- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ২৬, ২০২৬
ঈশানবঙ্গের শক্তি
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা কবি শক্তিপদকে কোনো ধরণের সম্মান প্রদর্শন করেনি সাহিত্য অকাদেমি। এ সম্মানের তোয়াক্কা করেননি তিনিও, হালকা অথচ গুরুগম্ভীর উচ্চারণে বলেছিলেন, ‘কে ওখানে ? আমি হুজুর শক্তিপদ ব্রহ্মচারী/ ইন্দিরা জি দিল্লি থেকে হিন্দি সেখান সস্তাদরে/ ডজন খানেক তা কিনেছি জাতীয় সংহতির ডরে।’ ভয়হীন, সংশয়হীন ঈশানবঙ্গের দুঃসাহসী কবি, বরাকে, অসমে অখণ্ড শ্রীভূমির সুখ আর অসুখের মুখ্য প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন জীবদ্দশায়। মৃত্যুর পরে মুখে মুখে ভেসে বেড়ায় তাঁর অজস্র পংক্তি। তাঁর কবিতার ভাসান অনন্ত। গর্ব করে বলতেন, এইখানে অন্তরে। বাংলা পাঠক তাঁকে ভুলতে পারেনি। পারবে না, তাঁর কবিতার শাদা শাদা বক উড়ে বেড়াবে বাংলা ভাষার সপ্ত আকাশে। ৭ বৈশাখ, ১৪৩৩, তাঁর জন্মদিনে শক্তিবর্ষ পালন করল ঈশান বাংলা। বাবার কবিতা আবৃত্তি করে শোনালেন কবিকন্যা কপোতাক্ষী, ভিড় ঠাসা কবিতার জলসায়।
যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সেই কেড়েছে ভয়
শক্তিপদ কলজে ছিঁড়ে লিখেছিলেন, ‘ঐ যে ঈশান কোণ !/কোন্ ভাষাতে কাঁদে, হাসে/ কান পেতে তা শোন’। কুচক্রীদের ছা-কে ধমকে তিনি তিরিশ লাখের কণ্ঠভেদী আওয়াজে ঘোষণা করেছিলেন —‘বাংলা আমার মাতৃভাষা।’ নির্বাসিতা, লাঞ্ছিতা, আদি-অনাদি বাংলার সম্প্রসারিত ভূখণ্ডকে তিনি দিয়েছেন নতুন পরিচয় — ‘ঈশান বাংলা মা।’
জীবনানন্দ দাস তাঁর হৃদয়ের গভীরে ধারণ করেছিলেন আবহমান বাংলাকে, দেখেছিলেন বাংলার মুখ, তেমনই আমাদের প্রিয় চারনিক — সুরমা বরাক বিধৌত ছিন্ন ভূমিতে পা রেখে গড়ে তুললেন আর-এক রূপসী বাংলা। কুচক্রীদের ভ্রূকুটি অস্বীকার করে, পরম মমতায় তাকে নতুন নামে ডেকেছেন। হরিকেল, বঙ্গ, সমতট, সুবঙ্গের ঐতিহ্য ধারণ করে স্বয়ম্ভু আমাদের জয়তুঙ্গ বর্ষ —আমাদের রক্তের গভীরে এ যে আরেক রূপসী বাংলা। যে সুন্দরী ভূখণ্ডকে তিনি নির্মাণ করেছেন শ্রাবণের অবিশ্রাম মনসামঙ্গলের দিশায়, সুরেলা পয়ার-প্রবন্ধে, কবি নারায়ণদেবের ষোড়শ পাঁচালিতে, কবি ষষ্ঠীবরের লাচাড়ির ছন্দে আর তালে। এই ভূমিতে তিনি শুনেছেন আমাদদের বুকের দ্বিজবংশীদাসের ক্রন্দন— হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কালীদহ। প্রত্যক্ষ করেছেন বরাক, সুরমা, ধলেশ্বরী, মধুরা, জাটিঙ্গার ঢেউয়ে অনন্ত ভাসান যাত্রা।
ছিন্ন খঞ্জনার মতো যখন সে নেচেছিল ইন্দ্রের সভায়, তখন রেডক্লিফের খঞ্জর ভিজে উঠেছিল বুকের রক্তে। আর বরাকের নদী, মাঠ, খাল-বিল, লতা-পাতা, রক্তজবা বনধুতুরি ফুল আর ধুন্ধুল ঝনকির বীজ ঘুঙুরের মতো কেঁদে উঠেছিল । নির্বাসিতা ভূমিতে তাঁর অন্তিম উপলব্ধি ছিল,
‘যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সে-ই কেড়েছে ভয়;
আকাশজুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয়।’
এমন প্রগাঢ় বোধ, এমন হৃদয়বিদারক উচ্চারণের অধিকারী শক্তিপদ ব্রহ্মচারী ছাড়া, আমাদের এই একটুকরো রূপসী বাংলার কবি আর কে-ই বা হতে পারেন? ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ [২১ এপ্রিল ২০২৬] আমরা আমাদের গ্রাম-বস্তি, চা-বাগিচা, শহর-শহরতলি, ভাঙা ঘর কিংবা দালান-কোঠায়, মুক্ত নিসর্গের চাতালে খোল-করতালে গেয়ে উঠেছি শক্তিপদীয় মাথুর —
‘সাতচল্লিশে নাচার
পথ ছিল না বাঁচার,
তাই কাকা এবং চাচার
লড়াইটাকে সঙ্গে নিয়ে
এসেছি এই কাছাড় ।’
উদ্বাহু হয়ে গাওয়ার প্রাসঙ্গিক পদও তিনি জুগিয়ে দিয়েছেন —
‘ভোটের আগে ধর্ম বুঝি
ভোট ফুরালে গর্ত খুঁজি,
গর্তেও যে মারণ অস্ত্র
সবাই তখন গলবস্ত্র ।’
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us







