপিকে নিশানা করেন অভিষেক। তাঁর দাবি, বিজেপি বা সিপিএম কেউই এই প্রকল্প করেনি, উল্টে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে। রাজ্য সরকারই ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে এবং ২০২৫ সাল থেকে কাজ শুরু হয়েছে। তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই কাজ শেষ হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকার নাম ধরে ধরে অতীতের সন্ত্রাসের স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন অভিষেক। শালবনি, কেশপুর, চন্দ্রকোণা, গড়বেতা, বেনাচাপড়ার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এক সময় যাঁরা পুকুরে বিষ দিত, ঘরবাড়িতে আগুন লাগাত, মানুষের বাড়িতে সাদা থান পাঠাত, আজ তারাই বিজেপির নেতা। তাঁর ভাষায়, আগে ছিল সিপিএমের হার্মাদ, আজ তারা বিজেপির জল্লাদ।’ ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে অভিষেকের অবস্থান ছিল আরো কঠোর। বাংলার মানুষকে বাংলাদেশি বলে দাগানোর অভিযোগ তুলে তিনি প্রশ্ন তোলেন— উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাতে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে, তাহলে তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীরা কোথায়? তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকতে বাংলায় এনআরসি হবে না, একটি নামও বাদ যাবে না। সভা জুড়ে অভিষেকের কণ্ঠে ঘুরে ফিরে আসে একটাই বার্তা— ‘বাংলা ঝুঁকবে না’। তাঁর কথায়, এই নির্বাচন শুধু ভোটের নয়, এটা প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর শিক্ষা দেওয়ার ভোট। মেদিনীপুরকে হার্মাদশূন্য করার ভোট। কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান, বুথে বুথে লড়াই করতে হবে, বাড়ি বাড়ি যেতে হবে, গণতান্ত্রিকভাবেই সব ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে হবে। সভার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, বিজেপিকে শূন্য করার দায়িত্ব কি মেদিনীপুরের মানুষ নেবে না?
❤ Support Us





