- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- মার্চ ১, ২০২৬
ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ
অলঙ্করণ : দেব সরকার
আমাদের আমোদ কমে আসার কারণগুলি নতুন করে বলার আর কোনও দরকার আছে বলে মনে হচ্ছে না। সবাই জেনে গিয়েছিল আমেরিকা হেরে গেলে আর কেউ না হোক রীতি, তরী ও তারার বসন্ত উৎসব। অধ্যাপক জয়গোপাল খাসনবিশ জিগাইলেন, তোমরা জানো এই মাতামাতির কারণ ? তারা বলল, আপনি রামের পক্ষে থাকুন বা না থাকুন, রাবণের পাছায় আগুন লাগলে কার না মজা লাগে ? অধ্যাপক গম্ভীরজলদ গলায় জানালেন, ওহে ছোকরা পোস্ট-কলোনিয়াল এম্পিরিয়ালিজমের কতটুকু তোমরা জানো হে ! তোমরা কি আর্য ? রীতি এক চোখ চেপে রেখে স্মিত হাসিতে জানালো, আপনি কিন্তু আবার একটি ফ্যালাসিতে পা সেঁদিয়ে দিচ্ছেন অড্ডাপক্ক মশাই। জলদগম্ভীর জিগাইলেন, কীরকম ? রীতি পুরো খাপ না খুলেই বলল, আরে মশাই, অতো আর্য-অনার্য, আরবি-আজমি, মুহাজের-আনসার এই সব ডাইকোটমিতে ছেলেপুলেদের টেনে নিয়ে যাচ্ছেন কেন ? সোজা কথায় তাদের অহিংস জাতীয়তাবাদের পাঠ দিন না, ল্যাঠা চুকে গেল। আমরা রাত জেগে রেডিও শুনছিলাম। ভালূ পোদ্দারদের টিভি আছে, তাদের জবরদস্ত ঘুমও আছে, তাই হেবোপাড়ার বাইরে শুধু তারা টলিউডের খবরাখবর রাখে। কে আর সিরিয়া, মিশর নিয়ে ঘুম নষ্ট করে। ওদের বাড়ির কুকুরটি জুলুজুলু চোখে তখনও তাকিয়ে ছিল। পাহারা দিতে দিতে তার চোখের জ্যোতি কমে আসছে ক্রমে। আমরা বুঝতে পারি। সে কি জানে কাদের পাহারা দেয় সে ?
ভালু পোদ্দার বন্দুকবাহিনি পোষেন। একে ‘আপনি’ বলার কোন মানে হয় না। এ ‘তুই’ গোত্রের। ‘তুমি’ ঠিক আছে। পুরন্দরপুরের ভূমিচাষীদের বাদার খালপাড়ের চটের তাঁবুগুলো চোদ্দোই ফেব্রুয়ারি রাত দুটোয় পুড়িয়ে দিয়ে এসে দিশি মোরগের ঝোল আর বিলিতি মাগুর দিয়ে দুধেশ্বর চালের ভাত খেতে খেতে তাপস পালের সিনেমা নিয়ে গল্প করছিল ভালু। সে সাদা পায়জামার ওপরে সাদা পাঞ্জাবি পরে। পায়ে সাদা চামড়ার স্যান্ডেল, হাতে সাদা ঘড়ি, সিলভার ফ্রেমের বিনা পাওয়ারের চশমা। তিনতলা অট্টালিকাও সাদা হোয়াইট হাউস। পুড়ে যাওয়া বস্তিগুলোর ধারের কালো কালো ঘাসের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আমরা রেডিও শুনছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কোন চ্যানেল ধরব। তরী বলল, বিসিসি ধরিস না। ওটা কোনদিন মাসের ছিল না, কিছু জনমোহিনী প্রোগ্রাম দিয়ে কি আর মন পাওয়া যায় ! তারা কান চুলকোতে চুলকোতে বিড়ি টানছিল। বিড়ি পুড়ে যেতে আর কয়েকটা টান। কুচ্ছিত অন্ধকারে সেই লালটুকু, পোড়া কালচে রক্তলালটুকু আমাদের বুকে জ্বালা ধরাচ্ছিল। আমি বললাম, এই শালা, আরেকটা ধরা, জোরে চেপে টান দে, বুকের ভেতরে সিলিন্ডার ভর্তি কর ঠেসে, কাশ, বমি কর। এই শান্তি আর ভাল লাগছে না। রীতি আমার মাথায় হাত বুলোতে লাগল, আহা রে , আমার সোনা ছেলে, মনা ছেলে, জানু ছেলে, কানু ছেলে। তারা রেডিওর কান মটকে দিল, শোন আলজাজিরা শোন, এরা ঠিক খবর দেবে। রীতি তিতকুটে হয়ে চামচিকের মতো বলল, কেন আলজাজিরা কি হিজবুল মুজাহিদিনের বাপের চ্যানেল শালা ? একটুও না চটে তারা নরমসরম গলা রাখে, না, এরা অন্তত আমেরিকার বাজারে বিক্রি হয়ে যায় নি। তাছাড়া আলকায়দার সমস্ত গোপন টেপ এরাই তো জোগাড় করে আনে। রীতির ঠান্ডা হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, এই কুত্তার বাচ্চা ! যে ভিডিওগুলোয় দেড়ে লাদেন মাথায় মুগলি পাগড়ি চাপিয়ে ডান হাতের একটা আঙুল তুলে চেতাবনি দেয় সেগুলো যে আমেরিকার কোন স্টুডিওয় শ্যুটিং করা নয় তুই বলতে পারবি ? আর লোক মরলেই কোথাকার গেঁড়েদাস পালের গোদা টিভিতে এসে বলে যাচ্ছে এ সব তারাই করেছে। যত্তসব সাজানো সঙ। সবাইকে এত বোকাচোদা ভাবার অধিকার কে দিল ওদের ? পুঁজি ? প্রযুক্তি ? তারা বরফশান্ত, বরফকঠিনভাবে বলল, তুই খেয়াল করছিস না রীতি, ম্যাসাকারের চক্রী যে ই হোক, আল কায়দা যদি নিজে দায় স্বীকার করে নেয় তাহলে যে বার্তাটা তারা দিতে চাইছে বস্তিবাসী মুসলিমদের কাছে তাতে সেন্ট পার্সেন্ট সফল। কী বার্তা ? রীতি জিগায়। এই বার্তা যে ‘আমরা’ মানে বেরাদারানে ইসলাম শক্তিহীন নয়। প্রত্যাঘাত করতে আমরাও পারি। যখন একজন বঞ্চিত মাথা তোলে আর শুয়ে থাকা অন্যান্য বঞ্চিতরা দেখে আরে ওই লোকটা আমাদের ভাষায় কথা বলছে এবং ওর দেহীগড়ন হুবহু আমাদের মতন, তখন তো একটা গণ ইনকিলাব এসে যাবে রে। এটা একভাবে মোল্লাতন্ত্রের অভ্যুত্থানের কৌশলী ডাক। তারা ব্যাখ্যা করে হাত পা মাথা নাক কান চোখ আঙুল নেড়ে। আমি নিস্পৃহ, কিন্তু একদলের মৃত্যুতে মোমবাতি জ্বলে আর অন্যজনের মৃত্যুতে মাংস রান্না হয়। শিবাজিকে মনে আছে ? সে তো গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গেল আজীবন, পাহাড়িপথের চৌখাম্বায় আটকে আওরঙ্গজেবের মানুষজনদের পাথর চাপা দিয়ে মেরেছে। তারা ফিচ করে করে বলল, এটা কী ? একেই বীরত্ব বলে রে। তোরাবোরায় ‘সন্ত্রাসী’দের পারিবারিক বিছানা থেকে ঘুমন্ত কন্যাকে তুলে তার কোমরে বীর্য ঢেলে দেওয়ার নামই বীরত্ব। সিরিয়া মিশর লিবিয়া প্যালেস্তাইনের মাটির তলায় খনিজ তেল বয় আর মাটির ওপরে অপেক্ষাকৃত কমদামি লালরঙের পিচকারি খেলা হয়। কে মারে, কে মরে ? আমি প্রাণপণে জিগাই। তারা আমার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলে, সোনু আমার, মনু আমার, জানু আমার, কানু আমার, মন খারাপ করে না। দ্যাখ পোড়া ঘাসগুলোর গোড়ায় তাকা, সবুজ সবুজ কী গজাচ্ছে বলত, কী গজাচ্ছে ? ভালু পোদ্দার ইমারত তুড়ে দিয়েছে, ভিতে কিন্তু পৌছতে পারেনি। ভেবে দ্যাখ, ঘাসদানার বাইরে যে জগত, যেখানে শিস বেরিয়ে রমরম করছিল, ভাদু শেখেদের থাকার জন্য মাদুর বিছিয়ে দিয়েছিল, তুই কি জানিস, ভাদুকাকার মেজ মেয়ের একটা বদমাইশ বাচ্চা হয়েছিল কদিন আগে, তার নাম রেখেছিল জিয়া হক, জিয়া মানে আলো আর হক মানে সত্য, তো যাইহোক ভালু পোদ্দার শুধু ওই মাদুরটা পুড়িয়েছে, দানার ভেতরকার প্রাণ ওই দ্যাখ। আমি রীতির পায়ের ওপর মাথা দিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। রীতির বড় বড় চুল তারা বুকের ওপর ভোরের ধাক্কায় দুলছে, তারার পা আমার কোলের ওপর।
খালের নীলচে পানাফুলের গায়ে ভোরের নীলচে এসে লাগছে। এর মধ্যে রেডিওটা তখনও বাজছিল। কী একটা ভাষায় গান চলছে। আমাদের নদীনালার গানের যেরকম চলন সেরকম অনেকটা। কাউকে না জাগিয়ে ওভাবেই শুয়ে শুয়ে শিশিরে হাত ধুচ্ছি আর ভাবছি কোন ভাষার অনুষ্ঠান চালিয়ে দিল তারা ! একটু দূরে একটি কেজো শাড়ি পরা মেয়ে কাঁখে কলসির বোঝা নিয়ে খুব ধীর সাবধানী পায়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ওইদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমি তারা আর রীতিকে আলগোছে নাড়া দিয়ে আধজাগা করে দিচ্ছিলাম। মেয়েটির পায়ে চপ্পল নেই, একটা রূপোর দুবিন্দুর ছমছমী পা-বাহার, বাজছে, রক্তলাল শাড়ি হাঁটু আর গোড়ালির ঠিক মধ্যিখানে এসে থেমেছে, ফর্সা সূর্যোদয়ের মতো পা জেগে জেগে উঠছে প্রতিটি পদক্ষেপে। ততক্ষণে তারা আর রীতি উঠে বসে চোখের পিচুটি কচলাচ্ছে। আরেকটু কাছে আসতেই চিনতে পারলাম তাকে। এ তো ভালু পোদ্দারের একমাত্র কন্যা কস্তুরী। স্কুলে যায় না, বাড়িতে মাস্টারমশাই এসে ওকে পড়িয়ে যায়। কৈশোর পার করেছে সদ্য। সেই আভা এখনও মোছেনি। আমাদের সামনে কাঁখের কলসি নামিয়ে রেখে কস্তুরী বলল, তারাদা, রীতিদা, তরীদা। আমরা তাকিয়ে রয়েছি। সবাইকে দাদা বলে সৌজ়ন্য না করলেও চলত, হয়ত ওর গুরুমশা ওইভাবেই শিখিয়েছেন। কস্তুরী বলল, তোমরা কোথায় থাকো সারাদিন সারারাত ? তারা চুলে হাত বুলোতে বুলোতে নিজের জামার বোতাম ঠিক করতে লাগল, কেন বলো তো ? ও বলল, বাবা তোমাদের খুঁজছেন। রীতি শ্লেষ মেশা গলায় জিগালো তার কারণ। বাবা তোমাদের তিনজনকে পশ্চিম মাঠের আমাদের যে তিনশ বিঘা জমি আছে তার ম্যানেজার করতে চায়। কস্তুরীর আনন্দ। আমি বললাম, কী বললে ? কস্তুরী একই কথার পুনরাবৃত্তি করে, বাবা তোমাদের তিনজনকে পশ্চিম মাঠের আমাদের যে তিনশ বিঘে জমি আছে তার ম্যানেজার করে দিতে চায়। আমরা গান্ডু মেরে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে করতে ঘাড় চুলকোতে লাগলাম। তারা এতক্ষণ বসে ছিল, উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আমরা পরে জানাচ্ছি। তুমি বাড়ি যাও। কস্তুরী চলে গেলে আমরা অনেকক্ষণ কেউ কারোর সঙ্গে কথা না বলে, কেউ কারোর দিকে না তাকিয়ে নিজেদের নিঃশ্বাস শুঁকতে লাগলাম। এখনও জায়গাটা থেকে পোড়াপোড়া গন্ধ বেরুচ্ছে। তারা জিগালো, আচ্ছা পশ্চিম মাঠে দক্ষিণে ভোলা মাঝিরা কয় ঘর থাকে রে ? চার-পাঁচ ঘর। রীতি পরিসংখ্যানবিদ। এরা কোথাকার আদি লোক জানিস ? তারা জিগায়। না। এখানে তো নদী নেই, তাইলে ওরা এখানে কী করছে ? জানি না। ওদের মেয়েছেয়েদের চরিত্রটরিত্র ভালোটালো তো ? কী জানি। না, মানে কয়েক ঘরের জন্যে পুরো হেবোপাড়ার বদনাম হতে পারে যদি কোন কেচ্ছা হয় আর কি। হুম। আর যদিও ভালু পোদ্দারের নিজের জমি নয়, খাসজমি দখল করা, তাতে কি, এতদিন একজনের জমিতে থাকাটাও, সে যত সামান্য জমিই হোক, খুবই অমানবিক। হুম। রেডিওটা বাজছে। গানও শেষ হয়ে বিজ্ঞাপন শুরু হলে বলে অনুষ্ঠানের নামটাই শোনা গেল না। ঘাসপোড়া আর শিককাবাবের গন্ধ একই লাগতে শুরু করেছে। অনেক দূরে পানের বরজ, তালগাছগুলো মাথা চাড়া দিয়ে কুলোর মতো পাতা নিয়ে গজরাচ্ছে।
শকুনরা উড়ে উড়ে ভাগাড়ের দিকে যাবে বলে তালগাছের মাথা থেকে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে। শকুনের গলায় কোন পালক নেই। এই না-পালক তার চেহারাকে আরো কদাকার করে ভয়বহুল করে তুলেছে। তাদের দেখে অন্য পাখিরা উড়ে পালালো। রেডিওর বিজ্ঞাপন শেষ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। একটি সুসুরেলা কন্ঠ এতক্ষনে ইংরেজিতে ঘোষনা করল, ইউ ওয়্যার লিসেনিং, ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ আন্ড আই এম ইওর ফ্রেন্ড ক্লদিয়া। তারা পোঁদের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ভালু পোদ্দার লোকটা আসলে মন্দ না বুঝলি!
❤ Support Us








