- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ৫, ২০২৬
ভোটের মুখে উত্তরপূর্বের রাজ্যে পরিবর্তনের দমকা হাওয়া ?
এ যেন জাতীয় স্তরে ফুটবল দলের দলবদল বা জার্সি বদলের খেলা। এবার রাজনীতিতেও এক ধরনের জার্সি ছেড়ে আরেক রকম জার্সি পরার প্রবণতা চোখে পড়ছে। রাজনীতির ময়দানে রাতারাতি দল বদল করে সে দলের মনোনয়ন গ্রহণ ইতিহাসে নজিরবিহীন হয়ে রইল অসমে। কয়েকজন নেতা আগেভাগেই দলবদল করে এসেছেন, তাঁদের যে ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, সে অনুযায়ী দলীয় মনোনয়ন মিলেছে। রাতারাতি দলবদল করে পর দিনই মনোনয়ন পাওয়ার ঘটনা অবাক করে দিয়েছে অনেককে। সাংসদ প্রদ্যুৎ বরদলৈ আগের দিন কংগ্রেসের ইস্তফা দেন, পরদিন বিজেপিতে যোগ দিয়ে দিশপুর আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে যান।
চিরকালের বিজেপি নেতা অমর চাঁদ জৈনকে কাটিগড়া থেকে কংগ্রেস প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার একদিন আগেই তিনি কংগ্রেসে যোগ দেন। এ নিয়ে আলাপ-আলোচনা কদিন যাবতই চলছিল। দল বদলু রাজনীতির জন্য অনেকে নীতীশ কুমারকে কটাক্ষ করতেন। নীতীশ কুমারের জে ডি ইউ দল কেবলমাত্র সুবিধার জন্য কয়েকবার জোট বদল করেছেন। নীতীশ নিজে দল ছাড়েননি। অন্য দলেও ভিড়েননি। কিন্তু প্রদ্যুৎ বা অমর চাঁদ যা করলেন তা অবাক করার মতই ঘটনা। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বিজেপি এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস দলছুটদের দলে এনে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। গণইচ্ছা এখানে কিছুই নয়, দলীয় রাজনীতিটাই প্রধান। বিজেপি বা কংগ্রেস উভয় পক্ষ দেখাতে চাইছে, দেখো আমরাও পারি দলছুটদের দলীয় টিকিট পাইয়ে দিতে। এ ধরনের প্রতিযোগিতায় দল দুটি পিছিয়ে পড়তে চায় না। তামাসার জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনপ্রতিনিধিত্বের নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা সম্ভব । জনসেবা করার লক্ষ্য নিয়েই তাঁদের চিরকাল জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে হবে, এমন ধারণা নিয়ে যাঁরা রাজনীতি করেন, প্রকারান্তরে তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চিন্তা নিয়েই মগ্ন থাকেন, তা বলতে দ্বিধা নেই । নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শে অবিচল থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও সমাজের জন্য অনেক কাজ করা যায় । এর অজস্র উদাহরণ ভারতের রাজনীতিতে রয়েছে ।
যেসব নেতা নীতি বিসর্জন দিয়ে যে দলকে ঘৃণার চোখে দেখে এসেছেন, সে দলের নীতিতে মশগুল হয়ে যান তখনই সন্দেহ জাগে, তাঁরা রাজনীতিতে এসেছেন জনসেবা করতে না, নিজের আখের গুছাতে। এক সময় যারা যে দলের নীতি আদর্শ সমালোচনা করতেন, রাতারাতি দল পাল্টে সে দলে যোগ দিয়ে সে দলের নীতির গুণ কীর্তন করতেও লজ্জা বোধ করছেন না। কংগ্রেসের নেতারা বিজেপিকে যে ধরনের গালমন্দ করেন, তাঁরাই বিজেপিতে আসার পর কংগ্রেসকে গালমন্দ করা শুরু করে দেন। কী বিচিত্র রাজনীতি! রাজনৈতিক নেতাদের একমাত্র লক্ষ্য কি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া, এ প্রশ্ন জাগতে পারে। কারণ একশ্রেণীর নেতার লক্ষ্য হলো, যেনতেন প্রকারে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া। এখানে দলীয় আদর্শের স্থান নেই। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার তাগিদে তাঁরা যে কোনো দল বদলে ফেলতে পারেন। আর জনসেবা করা তাঁদের যে মূল উদ্দেশ্য নয়, তা বুঝতে কারো বাকি থাকে না। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও জনসেবা করা যায়। দলবদলু জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার লোভে মশগুল রাজনীতিকরা এটা বুঝতে অপারগ। তাঁরা নিজ দলের নীতির বিরুদ্ধ কোনো দলে যোগ দিয়ে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য নিজের জীবন লড়িয়ে দিতে পিছপা হবেন না। এমন লক্ষণ বেশ কয়েকটি ঘটনায় দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবারই নির্বাচন ঘনিয়ে আসার আগে কিছু কিছু মানুষকে দল বদল করতে দেখা যায়, তাঁরা সাধারণ কর্মী বা সমর্থক । কোনো ধরনের অসন্তোষ বা স্থানীয় নেতাদের উপর আস্থা হারিয়ে তাঁরা এ ধরনের দল বদল করে থাকেন। স্থানীয় সমস্যা স্থানীয় নেতার ওপর আস্থা হারানো এবং অন্য নেতার প্রতি আকর্ষণ বোধের জন্য এরা দলবদল করে থাকেন। দলবদলের পর তাঁদের নেতা যদি নির্বাচনে বিজয়ী হন, তাহলে তাঁরা উল্লসিত হন এবং পরাজিত হলে হতাশ হন। জয়-পরাজয়ের সঙ্গে তাঁদের ভাগ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। নেতা বিজয়ী হলেও তাদের ইনাম মিলবে তেমন নয়, আবার পরাজিত হলে কিছু হারিয়ে যাবে সেটাও নয়। লাভ ক্ষতির অংকটা তাঁদের কখনো দল বদলের সঙ্গে যুক্ত হয় না। এর মধ্যে থাকে কেবলমাত্র ভাবাবেগ। যে নেতাকে আদর্শ মনে করে তাঁরা দলবদল করতে অভ্যস্ত, পরবর্তীকালে অনেক সময় সে নেতা সম্পর্কে মোহভঙ্গ ঘটে গেলে আবার তাঁরা পুরনো দলে ফিরে যান। কারো কারো কাছে ভোটের মরশুমে দলবদল করে প্রচারের আলোয় আসার এক চেষ্টা। এতে লাভের লাভ কেবল মানুষ তাঁদের নাম-ধাম জানতে পারে। এভাবে যে কর্মী সমর্থকরা দল বদল করেন, তাঁদের অনেকেই সক্রিয় কর্মী। তাঁদের দল বদলে ব্যক্তিগত লাভ না হলেও সংশ্লিষ্ট দল লাভবান হয়ে থাকে।
কর্মীরা দলবদল করতেই পারেন। কিন্তু নেতা হয়ে হঠাৎ দলবদল, আশ্চর্যজনক ঘটনা। সাংসদ প্রদ্যোৎ বরদলৈ, কংগ্রেসের শক্তিশালী নেতা ছিলেন। হঠাৎ তিনি দলবদল করে বিজেপিতে যোগ দেন। আগের দিন কংগ্রেসের ইস্তফা দিয়ে পরদিন তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং এরপর দিনই তিনি বিজেপি দলের মনোনয়ন পেয়ে যান। বিজেপি তাকে দিসপুর আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মনোনয়ন উপহার দিয়েছে। কাটিগড়ার বিজেপি নেতা অমর চাঁদ জৈন গুয়াহাটিতে গিয়ে বিজেপিতে ইস্তফা দিয়ে কংগ্রেস এ যোগ দেন। এবং কংগ্রেস তাঁকে কাটিগড়ায় দলীয় মনোনয়ন দিয়ে দেয়। অমর চাঁদ আজীবন গেরুয়া রাজনীতি করে এসেছেন। হঠাৎ তাঁর এই দলবদল অনেকেই অবাক করে দিয়েছে। আসলে তাঁর সুপ্ত বাসনা, তিনি আজীবন কাটিগড়া থেকে বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হবেন। দল তাঁকে এবার প্রার্থী হিসেবে চয়ন করেনি, তিনি রাতারাতি শিবির পাল্টে কংগ্রেসে চলে যান। অথচ আজীবন তিনি কংগ্রেসকে গালাগাল করে এসেছেন। তিনি কাটিগড়ায় একবার দাঙ্গা বাঁধানোর উপক্রমও করেছিলেন।
কাটিগড়া বিধানসভা এলাকার মানুষ এসব ঘটনা ভুলে যাননি। এবার কংগ্রেস দলের মনোনয়ন পেয়ে তিনি জোর গলায় বলেছেন গৌতম রায় কে আমি পঞ্চাশ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছি। এবারের বিজেপি প্রার্থী কমলক্ষকেও আমি পরাজিত করব। বিজেপি দলের ভেতর থেকেও তিনি গত নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী গৌতম রায়ের বিরুদ্ধাচরণ কীভাবে করলেন, এতেই তার দলের প্রতি নিষ্ঠা এবং নীতি-নিষ্ঠতা প্রমাণ হয়ে যায়। দলকে হাতিয়ার করে তিনি নিজেরই বৈভব বৃদ্ধির কাজ করে এসেছেন এতদিন যাবত। দলের উঁচুস্তরের নেতারা এসব লক্ষ্য করেননি ! তাঁর মতিগতির উপর যদি দলের নজরদারি থাকত, তাহলে অনেক আগেই তাঁর কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে যেত। কাটিগড়া আসনের বিজেপি প্রার্থী কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থ এক সময় কংগ্রেসে ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। বিজেপির প্রতি তাঁর মোহ গত তিন বছর যাবত লক্ষ্য করা যাচ্ছে এবং মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশেই তিনি এতদিন রাজকর্ম চালিয়ে এসেছেন। এটাও প্রমাণিত। তাঁর সঙ্গে অমর্যাদের লড়াই একপেশে হবে না, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে সেটা এক্ষুনি বলা মুশকিল।
ভারতবর্ষে দল বদল মজার খেলায় পরিণত হয়েছে । দলে থাকা বা দল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার রাজনীতি দীর্ঘকাল যাবৎ চলে আসছে, কিন্তু দলবদল করার সঙ্গে সঙ্গেই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার রাজনীতি নতুন । এমন মনোহর দৃশ্য এর আগে কখনো দেখা যায়নি
কংগ্রেস সাংসদ প্রদ্যুৎ বরদলৈ বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ। জে এম ইউ স্কলার প্রদ্যুৎ বর্তমান প্রদেশ কংগ্রেসের নেতৃত্বের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। তাঁর সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের নীতিগত বিরোধ সৃষ্টি হয়। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈর সঙ্গে মতবিরোধ এতটাই প্রকট হয় যে, নিজেকে নিঃশেষ করার পথ থেকে সরে এসে প্রদ্যুৎ বিজেপিতে যোগ দিয়ে এখন নিঃশ্বাস নিতে পারছেন। এই দলবদল তাঁর জন্য লাভজনক হবে কি না, সেটা পরে জানা যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যে কংগ্রেস দলের মধ্যে এক ধরনের অরাজকতা চলছে। এটা প্রদ্যুৎ বা প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ভূপেন বড়া, কমলাক্ষ, শশীকান্ত দাসদের পদত্যাগ প্রমাণ করে দেয়। এর আগে একই কারণে আরো অনেকেই কংগ্রেস ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেন। আরো বেশ কয়েকজন বিধায়ক বেশ কিছুদিন পূর্বেই কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এদের কেউ কেউ বিজেপির মনোনয়নও পেয়ে গেছেন।
ভারতবর্ষে দল বদল মজার খেলায় পরিণত হয়েছে। একদল ভেঙ্গে অনেক দল সৃষ্টি করার রাজনীতিও আমরা দেখে এসেছি। সিপিআই দল ভেঙ্গে যেমন সিপিআইএম, সিপিআই (এমএল) ইত্যাদি গঠিত হয়েছে। ঠিক তেমনি জনতা দল ভেঙে জনতা দল ইউনাইটেড ,জনতা দল সেকুলার ,রাষ্ট্রীয় জনতা দল, এমনকি লোকজনক পার্টি জন্ম নেয়। কংগ্রেস ভেঙে একসময় রেড্ডি কংগ্রেস হয়েছিল পরবর্তীকালে কংগ্রেস ছেড়ে শরৎ পাওয়ার, পিএ সাঙমা, তারিক আনোয়ার মিলে এনসিপি গঠন করেছিলেন। এনসিপি-র অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান, তবে মেঘালয়ে এনসিপি দল বদলে এনপিপি হয়ে গেছে। প্রণব মুখার্জিও একবার কংগ্রেস থেকে বের হয়ে অন্যদল গঠন করেছিলেন। পরে অবশ্য সে দল ভেঙে দিয়ে তিনি কংগ্রেসেই ফিরে যান। দলে থাকা বা দল ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার রাজনীতি দীর্ঘকাল যাবতি চলে আসছে, কিন্তু দলবদল করার সঙ্গে সঙ্গেই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার রাজনীতি নতুন। এমন মনোহর দৃশ্য এর আগে কখনো দেখা যায়নি, কিছু কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটেনি, তা নয়।
রাজনীতির ময়দান গরম করে রাখতে যদি দল বদলের মতো ঘটনা ব্যাপকভাবে প্রচারের আলোয় আনা হয়, তাহলে এটা পরোক্ষে গণতন্ত্রের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জনপ্রতিনিধিত্বের নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা সম্ভব। যাঁরা রাতারাতি নীতিবদল করে ফেলতে পারেন, তাঁদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। একমাত্র জনসেবা করার লক্ষ্য নিয়েই তাঁদের চিরকাল জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হতে হবে, এমন ধারণা নিয়ে যাঁরা রাজনীতি করেন, প্রকারান্তরে তাঁরা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চিন্তা নিয়েই মগ্ন থাকেন, তা বলতে দ্বিধা নেই। নিজস্ব রাজনৈতিক মতাদর্শে অবিচল থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও সমাজের জন্য অনেক কাজ করা যায়। এর অজস্র উদাহরণ ভারতের রাজনীতিতে রয়েছে। আমাদের দেশের বরেণ্য নেতারা দলবদল না করে নিজেদের দলীয় নীতিতে অবিচল থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়েও দেশের জন্য সেবা করে এসেছেন, এমন ঘটনা বিরল নয়। এটাই গঠনশীল রাজনীতির অন্যতম উদ্দেশ্য।
♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦
(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)
লেখক : প্রাক্তন ছাত্রনেতা ও গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী
❤ Support Us








