- গ | ল্প রোব-e-বর্ণ
- জানুয়ারি ৪, ২০২৬
দাই
দাদি, ও দাদি ! কুন্ঠে গেল্যা গো ? খুব বিপদে পড়ে আস্যাছি গো দাদি । একচিন বাহেরে আসো । দাদি ও দাদি…
সারারাত হাপুস নয়নে মেঘ জল ঢেলেছে । যা মাটির বুকে জমে উঠে হাঁটু ডুবিয়ে দিতে বসেছে প্রায়, খেটে খাওয়া মানুষের মাথায় হাত, ক’দিন যে কাজে বেরতে পারবে না তা আল্লাই জানে; ক্যামন হাহুতাশ করে, আসমানের দিকে তাকিয়ে মুখে চুক চুক করে । যদিও দিনের আলোর ঘুম ভাঙতে না ভাঙতে তল্লাটের সব জল স্রোত হয়ে কলকলিয়ে নেমে যেতে থাকে রাস্তার ঢাল বেয়ে ওপারের ক্যানেলে । বিশাল তাণ্ডবের পরে ক্লান্ত হয়ে আসা বুনো হাতির মতো এখন আকাশ । আকাশের বুকে কম্পমান বাতাসের সঙ্গে ধূসর মেঘ কোথায় যেন চলে যেতে থাকে । ঘরের পিছনের আতাগাছ, কলাগাছের ঢাউসপাতা চুঁইয়ে টপাস টপাস করে পড়তে থাকা বৃষ্টির ফোটা যেন গত রাতের ঝাঁপিয়ে নামা বৃষ্টির বিদায় জানানোর আয়োজন শুরু করে । আছিয়া বেওয়ার চোখদুটো বোধকরি এই সময় কপাল থেকে নেমে শরীরের শিরায় শিরায় জোর এঁটে বসে । বুড়ি মানুষ, হাতে পায়ের হাড়, কোমরের বাঁধন, পিঠের শিরদাঁড়া ব্যথায় ব্যথায় প্রথমরাতে ঘুমাতে পারে না কোনদিনই, তারওপর গতরাতে নারকেল গাছের বাগড়্যা ভাঙ্গার শব্দ, ডালপালার উথালিপাথালি আছড়ে পড়া, করোগেটের টিনের ঝনঝনানিতে থিতিয়ে আসা গা গতর শেষরাতে একরকম নিস্তেজ হয়ে আসে, ঢুলে পড়ে ঘুমে, তাই বিহ্যানের আলো নামতে থাকলেও সে ছেঁড়া কাঁথার তাপ্তিমারা বুকে নিথর হয়ে পড়ে থাকে । মৃদু একটা ডাক তার কানে ভেসে আসে; কে যেন ডাকে তাকে । আওয়াজ কানে গেলেও চোখ মেলে তাকাতে সময় লাগে তার । গায়ে কারও হাত পড়ে, চমকে ওঠে আছিয়া বুড়ি ।
— ওমা ! কেডারে ? এইছুড়া এমনঠ্যারা গায়ে হাত দিতে হয় ! আমি ঘুমের মানুষ পিলহ্যা চমকে যদি দাঁত কবাটি লাগ্যা যাতুক ! তখুন আমার দেখার কে আছে বুলধিনি ! বুড়িকে চমকে যেতে দেখে আগন্তুক ফ্যাসফ্যাস করে চাপা আওয়াজে হাসে, হাসি থামিয়ে বলে, তুমাকে সেই কখন থাক্যা ডাকছি যে, রা কাড়ছ ন্যা ক্যানে ! আছিয়া বুড়ি সেই কবে স্বামীকে হারিয়েছে, এ জীবনে আপনজন বলতে ক্যাবল প্রতিবেশি । আত্মীয়স্বজন বলতে বাড়ির চারপাশের আম-জাম-কাঠাল গাছ, যারা তাকে দিনরাত পাহারা দেয় । এক সময় রাতদিন না মানা মানুষ, ইদানিং দিনের আলো মুখ নামালেই ঘরে মুখ লুকায়, ভালোবাসার গাছেরা ক্যামন অচেনা হয়ে ওঠে । কুঠা দেওয়া মাটির ঘরে ঘুমালেও কাঠের পাল্লায় খিল না দিয়ে চোখ বন্ধ করতে পারে না । কিন্তু গত রাতে কী ভেবে দরজা খুলে ঘুমিয়ে পড়ে । তাই ভয়, সিহরণে সে হিস হিসিয়ে ওঠে ।
— আমি গো দাদি । হাছেনের ব্যাটা । ক’দিন থাক্যাই তুমার কাছে আসব আসব ভাবছি ! কাল আস্যা ঘুর্যা গেলছি, তুমি ছিল্যা ন্যা ।
— ছিনু ন্যা ! কুন্ঠে আবা গেলছিনু, ওই পাড়ায় হাঁসরতের বাড়ি । বিক্যালে ওর বোর দুট্যা বিটি ছেলে হল, একচিন ধরতে হল । বুয়াস হয়েছে , শরীরে আর সহাছে ন্যা রে ভাই । তা কী মুনে করে আমার বাড়িতে বুলধিনি !
— একচিন বিপদে পড়েছি দাদি । আমার শালির মাসিক হছে না তিন মাস থাক্যে । একচিন ওষুধ দিয়ে দেখে আসল্যা ভালো হয় ।
— ক্যানে হাঁসপাতাল যা ! এই যুগে আবা কেহু আমাহের কাছে আসে নাকি ! তাছাড়া আমি ওই কাজ ছাড়্যা দিয়েছি । কুনু গরিবগুন্যা কষ্ট পাল্যা যাই, খালাস করি, ওষুধ দিই তাই বুল্যা কাহুরির প্যাট ফ্যালাতে পারব ন্যা ! আছিয়া জানে, রাতে-দুপুরে-ভোরে মানুষ বিপদ বলে আসলেই তার কাছে বাচ্চা নষ্ট করাতে ছুটে আসে । তার সবই অবৈধ, কে দেওরের সঙ্গে, কে ভাশুরের সঙ্গে, কে পাশের বাড়ির লোকের সঙ্গে, কে স্কুলের বন্ধুর সাথে শুয়ে পেট বাঁধায়, তারা কেউ হাঁসপাতালে যেতে চায় না, পাছে সব জানাজানি হয়ে যায়, চুপেচাপে ঘরের কোণে আছিয়া বুড়িকে কাজে লাগিয়ে কাজ হাসিল করে । কিন্তু আছিয়া যে বহু দিন আগেই ওই কাজ ছেড়ে দিয়েছে, কিন্তু যারা জানে না, তারাই ক্যাবল ছুটে আসে । আগুন্তুক হাতে পায়ে ধরে, দাদি দশ মিনিটের কাজ, একচিন চল না ! সে কি ঠিকা নিয়ে বসে আছে নাকি ! খেপে ওঠে আছিয়া । অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে, কাকুতিমিনতি করেও লাভ হয় না । আগন্তুক মেজাজ হারায়, গরগর করে, অ করবা না কী ছিড়্যা খাবা ! ভাতার দুদশ বিঘ্যা মাঠান রাখ্যা গেলছে নাকি ?
আছিয়া সইমার কাছে এই কাজ শিখেছিল, কীভাবে মেয়েদের শরীর থেকে বাচ্চা খালাস করতে হয়, কীভাবে নাড়ী কাটতে হয়, কোন গাছের জড়ে প্রসূতির ব্যথা কমে, ফুল পড়ে, ভ্রণ মরে । মেয়ে মানুষের শরীর থেকে বাচ্চা খালাস করার সময় আছিয়ার বারবার মনে হয়, সে যেন নিজেই মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসছে ।
মেজাজ হারায় বুড়িও । বয়স বাড়ার সঙ্গে একরকম পাল্লা দিয়েই মানুষের গা গতরে শক্তি যেমন কমতে থাকে তেমনি কমে ধৈর্যশক্তি, বুদ্ধি । ঘনঘন রাগ হয়, বিষন্নতায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে যেতে থাকে মানুষ । একসময় ছিল আশেপাশের পাঁচসাতটা গ্রামের মানুষ তার ওপর নির্ভর করেই বাচ্চাকাচ্চা নেওয়া, খালাস করানো আরও কত কি বিষয়ে ছুটে বেড়াত । তখন আছিয়ার রাতদিন ছিল না । ভোররাত, ত্যাফোররাত ছিল না, কেবল ডাক পড়ত আশেপাশের দশবিশটা গ্রাম থেকে । কার ব্যথা উঠেছে, কার পানি ভাঙছে, কার পেটের বাচ্চা নড়ছে না, সব সমাধানের উপায় যেন আছিয়া । তখন হাসপাতাল কোথায়, ডাক্তারই কোথায় ! অনেক ক্রোশ পথ হেঁটে তবেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রর দেখা পাওয়া যেত, তবে ডাক্তারের দেখা পাওয়া ছিল ডুমুরের ফুক দেখার মতো । বাচ্চাকাচ্চা হওয়ানোর ব্যাপারে মুসলমান জনজীবন চিরকালই পরপুরুষ এড়িয়ে চলে, তাই হাসপাতাল যেতে চায় না । আছিয়া পাড়ার এক সইমার কাছে এই কাজ শিখেছিল, কীভাবে মেয়েদের শরীর থেকে বাচ্চা খালাস করতে হয়, কীভাবে মায়ের নাড়ী কাটতে হয়, কোন গাছের জড়ে প্রসূতির ব্যথা কমে, কোন জড়ে ফুল পড়ে, কোন জড়ে ভ্রণ মরে । একবার এমনই এক বাদলার দিনে, দুইদিন এতো বৃষ্টি হয়েছে যে মাটির রাস্তায় পা ফেলা যায় না । পাঁক জমে একেবারে পায়েস হয়ে উঠেছে লুঙ্গির বহরে কাছা বাঁধার মতো হাঁটুর ওপর শাড়ি তুলে জলকাদা এক করে তাতেই ছুটতে হল আছিয়াকে । কাজ শেখার সময় সইমার আদেশ ছিল; মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মালছ, বিটি মানুষের আপদে বিপদে আলসি করল্যা চলবে ন্যা । দুই জানের মানুষকে খালাস কর্যা দুই জান দুইঠে করল্যা শুধু পয়সা লয়রি মা নেকি পাবা, আর পাবা মানুষের জানভরা দুয়া । সত্যিই মেয়ে মানুষের শরীর থেকে বাচ্চা খালাস করার সময় আছিয়ার বারবার মনে হয়, সে যেন নিজেই মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে আসছে । এমনভাবে ছটপট করতে করতে তাকে জন্ম দিতে গিয়েই তো তার মা জগতের মায়া ছাড়ল । নিজের মাকে সে তো কখনো চোখে দেখেনি, বাচ্চা জন্ম দিয়ে মায়ের যন্ত্রণাও উপলব্ধি করেনি, কিন্তু তার হাত দিয়ে হাজার হাজার শিশুর যেমন জন্ম হয়েছে তেমনি জন্ম হয়েছে হাজার হাজার মায়ের । সে মনে করে, একজন মেয়ে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও তো মা হিসেবে জন্ম নেয় ! তাই মানুষ ডাকলেই ছুটে যায়; সেই রাতে মাতন মিয়াঁর বড়ো মেয়ে পাইরন ব্যথায় কাতরাচ্ছে । বেহুদ্দ্যা ছুড়ি তখন সায়া কাপড় খুলে ফেলে দিয়ে বিগ্যাড়ে উঠোন-ঘর করে । আছিয়াকে ঢুকতে দেখে সে কী কান্না, চাচি আমার খালাস করে দ্যাও গো, আমি আর পারছি ন্যা ! আছিয়া ঘরের মেঝেতে শুইয়ে দিয়ে দুই পা সরাতেই বাচ্চার মাথা বেরিয়ে আসে, তারপর ব্যাস, আর কষ্ট পেতে হয়নি ।
ক্যাবল বাচ্চা খালাস করেই তার ছুটি, এমনটা নয়; বাচ্চা বাড়ির মানুষের হাতে তুলে দিয়ে তখন প্রসূতির যত্ন করতে থাকে । সরষের তেল কুসুম গরম করে সারা শরীরে মালিশ করে প্রসূতিকে সুস্থ করে তবেই বাড়ি ফেরে । এমন দায়িত্ববান দাইমা দ্বিতীয়টি পাওয়া দুষ্কর । তবে শুধু যে বাচ্চাকে পৃথিবীর আলো দেখাত তাই না, কত ভ্রণ পৃথিবীর আলো দেখার আগেই সে যমের বাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে পারত । প্রথম দিকে অবশ্য আছিয়া এই পাপ কাজে সায় দিতে চায়নি, নিষ্পাপ রক্তের দলা এই জাহানের আলো দেখার আগেই তাকে শেষ করে দিব ! পারব ন্যা । তুমরা হাসপাতালে যাওহিনি । কিন্তু সেবার এক ঘটনা ঘটল; আত্তার মৌলানা গভীর রাতে এসে আছিয়ার হাত জড়িয়ে ধরল, বুবু তুমি আমার মান ইজ্জত রক্ষা কর, নাহালে আমার মুখ দেখাতে পারব ন্যা । আছিয়া মাটির কলসি থেকে একগ্লাস পানি ঢেলে দিয়ে বলে,পানি খাওধিনি ভাই, চুপ কর, কী হয়েছে বুল । আমি রক্ষা করার কে ! আল্লা আছে । ঢকঢক করে এক শ্বাসে পানিটুকু পান করে আত্তার মৌলানা বলে, বুবু ঘরে আমার বিহ্যার লায়েক দু দুট্যা বিটি, কোলে এক বছরের একটা । সামনে মাসে বড়ো বিটির বিহ্যা হওয়ার কথা । এখুন তুমার ভাবি আবা মাস চারেকের পুয়াতি । আল্লার কির্যা বুবু আমি জান্যাশুন্যা এই কাজ করিনি, সব সুমায় সাবধানে চলি । এখুন সমাজে মুখ দেখাতে পারব ন্যা । ওই বাচ্চা রাখব কী করে বুলধিনি । আছিয়া থ হয়ে সব শোনে, শুনভাই ম্যালা দেরি হয়ে গেলছে, চার মাস মানে এখুন রক্তের দলায় রুহু চল্যা আসেছে, তা কী কর্যা কী করব বুলধিনি, এ যে মারাত্তক গুনহা হবে । তুমি এবেরকার মুতুন রাখ্যে দেও । না বুবু, ধর্মের দিক থাক্যে কিছু হব্যে ন্যা, কোলে বাচ্চা আছে, এখুন বাচ্চা লিলে মায়ের জানের ঝুকি আছে, তাই লষ্ট করা যাবে । আমি তুমাকে মুনে জানে জাহান্নামে লিয়ে যাব ? তুমি কিছু করে দ্যাও বুবু, আমি তুমাকে যত টাকা লাগ্যে দিব । আছিয়া এই কাজ করে কখনো টাকা উপার্জনের কথা ভাবেনি । সেই যে আত্তার মৌলানার বউয়ের বাচ্চা ফেলাল, তারপর ওই পথ থেকে আর সরে আসতে পারেনি । কে জানে লঘু পাপে গুরু দণ্ড হল নাকি ! এইসব খবর হাওয়ার আগে দৌড়ায় । তাই দিনদিন মানুষের আবদার আসতেই লাগল, আর আছিয়া তা এড়াতে পারল না ।
অনেকেই রাতের আঁধার চিঁরে গোপনে ছুটে আসে, হাতে নোটের তাড়া গুঁজে দিয়ে বাইনা ধরে, চাচি, খালা বা ফুফু । রাতে হিকমত শেখের সে কী পাছড়াপাছড়ি, খালা আমি আপনার ব্যাটার মুতুন ওইপাড়ার মুন্সুর হালদারের বিটির প্যাটে সমস্যা হয়েছে, একচিন দ্যাখেন না ! আছিয়া সব বোঝে কিন্তু খানিক ঝাকিয়ে নেওয়ার জন্য বলে, প্যাটে ব্যথা তো হাসপাতাল লিয়ে যা না ব্যাটা, আমার কাছে আস্যাছিস কিসের লাগ্যে ! অবস্থা বেগতিক দেখে ফিসফিস করে বলে, সেদিন ওই ছুড়ির নানি মরল, বাপ মা ছিল ন্যা ওই একচিন পহর দিতে যায়্যে অঘটন ঘটে গেলছে চাচি ! বলেই হাত চেপে ধরে । আছিয়া ফিক করে হেসে ফেলে, বলে,ব্যাটা মেয়ে মানুষের ইজ্জত এই যাত্রায় আমি আল্লার অছিলায় মুক্ত করে দিছিহিনি, কিন্তুক বড়ো বই ছুঁয়ে কির্যা কাটতে হবে, তুমি অক্যা বিহ্যা করবা বুলো ? হিকমত বই বুকে নিয়ে কির্যে কসম খেয়ে মুক্তি পায় ।
টর্চ জ্বেলে দ্যাখে, বাচার জন্য রক্তের দলাটা লড়াই জাহির রেখেছে তখনো । সেদিন সারাপথ সাইকেল ঠেলে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে । আল্লা যারা গতরের জ্বালা থামাতে হারাম-হালাল বিচার করা ন্যা, পুরুষের কাছে শরীর পাত্যে দেয়, তাধেরই তুমি কোল ভরাও ! সারারাস্তা তার বারবার মনে হচ্ছিল, তার হাতে নষ্ট হওয়া কত নিষ্পাপ রক্তের দলা এভাবেই শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় দিনে রাতে ! এই পাপের দায় কি তারও বর্তায় না !
একবার এক রাতে ওই কেস করে বাড়ি ফিরছিল আছিয়া । গভীর রাত । ঘনকালো আঁধার, সামান্য দূরেও কিছু দেখা যায় না । রাস্তা অদ্ভূত শুনশান । মাঠের মধ্যে সাইকেল ঢুকতেই গায়ের মধ্যে ক্যামন ছমছম করে উঠল আছিয়ার । সামান্য দূরে কলাবাগানের ধারে কার যেন সদ্য জন্মান বাচ্চা কান্না করছে ! সাইকেল রেখে হাতে থাকা ছোট্ট টর্চ জ্বালিয়ে সে এগিয়ে যায় কান্নার শব্দের দিকে । টর্চ জ্বেলে দ্যাখে, কয়েক ঘণ্টা আগে তার গাছড়া ওষুধে ভূমিষ্ঠ হওয়া বাচ্চাটা তখনও মরেনি, ওরা জারজ বলে ফেলে দিয়েছে নিশ্চয় ! বাচার জন্য রক্তের দলাটা লড়াই জাহির রেখেছে তখনো । আছিয়া ওভাবে ফাঁকা মাঠের মধ্যে ঠিক কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল তা বলা যায় না, একসময় বাচ্চার শরীর অসাঢ় হয়ে এলে তার সম্বিত ফেরে । সেদিন সারাপথ সাইকেল ঠেলে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে । আল্লা যারা গতরের জ্বালা থামাতে হারাম-হালাল বিচার করা ন্যা, পুরুষের কাছে শরীর পাত্যে দেয়, তাধেরই তুমি কোল ভরাও ! সারারাস্তা তার বারবার মনে হচ্ছিল, তার হাতে নষ্ট হওয়া কত নিষ্পাপ রক্তের দলা এভাবেই শিয়াল কুকুরে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায় দিনে রাতে ! এই পাপের দায় কি তারও বর্তায় না !
সেই রাতের পর কত বছর কেটে গিয়েছে । এখন সে লোকের বাড়ি ঘর মুছে, বাসন মাজে, ধান সেদ্ধ করা, কাপড় কাচা, রান্না করা কত কাজই না করে তবু ওইকাজ আছিয়া আর করতে পারে না । ওই কাজে কাড়ি কাড়ি নোট হাতে আসে কিন্ত সেইদিনের রাতের কথা ভুলতে পারেনি আজও; তাই কত মানুষের আবদার, অনুরোধ আসলেও সে আর ওই পথে হাঁটে না । এখন তো সরকারি হাসপাতালে সব কাজ বিনা পয়সায় হয়, তবুও মাঝে মধ্যে মানুষ ছুটে আসে ।
— তাহালে দাদি যাবা ন্যা !
আগন্তুকের গলার স্বরে চেতন ফিরে আছিয়ার । সে কোন জগতে যেন হারিয়ে গিয়েছিল, এতক্ষণ আগন্তুকের কথা ভুলেই গিয়েছিল, এবার সে গর্জন করে উঠল, তুই বাড়ি থাক্যা বারহাবি না চিল্লিয়ে লোক জড়ো করে তোর কিত্তির কথা সবাইকে শুনাব বুল !
হঠাৎ ঝনঝন করে একটা বড়ো টিন খুলে উড়ে আসে আছিয়ার ছঞ্চেয় । এবার উঠে বসে আছিয়া, আবার ঝড় আসল নাকি আল্লা ! এ কি জহমত দিল্যা মাঠঘাট ডুব্যা গেল, মানুষ খাবে কী ! বলতে বলতে হুড়হুড় করে নেমে আসে বৃষ্টি । সাদা হয়ে আসা বৃষ্টির স্রোতকে হেলিয়ে দুলিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চলে খ্যাপা হাওয়া, তারই মাঝে আন্তুক এক দৌড়ে অস্পষ্ট হয়ে মিশে যায় । আছিয়া চোখ রোগড়ে আবার তাকায়, না দেখা যায় না, আপদ গেলছে ! হঠাৎ ঘরের মধ্যে খচাং করে কি যেন একটা আছড়ে পড়ার আওয়াজ হয় । বুড়ি আসতে আসতে উঠে ঘরের দিকে হাঁটা দেয়, চোখে পড়ে একটা নাইলনের ব্যাগ । ঘরের কোঠায় টাঙ্গান ছিল, তার এক সময়ের রুটিরুজির সম্বল, তার যন্ত্রপাতি । ব্যাগের ভিতরে একপলক তাকায়; দুটো বড়ো কাঁচি, একটা ছুরি, পাটকাঠিতে জড়ান নাইলন কড, মলম, কিছু গাছের জড়; সে কিছুই ভাবতে পারে না, নাকি ভাবতেই চায় না তার মুখ দেখে বোঝা যায় না ! বুড়ি সন্তর্পণে ব্যাগটা হাতে তুলে নিয়ে বাইরে আসে তারপর সজোরে ছুড়ে ফেলে সামনের নয়ানজুলিতে । আউলি বাউলি হাওয়া আর পানির তোড়ে তা মুহূর্তেই মুখ লুকিয়ে নেয় ডোবায়, এবের আই কুন মাগি মিনস্যা আসছিস তোহের প্যাট ফ্যালাতে !
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us








