- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫
শূন্যদিন
ও মা ! দেক,কে এয়েচে ! ফুলটুসি তাকিয়ে থাকে।এমন মানুষ তো দূরের তার ছায়া পর্যন্ত দেখেনি।
কে ? আতিয়ার ? আজকে তো ব্যাংকের তাগাদার দিন না। তবে কে ? বাড়ির পেছনে রান্নাঘরে সে ব্যস্ত।হাত মুছে বাইরে এসে দাঁড়ায়। ধ্যাড়ধ্যেড়ে বাইক তখন রাস্তা ছেড়ে তাদের এক চিলতে উঠোনে এসে হাঁপ ছাড়ছে। আরোহীর অবস্থা তথৈবচ। প্রথমে চিনতে পারেনি চাঁপা। চেনার কথা নয়। তারপর ভুরু কুঁচকে বলে,ডাক্তার যে–!
হ্যাঁ ! এই যে এলুম ! মুজিব ডাক্তার তখন নড়বড়ে পায়ে বাইক থেকে নেমে এসেছে।
তা কী মনে করে ? গলা একটু রূঢ় হয় তার।
কেন ? আসতে নেই নাকি ? একটু যেন হাঁপাচ্ছে ডাক্তার।
এতদিন পর ?
এসে কি অন্যায় করলুম ?
তা আমার চেয়ে তুমি ভালো জানো।
এক গ্লাস পানি দেবে ? জানডা বড়ো শুকোচ্চে।
ডাক্তারের দিকে ভালো করে তাকায়। আগের সেই ফিটফাট জৌলুস আর নেই। বয়েস হয়েছে বটে। তবে তার চেয়েও বেশি জরাজীর্ণ দেখাচ্ছে।উঠোনের এক কোণে ফলসা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বোধহয় আগন্তুক সম্পর্কে ভাবনা চিন্তা করছে তার মেয়ে।খানিক চটে গিয়ে বলে,অ্যাই ফুলি ! দাঁড়িয়ে কী দেকচিস ? পানি এনে দে !
ফুলটুসি বেজার মুখে দাওয়ায় উঠে যায়। একদিকে সাজানো আছে কয়েকটা বোতল। একটা মাঝারি বোতল হাতে তুলে নেয়।
ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে মুজিব পরিতৃপ্ত হয়। বোতল ফেরত দিতে গিয়ে বলে,আমি কিন্তু ঝগড়া করতি আসিনি।
তবে পীরিত করতি এয়েচ ?
মুজিব সহসা কোন জবাব দিতে পারে না অথবা সাহস পায় না।মিইয়ে যাওয়া গলায় বলে,ঠিক আচে ! চলে যাচ্চি।
চাঁপা এবার নরম হয়।বলে,ঠিক আচে ! এয়েচ যখন দরকারটা কী বলে যাও।
দরকার তেমন কিছু না। মন টানলো তাই।
ডাক্তারের চুলে পাক ধরেছে।কপালের মাঝে বড়ো আঁচিলটা ঘোলাটে চোখের মতো চেয়ে আছে।সেদিকে তাকিয়ে ভালো লাগে না চাঁপার। তা এদ্দিন পর কীসে মন টানলো ?
মনের ওপর কি আমার হাত আচে ?
সে কি অকারণে শুধু মনের টানে এসেছে ? ডাক্তার সোজা সাপটা লোক না। তাকে হাড়ে হাড়ে জানে। এসব কথা চাঁপা বিশ্বাস করে না।
ফুলি ফলসাগাছে ঠেস দিয়ে নাটক দেখছে। আজীবন মাকে যা দেখেছে তাতে মেলাতে পারছে না। কোন পুরুষমানুষের সাথে মায়ের এমনধারা কথাবার্তা হতে পারে ?
লোকটা অবশ্য এটা সত্যি কথা বলেছে। মনের ওপর মানুষের কোন হাত নেই। নইলে বিপদ আছে জেনেও সে কেন ঝাঁপ দিয়েছিল ? সে চুপ করে আছে দেখে মুজিব বলে, একটানা দাঁড়িয়ে থাকতি পারিনে। পা টনটন করে। দাওয়ার ওপর বসতি দেবে ?
চাঁপা ইতস্তত করে। উটকো লোকটা আর কতক্ষণ থাকবে ? মানে মানে বিদায় হলে তো ভাল ! সকালবেলা একেবারে তাড়িয়ে দেবে ? কিন্তু সে কিছু বলার আগে ফুলি দাওয়ার ওপর বিছানা পেতে দেয়। মুজিব ডাক্তার তড়িঘড়ি উঠে বিছানার ওপর দেহ ছেড়ে দেয়। কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে থেকে উঠে বসে। চারিদিক এবার তাকিয়ে বলে,ঘর-দোর বেশ বেঁধেচ।
একথা তার দেমাকে আগুন ধরিয়ে দেয়।সে হিসহিস করে,তা তোমার জন্যি অপেক্ষা করব ?
সেকথা বলিনি। তবে একটা কথা জিজ্ঞেস করব ?
বাসি কাজ অনেক পড়ে আছে। বেলা বেড়ে যাচ্ছে।তাকে কাজে বেরোতে হবে।সে কোন জবাব দেয় না।তবে সে চুপ করে থাকলেও ডাক্তার থামে না।এমন ঘর-দোর কার ভরসায়–?
তোমার ভরসায় নাকি ? চাঁপার গলায় শ্লেষ।
আমার কথা বাদ দাও। সে কী ফিরেচে ?
চমকে ওঠে চাঁপা। কার কথা বলচ ?
এখনো বুজতি পারনি ?
সে এবার মনে মনে টের পায়। ডাক্তারের ইঙ্গিত ধরতে অসুবিধে হয় না। হ্যাঁ, সে পথে পড়া মেয়েছেলে না। বিয়ে হয়েছিল পাশের গাঁ আদমপুরে। বর তার মার্বেল মিস্তিরি। আয়পায় কম না। বিয়ের কী সুখ তা থাকে অজ্ঞাত। তবে মাথার ওপর ছাদ একটা,এটাই তার খুশি। পুরুষের মন বুঝতে পারেনি। তাহলেও কি জাকিরকে ধরে রাখতে পারত ? ফুলি তখন পেটে।অনেক কানাঘুষো শুনতে পেত। পাশে শুয়ে থাকা পুরুষ দিনের পর দিন অভিনয় করতে পারে,সে ঘুণাক্ষরে টের পায়নি। ফুলির কথায় ঘোর কাটে।মা,দাঁড়িয়ে রইলি যে ! তোরে ভুতে পেয়েচে নাকি ? সেকথা কানে না নিয়ে চাঁপা মুজিবের দিকে তাকিয়ে বলে,সে তো কবেই মরে গেচে।
কই খবর পাইনি তো ?
আজকে জানলে ?
ডাক্তার মাধা নিচু করে কী ভাবে। তারপর আমি অবশ্য বহুদিন এখানে ছিলুম না।হঠাৎগঞ্জে ডাক্তারি করতে চলে যাই,আমাকে কেউ খবর দেয়নি।
ও যেদিন থেকে চলে গেছে সেদিন থেকে আমি বিধবা।
ডাক্তার চুপ করে যায়। তাকে বড়ো শ্রান্ত মনে হয়।একটা দমকা কাশি শুরু হয়।তা থামলে চাঁপা আচমকা বলে,তুমি আর সিগারেট খাও না ?
তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মুচকি হেসে বলে,আমাকে তাহলি একেবারে ভুলে যাওনি।
ফুলি বলে ওঠে,মা, কিছু কর ! খিদে পেয়েচে।
মাথা নিচু করে সে এগোয়। ফুলি তার পেছন পেছন। যেতে যেতে ফুলি বলে, লোকটা কে বলত ?
আমি তারে চিনিনে।
হঠাৎ যে এল ?
তা আমি কি জানি ?
তুই যে এত কথা বললি ?
ঠিক আছে লোকটাকে চলে যেতে বলব’খুনি।
ফুলি মায়ের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। চেনা মানুষকে ভীষণ অচেনা মনে হয়।
আধ ঘণ্টা বাদে ফিরে এসে দেখে,লোকটা চলে যায়নি।ফুলি বলে,মা,ওকে চা রুটি দিলি হত।
চাঁপা আনমনা হয়ে বলে,তা দিলি হত।
তাদের কথাবার্তায় ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসে মুজিব। ক্লান্ত গলায় বলে,মনড়া আমার ভরে গেল।
কেন ?
ততক্ষণে জলখাবার এনেছে ফুলি। রুটি বাদ দিয়ে চা খেতে খেতে বলে,তোমরা একেবারে ভেসে যাওনি।
তুমি ভাসিয়ে দিলে কি আমরা ভেসে যাব ?
একথা বলে আমাকে আঘাত দিও না।
আমিও কি কম আঘাত পেয়েচি।
সেজন্যে তো ছুটে এলাম।
চাঁপা চুপ করে যায়। সত্যি সে অকালে ঝরে গেছে কিন্তু একেবারে ভেসে যায়নি। ডাক্তারের মতলবখানা কী ? তার দেহ এখনো শুকিয়ে যায়নি। সেটুকু ভোগ করার জন্যে এত ছলাকলা ! তার চা খাওয়া শেষ হয়েছে। আর দেরি না। গঞ্জে রুমা ম্যাড়ামের বিউটি পার্লারে কাজ করে।ন’টা বাজতে চলল। দোকান খুলে ঝাঁটাপাট দিতে হবে।সে ঠান্ডা গলায় বলে,দেখাশুনো তো হল, এবার আমি কাজে যাব।
আমাকে তাড়িয়ে দিচ্চো ?
তুমি আমাকে আদর করে রেকেচিলে ?
প্রতিশোধ নিচ্চো ?
প্রতিশোধ ? কার ওপর প্রতিশোধ নিতে পেরেছে ? জাকির যখন অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গেল তখন আত্মহত্যার ভাবনা ছাড়া কিছু করতে পেরেছে ?যখন মুজিব ডাক্তার তাকে ফেলে শাহানারাকে বিয়ে করেছিল তখন নীরব কান্না ছাড়া আর কী ?
ওসব বাজে কথা বাদ দাও !এখন কী করবে ?
তুমি বললে চলে যাব।
এমন সময় ফোন বেজে ওঠে। রমা ম্যাডামের গলা। আজকে বাজার বন্ধ থাকবে।কে একজন মারা গেছে। ফোন রেখে চাঁপা চুপ করে থাকে।কী বলবে বুঝতে পারছে না। তাকে চলে যেতে বলবে ? এক সময় তাকে তো আশ্রয়টুকু দিয়েছে। বাপের বাড়ির অবস্থা তেমন নয়।চারিদিকে সব অদ্ভুত হাতছানি। গা ছমছম করে। তখন শরীরও তার ভালো নেই। বারকয়েক যেতে হল ডাক্তারখানায়।আসা যাওয়ায় মুখ চেনাচিনি হল।ডাক্তার একসময় বলে,এখানে কাজ করবে ?
সে অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তার পর বলেছিল,বাজারের লোক কিছু বলবে নাতো ?
তোমার কোন অসুবিধে আচে কিনা বলো।
আমার আবার কি অসুবিধে ?
মাগনা নয়।আমি মাইনে দোব।বাইরের লোকের কথা আমি বুজে লোব।
ডাক্তারের আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়।নানা অছিলায় ডাক্তার তার জীবন কাহিনি অনেকখানি পড়ে নিয়েছে।তাছাড়া সামনে কিছু নেই।এই আঁকড়ে ধরা আর কি ! ফুলি থাকে নানিমার কাছে।
কাজে যেতে হবে না। কতদিন পর দেখা। এখনই বিদায় করবে তাকে ? ডাক্তারের সেই চনমনে ভাব আর নেই।কেমন যেন বিবর্ণ।কী হয়েছে তার ? সন্দেহ উঁকি মারে।কৌতূহল জাগে।জিজ্ঞেস করে,তোমার সেই শকুনির খবর কী ?
এখনও মনে রেকেচ ?
তুমি তো মনে করালে ?
আমার ঘাট হয়েচে ! ম্লান গলায় বলে সে।
ঠিক আচে।তা এখুন কী করবে ?
তোমাদের দেখে খুব ভালো লাগল।মেয়ের কি বিয়ের ঠিক হচ্চে ?
হচ্চে,আবার ভেঙে যাচ্চে ।
কেন ? তোমার মেয়ে তো রূপসী।
শুধু রূপ দিয়ে হয় না।আরো কিছু লাগে।মাথার ওপর গার্জেন থাকা চাই।
চুপ করে যায় ডাক্তার। বাইরে বেশ রোদ চড়েছে।তবু উঠে বসে।ফুলি বলে,চললে নাকি মামা ?
থমকে যায় সে।অদৃশ্য এক বাঁধন অনুভব করে।তারই তো গার্জেন হওয়ার কথা। তবু বলে,কী আর করি বল !
দুপুরে না খেয়ে চলে যাবে ?
তুই এমন টান দিচ্চিস কেন ?
চুপ করে যায় সে।বাপকে কোন জন্মে দেখেনি।তবু একটা ছায়া অনুভব করে।তবে এসব কথার উত্তর দিতে পারে না।সংসারের জটিলতা ভেদ করার মতো বয়েস তার হয়নি।
ফুলির মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া হয়। কৈফিয়ত দেওয়ার মত বলে,তোদের খাবার আমার চলবে না।
কেন ? ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে চাঁপা,আমরা কী হারাম খাই ?
সেকথা নয়।
তবে ?
তুমি ভুল বুজো না। আমার শরীর ভালো নেই।
কী হয়েচে ?
তেমন কিচু না।সব খাবার খেতি পারিনে। একটু আগে বললে না,সিগারেটের কথা ? ডাক্তার বারণ করেচে।
ঠিক আচে,দুধ-ভাত খেয়োখুনি। এখুন বালিশ এনে দি।ফুলি ছেলেমানুষি গলায় বলে।
বালিশে মাথা দিয়ে হয়তো তন্দ্রামতো এসেছে। বুকের ভেতর একটা মোচড় মেরে ওঠে। তীব্র যন্ত্রণায় ঘোর কেটে যায়। তাকিয়ে দেখে,মাথার কাছে চাঁপা। বুকের ধুকধুকানি কমলে উঠে বসে। তারপর ধীর কণ্ঠে,শাহানারার কথা বলচ ? সে এক মোহ বুজলে,চাঁপা। কেমন যেন মনে হলো। তাকে নিয়ে বোধহয় আরো সুখি হব।
তখন তো আমি তোমার কাচে রইচি।
সেটা আমারই ভুল।
আর মন্দারমণি যাওয়া ?
একটু দম নেয় সে। তারপর বলে,ওর একটা গোপন প্রেমিক ছিল। জানতুম না। বিয়ে ছিল এক ছলনামাত্র। যখন বুজলুম তখন সব শেষ। বিয়ের পর তার নামে সব লিখে দিয়েচি। একদিন সে প্রেমিকের হাত ধরে আমার সামনে দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে চলে গেল।
চাঁপা ঠিক বুঝতে পারে না। খুশি হবে না দুঃখ পাবে ? তার খুশি হওয়া তো উচিত। কোয়াক ডাক্তার মুজিবের মহিলা সহকারি হিসেবে কাজে লেগে গেল। পায়ের তলায় যেন মাটি ফিরে পেল। ফুলি যখন ছ’মাস পেটে তখন ঘর ছাড়ে জাকির। পরে জেনেছে,সবিতা বলে এক ঢলানি মেয়েছেলে তার লেবার। তাকে নিয়ে দমদমে ঘর বেঁধেছে জাকির। বেশ সময় কেটেছে। সে থিতু হয়েছে। এমন একদিন ডাক্তার বলে,জীবন বড়ো পানসে। আমার তো কেউ নেই। সবাই কেমন ঘুরে বেড়াচ্চে !
তুমিও ঘুরে এসো।
একা যাব ?
তবে আর কে ? ডাক্তার তার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ছিল।
মন্দারমণিতে সমুদ্র গর্জনের মধ্যে দুজনে ডুবে গিয়েছিল। ডাক্তার তার কানে মধু বর্ষণ করেছিল,তোমাকে ভালোবাসি।
এখানে কোন সমুদ্র নেই। গাছপালায় ঢাকা ছোট বাড়ি। টালির চালের ওপর একটা ঘুঘু একটানা ডেকে চলেছে।রাগে সে অন্ধ হয়ে যায়। প্রতিহিংসায় খুশি হয়ে বলে,বেশ হয়েচে।
চাঁপা ! তুমি এমন কথা বলচ ! ডাক্তার বিমর্ষ গলায় বলে।
তোমার মতো পাপিষ্ঠকে ঠাঁই দেওয়া উচিৎ না। মিথ্যেবাদি কোথাকার !
উত্তেজনায় হাঁপ ধরে। একটু থিতিয়ে নিয়ে নিজের ভেতর ভেঙে পড়ে। দুঃখ পায়। মানুষটা তাকে ঠকিয়েছে ঠিক কিন্তু শুধু কি তাই ? তার শূন্য জীবন ক্ষণিকের জন্যেও কি ভরিয়ে দেয়নি ?
মুজিবও চুপ করে কী ভাবছে। তারপর বলে,মা খাকির ওপর বসে বলচি,মিথ্যে বলিনি।
ও কথা বাদ দাও।
আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি।
এই তো নমুনা ! আমাকে ছেড়ে ওই হাড়গিলেটাকে বিয়ে করলে।
আমি নিজেও তা আশ্চর্য হয়ে ভাবি।
এতে ভাবার কী আচে ! তোমার চরিত্র দোষ।
সে তুমি হাজারবার বল ! আমি তোমাকে ভালোবাসি।বিয়ের কথা অনেকবার ভেবেচি।
থাক ওসব কথা। দুপুরে কী খাবে ?
খাওয়ার কথা থাক।আমার কথা শেষ করি।
করো।
আমার মাথার মধ্যে একটা কথা হুল ফোটাত,– ওই মেয়ে।
মানে ? তার দিকে তাকায় চাঁপা।
ডাক্তার মুখ খোলার আগে ফুলি এসে হাজির।মা,তরকারি কী রান্না হবে ?
আমার জন্যে নরম খাবার।
সে ঠিক আছে। চাঁপা ধীরভাবে বলে।
তোমাদের অসুবিধে হবে নাতো ?
জোগাড় আচে। ফুলি বলে আবার রান্নাঘরে চলে যায়।
তোমার কথা এবার শেষ করো।
নিজেকে অপরাধী বলে মনে হয়েছিল।
কেন ?
ফুলি যখন জানতে পারবে সব,আমাকে দোষ দেবে। আমার জন্যে তার বাপটা আর ফেরেনি।
দুজনে চুপচাপ বসে থাকে। দুপুরের ঝাঁজ বেড়েছে চারিদিকে। মধ্য জীবনে তারাও দগ্ধ হয়েছে কারণে অকারণে। পড়ন্তবেলায় এসে পেছনে তাকিয়ে কি লাভ ? তবু মানুষ পারে না।চাঁপা ক্লান্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,কী ভাবচ ?
বোধহয় আরেকটা ভুল করেচি।
সেজন্যে এলে ?
সহসা কোন জবাব দেয় না।একটা দমকা কাশি আসে।সেটা কোনমতে সামলে নেয়।ওদিকে রান্নাঘর থেকে কী দরকারে ডাক দেয় ফুলি। উঠে যায় চাঁপা।
কী জন্যে এসেছে ? কী জবাব দেবে ? নিজের ভুল সংশোধন করার জন্যে ? তা কি এখন সম্ভব ? নিজের বোকামিতে হেসে ওঠে।বরং নিজের চোখে তা দেখতে এসেছে।
সে ফিরে এসে দেখে ডাক্তার ঘুমিয়ে পড়েছে। তার দিকে তাকিয়ে নিজের ভেতর তন্ময় হয়ে যায়। ডাক্তারখানা থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছিল। বুঝেছে,কারুর দয়ায় বাঁচা যায় না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে একটার পর একটা কাজ বদল করেছে।কখনো কখনো হতাশা গ্রাস করেছে। কখনো আশা করেছে,হয়তো জাকির ফিরবে।
চাঁপা বসেই থাকে।কতক্ষণ পর ফুলি এসে বলে,মা ! রান্নার কাজ তো শেষ।চাঁপা ভাবে সকাল থেকে শুধু এক কাপ চা খেয়ে আছে।ভিরমি খায়নিতো ? ধাক্কা দেয়,ওঠো !
ডাক্তার ঘোরের মধ্যে বলে,কোথায় যাব ?
কী বলচ ? চাঁপা জিজ্ঞেস করে।
ততক্ষণে নিজেকে সামলে নেয়। উঠে বসে। বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে,আমাকে অনেক দূর যেতে হবে।
কোথায় ?
আমি তৈরি হয়ে এসেচি।
তাহলি জ্বালাচ্চ কেন ?
জ্বালাব কেন ? তোমাদের সঙ্গে দেখা হল। এবার শান্তিতে যেতে পারব।
ডাক্তার কি মিথ্যে কথা বলচে ? উঠোনে রাখা মোটর বাইকের পেছনে এক ঢাউস ব্যাগ বাঁধা।হয়তো কোথাও ডেরা বাঁধতে যাচ্ছে।অতশত কথায় দরকার কী ! এখান থেকে বিদেয় হলে ভালো।
সকালে যাহোক করে চা খেয়েছে কিন্তু দুপুরে বেশ কষ্ট হচ্ছে।কিছুটা দুধ-ভাত খাওয়ার পর ছেড়ে দেয়।
কী হয়েচে,তোমার ?
তেমন কিচু না। বারাসাত হাসপাতালে দেখিয়েছিলুম।শ্বাসনালিতে ঘা হয়েচে।
সারবে না ?
কী জানি !
ফুলি এঁটো থালাবাটি তুলে নিয়ে যায়। দু’জনে আনমনে মুখোমুখি বসে থাকে।চাঁপার ভেতরটা এত গরমেও কেঁপে ওঠে।ডাক্তার কিছু একটা গোপন করছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে তার দিন বুঝি গোণাগুণতি। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,তুমি বিশ্রাম নাও।
দুপুর গড়িয়ে সাঁজবেলা নেমেছে।পাখিদের ঘরে ফেরার তাড়া।আজানের সুরেলা ধ্বনি ভেসে আসছে। উঠে বসে। একটু ঘুমিয়ে নিয়ে সুস্থ মনে হয়। যেতে তো তাকে হবে। কোন সম্পর্কের জোরে এখানে থাকবে ? ডাক্তার নিজের মনকে বাঁধে।
তাকে উঠতে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে চাঁপা। ডাক্তার তাকে দেখে চাঁ বলে,তোমাদের কষ্ট দিলুম।এবার আমাকে যেতে হবে।
কোথায় ?
এবারে ডাক্তার হেঁয়ালি করে না।ভর্তি হব হাসপাতালে।
ঠিক আচে। সুস্থ হয়ে ফিরে এসো। চাঁপার গলার স্বর যেন কেঁপে যায়।
দাওয়া থেকে নামতে গিয়ে বসে পড়ে সে।অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছে কিন্তু ঠেকিয়ে রাখতে পারে না।খুশখুশ করতে করতে একটা দমকা কাশির বেগ সামলাতে পারে না।আর তখন এক ভয়াবহ দৃশ্যে চমকে ওঠে মা মেয়ে।যা ! শিগগিরি এক বালতি পানি আন।চাঁপা মেয়েকে বলে।
মাথায় পানি ঢালার পর কাশি কমে আসে।মুখ দিয়ে ঝলকে ঝলকে বেরিয়ে আসা রক্তও বন্ধ হয়।মুজিব বোধহয় অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।
তার মাথা কোলে তুলে নিতে গিয়েও নিজেকে সংযত করে।লোকটা তো আদতে তাকে ঠকিয়েছে।এত মায়া কীসের ! মনে মনে বিরক্ত হয়।তবে একেবারে নির্দয় হতে পারে ? চাঁপা যেন বিমূঢ় হয়ে যায়।
জ্ঞান ফেরে তার। ধড়মড় করে উঠে বসে,দেরি হয়ে যাচ্চে। আমাকে যেতে হবে।
এভাবে তোমার আসা উচিত হয়নি।
আগে বুজতি পারিনি। তবে আমাকে তো যেতে হবে।
এই অবেলায় কোথায় যাবে,মামা ? এখানে থেকে যাও।
ফুলির কথায় ভয়ানক শান্তি পায়। যেমন ভুল ভাঙলে সবই পায়। কিন্তু তাকে যেতে হবে অনেক দূর। চাঁপা এত’খন কী ভাবছে তা কে জানে।হঠাৎ সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে,এলে যখন তখন চলে যাচ্চ কেন ?
আমারও দুঃখ কম নাকি ?
তবে ? ফুলি জিজ্ঞেস করে ।
তোমাদের মায়া আমাকে চলে যেতে শক্তি জোগাবে।আমার কোন আপশোস নেই ।
তার কথা ঠিকমতো বুঝতে পারে না মা মেয়ে। দুজনের সামনে দিয়ে দাওয়া থেকে টলতে টলতে উঠোনে নামে। মোটর বাইকে স্টার্ট দেয়।তারপর ধীর গতিতে বেরিয়ে যায় ডাক্তার।
ফুলি সাঁজবাতি দেওয়ার জন্যে ঘরে ঢোকে। চাঁপা দাঁড়িয়ে থাকে।একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা কুরে কুরে খায় তাকে। মনে হয়,ভয়ানক ক্রোধে ফেটে পড়ে।কী দরকার ছিল শূন্যদিনের কথা মনে করিয়ে দেওয়া ? সে তো বেশ আছে ! ভালো থাকার সংজ্ঞা তার কাছে আর কী হতে পারে ? নিঝুম আঁধার নামছে। মোটর বাইকের শব্দ আর নেই। নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গ চরাচরের আরেক শূন্যতা তাকে গ্রাস করে। সে পাথর হয়।
সাঁজবাতি জ্বালা হলে ফুলি বাইরে বেরিয়ে দেখে,মা তখনো উঠোনে ঠায় দাঁড়িয়ে।সে বলে, ঘরে আয় ! মেয়ের গলা পেয়ে এবার ডুকরে কেঁদে ওঠে চাঁপা।রিক্ত দিনের শেষে কোথায় তার ফেরা ?
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








