- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- মার্চ ১, ২০২৬
ভালোবাসা কারে কয়
অলঙ্করণ : দেব সরকার
” জানিস তিয়ান ,আমার জানলায় রোজ দুটো চড়ুই আসে। আমি ওদের জন্য চাল ছড়িয়ে রাখি ,কী সুন্দর.. ছোট্ট ঠোঁট দিয়ে খুঁটে খুঁটে খায়। একটার ঠোঁট ঠিক তোর মতো কালো আর একটার ঠোঁট আমার মতো ” – এক নিঃশ্বাসে চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে কথাগুলো বলে গেল মিলি।
” এই , চড়ুই বিড়ি খায় ? “– তিয়ানের প্রশ্নে মিলি খুব মজা পেল।
” কি জানি খায় হয়ত, তা না হলে ওর ঠোঁট তোর মতো কালো হবে কেন ? ”
তিয়ান আর মিলি দুজনে বিদ্যাসাগর কলেজের স্টুডেন্ট, একই সাবজেক্ট কেমিষ্ট্রি নিয়ে পড়ে।
কলেজেই আলাপ ,তারপর চোখে চোখে নিজেদের হারিয়ে ফেলা খুব তাড়াতাড়ি। বয়সের ধর্ম ?..….কে জানে হবে হয়ত ! হয়ত নয় , তিয়ানকে দেখে মিলির মনে হয়েছিল… এই সে ….সে এইইই….যাকে ও হাজার বছর ধরে খুঁজে চলেছে। তিয়ান ছোট থেকেই নাটক -আবৃত্তি এসব নিয়ে চর্চা করে।
বাইরের জগতের লোকের সম্বন্ধে অনেক খবর তার নখদর্পনে , ক্লাস ইলেভেনেই এঁচোড়ে পাকার মতো …আর তারপর পয়সার টানাটানিতে এখন বিড়িতে অভ্যস্ত। অবশ্য মিলিকে কথা দিয়েছে …ও না কি আর বিড়ি খাবে না।
সরল-মনা মিলির, তার ভালোবাসার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। সে জানে …যতই কষ্ট হোক, তিয়ান নিশ্চই আর বিড়ি ছোঁবেও না। বাইরের জগত সম্বন্ধে ওর জ্ঞান বিশেষ নেই , কিন্তু নিজের প্রতি অটুট আত্মবিশ্বাস আছে ….সে তার ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীর সব বড় বড় প্রাচির ভেঙে ফেলতে পারে।
তিয়ান একটু আত্মভোলা টাইপের ছেলে। ভালো সে মিলিকে বাসে কিন্তু কেবল ওকে নিয়েই পড়ে থাকে না। নাটক,পড়াশোনা, আবৃত্তি …এইসব জগতের নানা জ্ঞানী-গুণী মানুষের সান্নিধ্যে ডুবে থাকে মন।
মিলি আবার অন্য ধরনের…তিয়ানের প্রেমের পরশে মনে তার গভীর আলোড়ন। সব কাজে , সব কথাতেই তার তিয়ানকে চাই। গল্প করা, কোথাও বেড়াতে যাওয়া, পড়াশোনা এমনকি রাতে শুয়েও চোখ বন্ধ করে তিয়ানের ছোঁয়ায় ডুবিয়ে রাখে শরীর… মন।
পড়াশোনায় মন নেই মিলির। ফার্ষ্টইয়ারের রেজাল্ট ও যথেষ্ট খারাপ করল। তিয়ান কিন্তু ভালোভাবে পাশ করে সেকেণ্ড ইয়ারে উঠল। প্রতিদিন মিলি বুঝতে পারে, তিয়ান আর তার প্রতি আগের মতো আকর্ষণ বোধ করে না। কি করবে…ও বুঝতে পারে না। মনে মনে যে অনেকদূর এগিয়ে গেছে মিলি। তিয়ানের উদাসীনতা ওর নরম ফুলের মতো মনকে ক্রমাগত আঘাত করে করে ক্ষত-বিক্ষত করে তোলে।
একদিন কলেজে ২-৩ টে ক্লাস অফ্, স্যার আসেননি। রাস্তায় বিশাল মিছিল বেরোনোর কথা, সেই ভয়ে মাত্র কয়েকজন প্রফেসর কলেজে এসেছেন। মিলির তো পোয়া বারো, তিয়ানের হাতটা ধরে টানতে টানতে পাঁচতলার বারান্দার একটা কোণে নিয়ে এল নিরিবিলিতে।
দৌড়ে দৌড়ে উঠে দুজনেই হাঁফাচ্ছে। হঠাৎ মিলি খুব কাছে সরে এল তিয়ানের …” চল আমরা দুজনে পালাই “।
” মানে ?” ….তিয়ান তো অবাক।
মিলি বলল ” চল না , কোথাও চলে যাই ! ভালো লাগছে না আর তোকে ছেড়ে থাকতে। ”
” তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে ? বেসিনে গিয়ে ভালো করে মাথায় জল দে। হাতে যখন টাকা- পয়সা থাকবে না …তখন হাঁ করে এরকম আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখবি ….ওওই পায়রাটার মতন তোর প্রেমও ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে …সেইই সুদূরে।”
তিয়ানের কথা শুনে নিরাশ গলায় মিলি বলল …” না রে , দুজনে যদি ভিক্ষে করেও খাই …আমার ভালোবাসা কোনদিন কমবে না , …দেখে নিস। ”
মিলির অদম্য আবেগটা যেন তিয়ানের ঠাণ্ডা স্বরের তলায় চাপা পড়ে গেল।
একটু দম নিয়ে বলল ” তিয়ান , আমি তোকে যতটা আপন করে চাই , তুই বোধহয় আমায় সেভাবে চাস না ….তাই না রে ? ”
তিয়ানের আরও সহজ উত্তর …” তুই এত ভাবিস কেন বলতো ?”
মিলি আর বলতে পারে না …” তুই ভাবিস না বলেই যে আমি ভাবি।” বলতে পারে না ….” এত তাড়াতাড়ি ….এতটা শীতল হয়ে গেলি কি করে ?”
মনটা কালো মেঘে ঢাকা আকাশের মতো থমথম করছে , যখন তখন বৃষ্টি নামবে। অথচ তিয়ানের সামনে সে নিজের দূর্বলতা প্রকাশ করতে চায়না ।
” চল , লাইব্রেরী থেকে বই চেঞ্জ করতে হবে ” …মিলি কিছু বলার আগেই তিয়ান বলে উঠল ।
আবার ধাক্কা ! … এবার বোধহয় নিজেকে ও আর সামলাতে পারবে না । চোখের কোণাগুলোও ভিজে গেছে , কোনরকমে মুখটা ঘুরিয়ে তিয়ানের আগেই ওখান থেকে বেরিয়ে এল ।
আজ দোল-পূর্ণিমা , বাড়িতে নারায়ণ পুজো হয়েছে । কাল দোল খেলবে সবাই । মানুষ , রাস্তাঘাট , এমন কি কোন কোন বাড়ির দেয়ালও রাঙা হয়ে উঠবে। রঙ নেই শুধু মিলির মনে । একা একা রাতের অন্ধকারে ছাদে চলে এসেছে ও …রক্তাক্ত হৃদয়ে চাঁদটাকেও ওর ভালো লাগে না । কেমন যেন নিষ্প্রভ, ফ্যাকাশে মড়া মুখের মতো । ভাবলেশহীন, অনুভূতিহীন চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল কিছুক্ষণ । কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না । কি চায় তিয়ান ? আর কি কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না ? তাহলে পরিস্কার বলেই বা দিচ্ছে না কেন ? এভাবে দোটানায় ঝুলে থাকতে যে ভালো লাগছে না …
আগের মতো আর কথা বলে না তিয়ান । চিঠি লিখলে উত্তর দেয় না , অফ পিরিয়ডে মিলি ডাকার আগেই কাজের বাহানা করে বাইরে বেরিয়ে যায় । তিয়ান ওকে অ্যাভয়েড কেন করছে ? ও কি অন্য কাউকে ভালোবাসে ?
একদিন কলেজ ক্যান্টিনের মুখে চুপিসাড়ে এসে তিয়ানকে ধরে মিলি ….” তোর সাথে আমার কিছু কথা ছিল । তুই আমার সাথে আর কথা বলিস না কেন ? ”
” আমার এসব এখন ভালো লাগছে না মিলি … গ্র্যাজুয়েশনটা কমপ্লিট করতে দে , তারপর ভাবব ” তিয়ানের উত্তর
” যখন সম্পর্কটা তৈরী হচ্ছিল তখন মনে হয়নি তোর ? এতবড় সর্বনাশটা কেন করলি তিয়ান ? কি এমন অপরাধ করেছিলাম রে ….যার জন্য এতবড় শাস্তি দিলি ? ” …মিলি হঠাৎ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল সবার সামনে ।
আশেপাশে সবাই ওদের দেখছে , তিয়ান কলেজে এস.এফ.আই করে বলে ওকে সবাই চেনে । চারদিকে জোড়া জোড়া জিজ্ঞাসু চোখ ওদের ঘিরে ধরছে । তিয়ান তাড়াতাড়ি মিলিকে চুপ করাতে চাইল । কিন্তু মিলির আবেগে আজ ভরা নদীর বাণ ডেকেছে ….ও কিভাবে নিজেকে থামাবে আজ ?
” এই তুই চোখ মুছে ক্লাসে যা , পরে তোর সাথে কথা বলব ।” …বলেই তিয়ান ওখান থেকে সরে যায়।
” আজ দশ মিনিট দেরীতে কি তোমার সূর্য উঠেছে সুইটহার্ট ? ” …পিয়ালির সানগ্লাস পরা মুখের দিকে তাকিয়ে লাল লিপষ্টিকে ঢাকা ঠোঁট দুটোতে আটকে যায় তিয়ানের চোখ ।
” আরে ওই মেয়েটাকে চেনো তো …মিলি …না কি যেন নাম ! সেই ফার্ষ্টইয়ার থেকে আমার পেছনে পড়ে আছে । যখনই সুযোগ পায় এমনভাবে তাকায় …এমনকরে কথা বলে …!”
পিয়ালি ঠোঁট টা কামড়ে তিয়ানের কানের কাছে মুখটা এনে বলে ….” এইসব অর্ডিনারি মেয়ের জন্য তুমি পৃথিবীতে আসোনি ডারলিং ”
কয়েকদিন থেকে কানাঘুষো শুনছে মিলি ।
মেয়েটাকে আগেও দেখেছে , তবে এসব ছোট ছোট ব্যাপার নিয়ে সন্দেহ করার মতো ছোট মন না ওর, তাই প্রথমেই হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল । এখন পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে যাচ্ছে , যত দিন যাচ্ছে …তিয়ানের এই ঠাণ্ডা চোখ মিলির শরীরে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে । সবসময় এক অসহ্য যন্ত্রণায় ও দিশেহারা ঝোড়ো মৌসুমী বায়ুর মতো ছটফট করে বেড়ায় । কাজে মন বসাতে পারে না । ভালো গান গাইত মিলি, মাঝে মাঝে কম্পিটিশনে নাম দিয়ে অনেক প্রাইজও পেয়েছে ।
গাঢ় নীল আকাশের মাঝে কচি কচি সবুজ পাতাগুলো নতুন বসন্তের নরম রোদে চকচক করছে । মৃদু মিষ্টি হাওয়ায় এক অজানা আবেগে পাতাগুলো তিরতির করে কাঁপছে । একপলকে মিলির মন ভালো হয়ে গেল …পৃথিবীটা কি সুন্দর !
কিন্তু আজকাল প্রাইজ তো দূরের কথা …গানের সুর পর্যন্ত ভুলভাল করে ফেলছে । নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস আস্তে আস্তে তলানিতে ঠেকেছে । ও যে কোন ভালো কাজ করে দাঁড়াতে পারে…একথাটাই আর বিশ্বাস করতে পারে না ।
সারাদিন অন্যমনস্ক থাকার জন্য …মায়ের কাছে , বাবার কাছে এমনকি প্রাইভেট টিচারদের কাছেও বকুনি খেতে লাগলো ।
সবাই ওর কাজের ভূল ধরে …কেউ বুঝতে চায়না মেয়েটা কেন এত ভুল করে ।
এভাবে চলতে চলতে, একসময় নিজের প্রতি বিতৃষ্ণায় এলো, এই যন্ত্রণাটাকে বয়ে বেড়াতে মন চায় না । জীবনটা শেষ হয়ে যাবে অকালে …তা যাক , কিন্তু এই অসহ্য যন্ত্রণার বিরাট বোঝাটা তাকে বয়ে বেড়াতে হবে না , কেমন যেন একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে ভেতর থেকে।
অবশেষে বোধহয় মুক্তি মিলতে চলেছে।
কোথাও চলে যাবে ? ..
অন্য আর কিছু ও ভাবতে চাইছে না। ক’টা দিনই বা বাঁচবে ? নিজেকে বেশ উদার মনে হল তার। পায়েলের সাথে তিয়ানকে দেখে আজ আর অন্য দিনের মতো জ্বালা ধরেনি তার। বরং একটা স্নিগ্ধ-কোমল দৃষ্টির জ্যোতিতে তিয়ানের সর্বাঙ্গ ও ধুইয়ে দিচ্ছিল। তিয়ানের সব অপরাধ ক্ষমা করে তাকে কলঙ্কমুক্ত করতে চাইল , অনেক ঝগড়া,অনেক অভিমান করেছে ও তিয়ানের ওপর। ইচ্ছে করে ওকে আঘাত দেওয়ার জন্য সমীরের সাথে বেশী বেশী করে কথা বলা , অকারণে জোরে জোরে হেসে তিয়ানের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে , যদিও কোন ফলই হয়নি । তবু ওকে কষ্ট দিয়েছে বলে আজ মিলির বড্ড মায়া হল। মনে মনে অনেক বার চোখ ভরা জল নিয়ে ক্ষমা চাইছিল সে। তিয়ান ওর চোখের এই অদ্ভূত দৃষ্টি লক্ষ্য করেনি , করলে বুঝত … এই সুন্দর ফাল্গুনের আকাশ নিম্নচাপের জেরে এক ভীষণ আয়লা পৃথিবী ভাসাতে আসছে।
আচ্ছা …ভালোবাসা মরে যাওয়া চোখ কি ভালোবাসার গল্প পড়তে পারে না ? কিন্তু তিয়ান তো এখন পিয়ালির চোখের ভাষা অনায়াসে পড়তে পারে ,তবে মিলির চোখের ভাষা কেন পড়তে পারে না ?
থাক , আজ আর কোন অভিমান নেই মিলির।
ও নিজেকে এসবের থেকে এত দূরে সরিয়ে নেবে …যেখানে কোন কষ্ট , কোন যন্ত্রণা আর ওকে ছুঁতে পারবে না। কিন্তু মিলি জানত না জীবনের বাঁকে বাঁকে রাশি রাশি চমক লুকিয়ে থাকে।
সেদিন সকাল থেকেই মিলি এক অজানা উত্তেজনায় কাঁপছে। তিয়ান কে হারানোর দুঃখটাও যেন তাকে ছুঁতে পারছে না , শুধু একটা দৃশ্য চোখের সামনে সাজানোর চেষ্টা করছে । একটা চাপা ভয় তাকে তিল তিল করে যেন গিলে নিচ্ছে। ভয়ে …উত্তেজনায়…আতঙ্কে মিলি থরথর করে কাঁপতে থাকে। কোথায় চলে গেল তিয়ানকে হারানোর দুঃখ …সেই দুঃসহ কষ্ট গুলো …?
আজ আকাশটা বড় সুন্দর , নীল আকাশে ওই বড় মেহগনি গাছটা কেমন ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে ! মিলির পড়ার ঘরের জানলা দিয়ে দেখতে পেল কচি কচি সবুজ পাতায় ভরা মেহগনি গাছটাকে।
বসন্তের আগমনে পুরনো পাতাগুলো ঝরিয়ে গাছটা ক’দিন একেবারে নেড়া হয়ে গেছিল, ডালপালা গুলো শুধু দাঁড়িয়ে ছিল । গাঢ় নীল আকাশের মাঝে কচি কচি সবুজ পাতাগুলো নতুন বসন্তের নরম রোদে চকচক করছে । মৃদু মিষ্টি হাওয়ায় এক অজানা আবেগে পাতাগুলো তিরতির করে কাঁপছে । একপলকে মিলির মন ভালো হয়ে গেল …পৃথিবীটা কি সুন্দর ! কত মানুষও দৈহিক কষ্ট সহ্য করে বেঁচে থাকে , আর ওর তো সব ঠিকঠাক আছে । একটা সুস্থ সবল শরীর আছে । এই আকাশ, গাছ , কোকিলের ডাক, চড়াইয়ের কিচির-মিচির ,গতবছর দেখে আসা সমুদ্রের ঢেউ কিম্বা কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথায় সূর্য ওঠা…ও কি পারে না শুধু এগুলোর জন্যই আরও কিছুদিন বেঁচে যেতে ? মনখারাপ তো তিয়ানের হাওয়ার কথা…ওর কেন হচ্ছে ? চাইলেই তো ও এমন তিয়ান অনেক পাবে…কিন্তু তিয়ান তো চাইলেও এরকম একটা মিলি পাবে না।
♦–♦♦–♦♦–♦♦–♦
❤ Support Us








