Advertisement
  • গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
  • জানুয়ারি ২৫, ২০২৬

একটি গাছের গল্প

দীপঙ্কর দাস
একটি গাছের গল্প

দেখতে দেখতে তোমার চলে যাবার আট মাস হয়ে গেল। এখন আমাকে আর রাত জাগতে হয় না। বসার ঘর থেকে তোমার দিকে নজর রাখতে হয় না। তুমি রাতে উঠতে, এখন আর তোমার সঙ্গে বাথরুমে যেতে হয় না। গল্প করতে হয় না। মনে পড়ে, আমি যখন অফিসের কাজে আগরতলা অথবা গুয়াহাটি থেকে রাতে ফিরতাম, তুমি আমার জন্য জেগে থাকতে। আমি সোজা এয়ারপোর্ট থেকে বাড়ি এসে তোমার ঘরে ঢুকতাম। তোমার চোখ মুখ আনন্দে ভরে উঠত। তোমাকে আমি জড়িয়ে ধরতাম। তোমার সঙ্গে গল্প করতে বসে যেতাম। তুমি গল্প করতে তোমার ছোটবেলার, তোমার বড় হবার, তোমার কর্ম জীবনের। প্রায়ই বলতে ফারাক্কা, কংসাবতী, তিস্তা ব্যারেজের গল্প। কত কিছু জেনেছি তোমার থেকে। সমৃদ্ধ হয়েছি। তোমার ৯০এও  কোনো ক্লান্তি ছিল না। মাঝেমধ্যেই আমাকে বলতে, তুই যদি না থাকতিস, তাহলে কি হত আমাদের। আমি তখন তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতাম, কেন এসব নিয়ে ভাবছো। আমি তো সব সময় তোমার সঙ্গে আছি। তোমার চোখটা ছল ছল করে উঠত।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি তোমার চাদরের মধ্যে ঢুকে পড়তাম। তোমাকে জড়িয়ে তোমার গায়ের গন্ধ প্রাণ ভরে নিতাম । সে এক দারুন অনুভূতি। আমার কাজ এখন অনেক কমে গেছে। এখন তো আর তোমার জন্য কিছুই করতে হয় না। লিখতে আর ইচ্ছা করে না। অনেকদিন পর তোমাকে নিয়ে আবার লিখতে বসলাম। তুমি প্রায়ই বলতে, আমাকে আর তোর মাকে নিয়ে এত কিছু করছিস, অথচ তুই নিজের শরীরের দিকে নজর দিচ্ছিস না। অনেকদিন রুটিন চেক আপ করাসনি। তোর জন্য চিন্তা হয়।

প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। কী পরম শান্তি, অবিশ্বাস্য তৃপ্তি। ৮ মাস পর তোমার ওই একই স্পর্শ! তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভাবলাম, তোমাকে আর কখখনো ছাড়বো না। তোমার সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিলাম। তোমার গায়ের সেই গন্ধসেই কণ্ঠস্বর

বসার ঘরের যে চেয়ারটায় তুমি বসতে, সেই বাঁদিকের দেওয়ালের গায়ে ইংরেজি-বাংলা ক্যালেন্ডারটা, ক্যালেন্ডারের হুকে মাস্কগুলো এখনো যথারীতি ঝুলছে। ক্যালেন্ডারে এখনো লেখা আছে, নভেম্বর মাসের কত তারিখে তুমি লাইফ সার্টিফিকেট জমা দিতে যাবে। আমি তোমাকে নিয়ে লাইফ সার্টিফিকেট আনতে যেতাম। সকাল সকাল স্নান করে তোমার পছন্দের সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরতে… মা তোমাকে নিজের হাতে যত্ন করে সাজিয়ে দিত…. সেদিন তোমার আনন্দ আর ধরে না…. বয়স এক ধাক্কায় কত কমে যেত। বাড়ির সবাইকে জানিয়ে যেতে, ব্যাংকে যাচ্ছি। ব্যাংক থেকে এসে লাইফ সার্টিফিকেট মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলতে, গিন্নি ভালো করে রেখে দাও… আমার বেঁচে থাকার প্রমাণপত্র। … যাক এক বছর নিশ্চিন্ত….

রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটা নিয়ম করে দূরদর্শনের খবর… তারপর রাত সাড়ে দশটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত আকাশবার্তার খবর তুমি আর আমি নিয়ম করে শুনতাম। বিশেষ একজন খবর পড়া শুরু করলেই, তুমি মাকে ডেকে নিতে। তোমার ওই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছি। আমি গর্বিত।

টিভির পাশে তোমার লাঠিটা এখনো রাখা আছে। আমার সঙ্গে বাড়ির বাইরে হাঁটতে বেরোলে তুমি লাঠিটা ব্যবহার করতে। বলতে, তুই একদিন আমার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছিলি… আর আজ তোর হাত ধরে আমি হাঁটছি। আমার এখন দুটো লাঠি। এ তো এক দারুণ প্রাপ্তি, আমি কত ভাগ্যবান বলো তো!

তুমি শুনলে খুব খুশি হবে, মা-র ফ্যামিলি পেনশন হয়ে গেছে। মা বলেছিল, ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত রসদ আছে… তার মধ্যে আমাকে সব কিছু করতে হবে…. ২৫ জানুয়ারি প্রথম ফ্যামিলি পেনশন পেয়ে ভীষণ খুশি, যখন যা ইচ্ছা সবকিছু করতে পারছেন। আমি কথা রেখেছি, মাকে আগলে আগলে রেখেছি…. তুমি খুশি তো?

মা আমাকে একটি কথা প্রায়ই বলে, বিয়ে করে শশুর বাড়ি যাবার সময় যখন খুব কাঁদছিলাম, তোর বাবা আমাকে বলেছিল, কাঁদছো কেন? আমি তো আছি। কত বড় ভরসার আর বিশ্বাসের জায়গা বল তো!

ঠিক ৫০ বছর আগেকার কথা। তুমি তখন কংসাবতী প্রজেক্ট-এর দেখভাল করছ, আমরা তোমার সঙ্গে খাতরায় থাকতাম। ওইসময়ের, তোমার একটা গাছ লাগানোর ছবি খাতড়ার অরুণদা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিলেন। সম্ভবত শিরিষ গাছ। কি সুন্দর লাগছে তোমাকে দেখতে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ছবিতে তুমি জাস্ট মাইন্ড ব্লোয়িং। পুরো হলিউড হিরো হামফ্রে বোগার্ট।

আমার খুব ইচ্ছে, তোমার লাগানো গাছ দেখতে আমি বাঁকুড়ার খাতরা যাব। ৫০ বছর আগে খাতরায় যাঁরা থাকতেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তুমি যেখানে গাছ লাগিয়েছিলে, সে জায়গাটা ওঁরা চেনেন। ওঁরা কথা দিলেন, গাছটা খুঁজে রাখবেন। কিছুদিন পরেই ওঁরা জানালেন, গাছ খুঁজে পেয়েছেন। শুনেই আমি খুব খুশি। যেন গাছটা জড়িয়ে ধরে আমি তোমার স্পর্শ অনুভব করছি। তক্ষুনি মনে হলো, আমি তোমাকেই ফিরে পেয়েছি। যেদিন ওঁদের ফোন পেলাম, পরদিনই আমি খাতরার উদ্দেশ্যে রওনা দিই, কাছেই মুকুটমনিপুর। সেখানেও একবার যাব। সেটাও তোমার আরেক কর্মস্থল ছিল।

তোমার নিজের হাতে লাগানো গাছের নিচে বসলাম । প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। কী পরম শান্তি, অবিশ্বাস্য তৃপ্তি। ৮ মাস পর তোমার ওই একই স্পর্শ! তোমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভাবলাম, তোমাকে আর কখখনো ছাড়বো না। তোমার সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিলাম। তোমার গায়ের সেই গন্ধ, সেই কণ্ঠস্বর। তুমি সব সময় বলতে, কভি আলবিদা না কেহনা…..

ব্যাগ থেকে আমার টেস্ট রিপোর্ট বের করে তোমাকে দেখালাম। এই যে আমার রিপোর্ট। সবকিছু নরমাল। আমি খুব ভালো আছি। মায়ের জন্য, সবার জন্য, নিজের জন্য আমাকে ভালো থাকতেই হবে। মনে হলো, তুমি সব রিপোর্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছ। অনেকক্ষণ তোমার ছায়ায় বসে রইলাম, একসময় গান ধরলা, আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে… এ জীবন পুণ্য করো… এ জীবন পুণ্য করো।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!