- চা । রু । ল । তা
- মে ১, ২০২৬
হিমালয়ান সালাম্যান্ডার সংরক্ষণে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি, ‘গ্রিন অস্কার’ জয় দার্জিলিংয়ের বারখা সুব্বার
আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবারও উজ্জ্বল ভারতের নাম, বিশেষত দার্জিলিং পাহাড়ের পরিবেশ-গবেষণার ঐতিহ্য। পূর্ব হিমালয়ের সংকটাপন্ন জলাভূমি ও বিরল–বিপন্ন প্রজাতি হিমালয়ান সালাম্যান্ডার সংরক্ষণে অনন্য অবদানের জন্য মর্যাদাপূর্ণ হুইটলি অ্যাওয়ার্ড, যা পরিবেশ সংরক্ষণ মহলে ‘গ্রিন অস্কার’ নামে পরিচিত, জিতে নিলেন দার্জিলিংয়ের গবেষক বারখা সুব্বা। লন্ডনের রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটিতে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে এই আন্তর্জাতিক সম্মান তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার গ্রহণের পর লন্ডন থেকেই সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় আবেগপ্রবণ সুব্বা বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞ, এ স্বীকৃতি পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের।’
যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক সংস্থা ‘হুইটলি ফান্ড ফর নেচার’ প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের পরিবেশকর্মীদের মধ্যে থেকে তাঁদের অসামান্য তৃণমূল স্তরের সংরক্ষণ কাজের জন্য এই পুরস্কার প্রদান করে। এ বছর সারা বিশ্বের ২৭০ জন আবেদনকারীর মধ্যে থেকে ১২ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। যাঁদের মধ্যেই অন্যতম ছিলেন ভারতীয় গবেষক বারখা সুব্বা ও পারভীন শেখ। এছাড়াও ক্যামেরুন, জিম্বাবুয়ে, ইকুয়েডর, ঘানা এবং ইন্দোনেশিয়ার গবেষকরাও এ তালিকায় স্থান পেয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার ফারওয়িজা ফারহান পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান ‘হুইটলি গোল্ড অ্যাওয়ার্ড’। নির্বাচিতদের মধ্যে স্থান পাওয়া বারখার এই সাফল্যকে পরিবেশবিদরা পূর্ব হিমালয়ের সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি পেয়েছেন ৫০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড, ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার সমান। এই অনুদান তাঁর চলমান সংরক্ষণ প্রকল্পকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হবে বলে জানা গেছে।
বারখা সুব্বা দার্জিলিং-ভিত্তিক এনজিও ফেডারেশন অব সোসাইটিজ ফর এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন (এফওএসইপি)-এর বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। হিমালয়ের অতি দুর্লভ ও সংকটাপন্ন প্রজাতি, হিমালয়ান সালাম্যান্ডার রক্ষায় কাজই তাঁর ধ্যানজ্ঞান। পূর্ব হিমালয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা অল্প কয়েকটি প্রজননস্থলকে কেন্দ্র করে তাঁর গবেষণা ও সংরক্ষণমূলক কাজ আগেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পের নাম ‘সারভাইভার অব আ লস্ট ওয়ার্ল্ড: সেভিং দ্য হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডার অ্যান্ড ইটস ওয়েটল্যান্ডস’ যার মূল লক্ষ্য দার্জিলিং পাহাড়ের ৭ টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন কেন্দ্রকে রক্ষা করা।
প্রজনন কেন্দ্রগুলির মধ্যে রয়েছে চা বাগান সংলগ্ন মার্গারেট’স হোপ এবং নাখাপানি, সরকারি মালিকানাধীন নামথিং বায়োডাইভার্সিটি হেরিটেজ সাইট, মাঝিধুরা এবং পুখরিয়াবংয়ের যৌথভাবে পরিচালিত অঞ্চল, মিরিকের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জলাভূমি এবং বন বিভাগ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের যৌথ ব্যবস্থাপনায় থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এ প্রকল্পে শুধু গবেষণা নয়, বাস্তবমুখী সংরক্ষণকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলাভূমি পুনরুদ্ধার, আক্রমণাত্মক প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ, প্রাণঘাতী ছত্রাকজনিত রোগ ‘চিট্রিড’-এর পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলাই তাঁর কাজের মূল ভিত্তি। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও টেকসই ভূমি ব্যবহারের উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। এই অঞ্চলগুলোই হিমালয়ান সালাম্যান্ডারের শেষ আশ্রয়স্থলগুলির মধ্যে অন্যতম বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
হিমালয়ান সালাম্যান্ডার মূলত ভারত, নেপাল ও ভুটানের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে পাওয়া যায়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)–এর তালিকায় ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে নথিভুক্ত। দার্জিলিং পাহাড়ে এখন মাত্র প্রায় ৩০টি প্রজননস্থান টিকে আছে বলে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, যার অনেকগুলোই সংরক্ষিত এলাকার বাইরে। এই প্রাণীটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘ফিলোপ্যাট্রি’ অর্থাৎ নিজের জন্মস্থানে ফিরে এসে প্রজননের প্রবণতা। ফলে সামান্য আবাসস্থল পরিবর্তনও এদের অস্তিত্বের জন্য ভয়াবহ হয়ে ওঠে। জলাভূমির স্বাস্থ্যের অন্যতম সূচক হিসেবেও এই প্রজাতিকে বিবেচনা করা হয়। বারখা সুব্বা জানিয়েছেন, তাঁর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো ভারত, নেপাল ও ভুটানকে যুক্ত করে একটি আন্তঃসীমান্ত জলাভূমি সংরক্ষণ কাঠামো গড়ে তোলা। তাঁর মতে, হিমালয়ান সালাম্যান্ডার এবং তাদের জলাভূমি রক্ষা করা শুধু একটি প্রজাতিকে বাঁচানো নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ পরিবেশগত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই। বারখা জানান, ‘এই জলাভূমিগুলি শুধু প্রাকৃতিক নয়, সাংস্কৃতিকভাবেও গভীরভাবে যুক্ত। অনেক জায়গায় এগুলি দেবদেবীর সঙ্গে সম্পর্কিত পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।’ ফলে, আধুনিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টা শুরু হওয়ার বহু আগেই স্থানীয় মানুষ নিজেদের মতো করেই এই জলাভূমিগুলিকে রক্ষা করে আসছেন।
বারখা সুব্বার পুরস্কার প্রাপ্তির পর অভিনন্দনের ঢল নেমেছে পরিবেশ গবেষক মহলে। রাজ্যসভার সদস্য হর্ষবর্ধন শৃংলা বলেন, ‘২৭০টি আন্তর্জাতিক আবেদনের মধ্যে তাঁর নির্বাচন আমাদের সবার জন্য গর্বের বিষয়। এটি হিমালয়ের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র রক্ষার লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে।’ কার্শিয়াংয়ের বন বিভাগের ডিএফও দেবেশ পান্ডে বারখার কাজের প্রশংসা করে জানান, বন দফতর স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই বিরল প্রজাতির সংরক্ষণে সর্বোচ্চ সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। পরিবেশবিদদের মতে, বারখা সুব্বার এই স্বীকৃতি শুধু একজন গবেষকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সংগ্রামের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
❤ Support Us








