- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- মার্চ ৮, ২০২৬
প্রেমচাঁদের পয়জার
চিত্রকর্ম : ভিনসেন্ট ভ্যানগঘ। ক্যানভাসে তেলরঙ। ১৮৮৮
তরজমা : ইমরাজ হাসান
আমার সামনে প্রেমচাঁদের ছবি। স্ত্রীর পাশে বসে আছেন। মাথায় মোটা কাপড়ের টুপি, পরনে কুর্তা আর ধুতি। গালের হাড় উঁচু, গালপাট্টা, ঘন গোঁফ তাঁর মুখভর্তি করে রেখেছে। গম্ভীর, সামান্য কৃশকায়, কিন্তু মুখে এমন এক অদ্ভুত হাসি, যা দেখে মনে হয় তিনি আমাদের সকলের গোপন দুঃখ-দুর্দশার হিসাব জানেন। সব মিলিয়ে একেবারে নির্লিপ্ত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের অবতার।
ওঁর পায়ে ক্যানভাসের জুতো, ফিতেগুলো এলোমেলোভাবে বাঁধা। ফিতে যদি অসাবধানে বাঁধা হয়, তবে আগলেট খুলে যায়, আইলেটের মধ্যে দিয়ে ফিতে পরানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন ফিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় একরকম আন্দাজের ব্যাপার। ডান পায়ের জুতো ভদ্র, সংযত, সমাজমুখী। আর বাঁ পায়ের জুতো একেবারে বিদ্রোহী। তার গায়ে বড়সড় ছিদ্র, আর সেই ছিদ্র দিয়ে পায়ের একটি আঙুল উঁকি দিচ্ছে।
আমার চোখ আটকে রইল ওই জুতোটিতে। ভাবতে শুরু করি, যদি ছবির জন্য তিনি এ পোশাক পরে থাকেন, তবে সাধারণ সময়ে তিনি কী পরতেন ? না, এই মানুষটির বিশেষ উপলক্ষের পোশাক বলে কিছু ছিল না। পোশাক বদলানোর কৌশল তাঁর জানা ছিল না। তিনি যেমন আছেন, তেমনভাবেই ছবির জন্য বসেছেন।
তাঁর মুখের দিকে তাকাই। হে আমার সাহিত্যিক পূর্বপুরুষ, আপনি কি জানেন আপনার জুতোর মধ্যে ছিদ্র আছে এবং একটি আঙুল বাইরে উঁকি দিচ্ছে ? আপনি কি তা অনুভব করছেন ? এতে কি আপনার লজ্জা হয় না ? আপনি কি বোঝেন না যে ধুতির প্রান্ত একটু নামিয়ে দিলে ওই উঁকি দেওয়া আঙুলটি ঢেকে যেতে পারত ? এতকিছুর পরও আপনি কেমন করে এমন নির্ভার, এমন আত্মবিশ্বাসী ! আলোকচিত্রীর ‘রেডি প্লিজ’ নির্দেশে আপনি হয়তো ব্যথার গভীর কূপ থেকে একটুখানি হাসি টেনে এনেছিলেন; আর আলোকচিত্রী ‘ক্লিক’ করে বলেছিলেন, ‘ধন্যবাদ।’ এই অর্ধেক-মন-দেওয়া হাসিতে প্রাণঘাতি ব্যঙ্গের সুর লুকিয়ে আছে।
কেমন মানুষ আপনি ? নিজে ফাটা জুতো পরে অন্যকে বিদ্রূপ করার সাহস রাখেন ! এ যে বিরল প্রতিভা। আমরা তো সাধারণত উল্টোটাই করি, নিজের জুতো চকচকে রেখে অন্যের পায়ের ধুলো গুনি। ছবি তুলতে যাচ্ছেন যখন, অন্তত একজোড়া ভালো জুতো পরতে পারতেন। ছবি তোলার প্রয়োজনই বা কী ছিল ? এড়িয়েও যেতে পারতেন। হয়তো আপনার স্ত্রীই অনুরোধ করেছিলেন, আর আপনি ‘ঠিক আছে’ বলে বিরস বদনে, নির্লিপ্ত হয়ে বসে পড়েছিলেন। সত্যিই করুণ ব্যাপার, একজন মানুষের ছবি তোলার মতো উপযুক্ত জুতোও নেই। এ ছবি দেখে আপনার দুর্দশা অনুভব করে আমি প্রায় কান্নায় ভেঙে পড়ি, কিন্তু আপনার মুখের যন্ত্রণামিশ্রিত তীক্ষ্ণ হাসি আমাকে থাপ্পড় কষিয়ে থামিয়ে দেয়।
শতাব্দীর জমাট বাঁধা আবরণে আঘাত করতে গিয়ে আপনার জুতো ছিঁড়ে গেছে। আপনার পথ রুদ্ধ করে রাখা এক ঢিবিতে জুতো মেরেছেন। তাকে উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতেন। বাধার সঙ্গে আপস করা যায়। সব নদী পাহাড় ভেঙে পথ বানায় না—অনেকেই গতিপথ বদলে নেয়। আপনি সে আপস করতে পারেননি। হরিকে যে দুর্বলতা গ্রাস করেছিল— ধর্মের ডাক— আপনার মধ্যেও কি তাই ছিল ?
আপনি আসলে কখনোই ছবি তোলার গুরুত্ব বোঝেননি। বুঝলে কারও কাছ থেকে জুতো ধার করতেন। আমাদের সমাজে ধার করার ঐতিহ্য প্রবল। বিয়ের বাজারে অন্যকে দেখাতে ধার করা কোট, ধার করা গাড়ি, কেউ কেউ তো ছবি তোলার জন্য ধার করা স্ত্রী পর্যন্ত জোগাড় করে। ছবি তোলার জন্য মানুষ সুগন্ধি মেখে এমন দাঁড়ায় যেন ছবির ভেতর থেকেও আতরের গন্ধ বেরোবে। আর আপনি একটা জুতোও ধার করতে পারলেন না ! আপনি সত্যিই জানেন না। একটা টুপি পাঁচ আনায় কেনা যেত, কিন্তু জুতো পাঁচ টাকার কমে নয়। জুতো সবসময় টুপির চেয়ে দামি। আজকাল তো জুতোর দাম আরও বেড়েছে, এক জোড়া জুতোর দামে ডজন ডজন টুপি কেনা যায়। টুপি ও জুতোর দামের এই ফারাকের শিকার আপনিও ছিলেন। অর্থনীতির অসমতা শরীরে বয়ে বেড়িয়েছেন। আগে এ বৈষম্য আমাকে এত কষ্ট দেয়নি, যতটা আজ দিচ্ছে আপনার জুতোর ছিদ্রটি দেখে। আপনাকে বলা হয়েছে মহান গল্পকার, উপন্যাস-সম্রাট, পথপ্রদর্শক আরও কত কী ! অথচ আপনার জুতোর মধ্যে ফুটো।
আমার নিজের জুতো জোড়াও খুব ভালো অবস্থায় নেই। কিন্তু বাইরে থেকে দেখে কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই। আঙুল উঁকি দেয় না, কিন্তু আঙুলের নীচের তলা ক্ষয়ে গেছে। হাঁটতে গিয়ে আঙুল মাটিতে ঘষে, কখনো খসখসে জায়গায় লেগে রক্তাক্ত হয়। জুতোর তলা ফেটে যায়, পায়ের তলা জখম হয়, তবু তো আঙুল দেখা যায় না। আমার নিজের জুতোর কথাও বলি। বাইরে থেকে বেশ সম্ভ্রান্ত। ভেতরে তলা ক্ষয়ে গেছে। হাঁটতে গেলে আঙুল মাটিতে ঠেকে, কখনো রক্তাক্তও হয়— তবু বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এ আমাদের যুগের দস্তুর এটাই। ভদ্র, আড়ালপ্রিয়, সামাজিক। আপনার আঙুল দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আপনার পা সুরক্ষিত। আমার আঙুল অদৃশ্য, অথচ পা ক্ষয়ে যাচ্ছে। আপনি পর্দার আড়ালে লুকোনোর গুরুত্ব জানতেন না, আর আমরা লুকোতে খুব ভালোবাসি।
ফাটা জুতো পরে কত গর্বের সঙ্গে ছিলেন আপনি ! আমি তো তা পারি না। এভাবে ছবি তোলার চেয়ে সারা জীবন ছবি না তোলাই বেছে নিতাম।
আপনার বিদ্রূপময় হাসি আমাকে অস্থির করে দেয়। সে কী বলতে চায় ? কেমন হাসি এটি ?
হরি কি গোরুদান করতে পেরেছিল ?
শীতের সেই তীব্র রাতে হালকুর ফসল কি শূকর খেয়ে ফেলেছিল ?
সুজান ভগতের ছেলে কি মারা গিয়েছিল, ক্লাবে বসে থাকা ডাক্তার তাঁর চিকিৎসা করতে অস্বীকার করেছিলেন ?
না। মনে হয় মাধো তার মৃত স্ত্রীর কাফনের জন্য পাওয়া দানের টাকা মদে উড়িয়ে দিয়েছিল। আপনি সে কথা ভেবে হাসছেন !
আমি আবার আপনার জুতোর দিকে তাকাই। কীভাবে এই ফুটো হলো, হে লেখক ?
সব নদী পাহাড় ভেঙে পথ বানায় না—অনেকেই গতিপথ বদলে নেয়। আপনি সে আপস করতে পারেননি। হরিকে যে দুর্বলতা গ্রাস করেছিল— ধর্মের ডাক— আপনার মধ্যেও কি তাই ছিল ? হরি সেই ডাকে শৃঙ্খলিত ছিল। কিন্তু আপনার হাসি দেখে মনে হয়, ধর্ম আপনার কাছে শৃঙ্খল নয়, মুক্তি
আপনি কি ভবঘুরেদের মতো অবান্তর ঘুরে বেড়িয়েছেন ? না কি সুদখোর মহাজনের হাত থেকে বাঁচতে বহু মাইল হেঁটেছেন ?
হাঁটলে জুতো ক্ষয়ে যায়, ফুটো তো হয় না ! কুম্ভদাসের জুতোটিও ফতেহপুর সিক্রিতে যাতায়াতে ক্ষয়ে গিয়েছিল। তিনি অনুতপ্ত হয়ে বলেছিলেন— ‘আসা-যাওয়ায় জুতো ক্ষয়ে গেল, আর ঈশ্বরকে স্মরণ করতে ভুলে গেলাম।’ উদার দাতাদের সম্পর্কে বলেছিলেন— ‘যাদের দৃষ্টিতেই বেদনা জাগে, তাদের প্রণাম করতেই হয়।’
হাঁটলে জুতো ক্ষয়ে যায়, ফুটো তো হয় না। আপনার জুতোয় ফুটো হলো কীভাবে ?
মনে হয়, আপনি কঠিন কিছুতে বারবার লাথি মেরেছেন। শতাব্দীর জমাট বাঁধা আবরণে আঘাত করতে গিয়ে আপনার জুতো ছিঁড়ে গেছে। আপনার পথ রুদ্ধ করে রাখা এক ঢিবিতে জুতো মেরেছেন। তাকে উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে যেতে পারতেন। বাধার সঙ্গে আপস করা যায়। সব নদী পাহাড় ভেঙে পথ বানায় না—অনেকেই গতিপথ বদলে নেয়। আপনি সে আপস করতে পারেননি। হরিকে যে দুর্বলতা গ্রাস করেছিল— ধর্মের ডাক— আপনার মধ্যেও কি তাই ছিল ? হরি সেই ডাকে শৃঙ্খলিত ছিল। কিন্তু আপনার হাসি দেখে মনে হয়, ধর্ম আপনার কাছে শৃঙ্খল নয়, মুক্তি।
আপনার পা থেকে উঁকি দেওয়া এই আঙুল, অদেখা কিছু যেন দেখাতে চাইছে। আর আপনিও আঙুল নয়, পায়ের আঙুল দিয়েই এমন কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছেন, যাকে আপনি ঘৃণা করেন। আপনি কি সেই কিছুর দিকেই নির্দেশ করছেন, যাকে লাথি মারতে গিয়ে ফলে জুতো ছিঁড়েছে, আঙুল বেরিয়েছে। আপনি হাসছেন আমার উপর, আমাদের উপর; যারা আঙুল লুকিয়ে ক্ষয়ে যাওয়া জুতো পরে হাঁটছে, যারা সেই ঢিবিটিকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। আপনি বলছেন— ‘ওই যে, ওই জমাট অন্যায়ের দিকে তাকাও। ওই ঢিবিতে লাথি মেরে জুতো ছিঁড়েছি; আমার আঙুল বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু পা সুরক্ষিত, আর আমি হাঁটা থামাইনি। আর তোমরা আঙুল লুকোনোর উদ্বেগে পা-ই ক্ষয়ে ফেলছ। এভাবে বেশিদূর কী করে হাঁটবে ?’ আমি জানি। আপনার ফাটা জুতোর গল্প আমি বুঝেছি। আপনার আঙুল যে দিকে নির্দেশ করছে, তা বুঝেছি। বিদ্রূপময় হাসির মানেও বুঝেছি।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
হরিশঙ্কর পারসাই [১৯২৪- ১৯৯৫] : আধুনিক হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রম্য লেখক, প্রাবন্ধিক, উপন্যাসিক ও গল্পকার । কর্মস্থান জবলপুর । নিয়মিত লিখতেন ‘দেশবন্ধু’ পত্রিকায় । সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য তিনি পরিচিত । ১৯৮২ সালে তাঁর রম্যরচনা, ‘বিকলাং শ্রদ্ধা কা দৌর’ এর জন্য পেয়েছিলেন সাহিত্য অকাদেমি পুরষ্কার
❤ Support Us








