- বি। দে । শ
- মে ১৯, ২০২৬
কূটনৈতিক সাফল্যের আড়ালে রক্তাক্ত পাকিস্তান, ১৫ দিনে ৫টি হামলা, নিহত ৫০-এর বেশি
বালোচিস্তান-খাইবারে জঙ্গি হামলায় বিপর্যস্ত মুনির প্রশাসন
পশ্চিম এশিয়ায় ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নিজেদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে পাকিস্তান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশংসা, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে সক্রিয় উপস্থিতি ইসলামাবাদকে সাময়িক কূটনৈতিক স্বস্তি দিলেও দেশের অভ্যন্তরে ভয়াবহ নিরাপত্তা সঙ্কট ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বালোচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখাওয়ায় একের পর এক জঙ্গি হামলায় নাজেহাল হয়ে পড়েছে পাক সেনাবাহিনী ও প্রশাসন।
গত এক বছরে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিক ভাবে আত্মঘাতী হামলা, সেনা চৌকিতে আক্রমণ, পুলিশ কনভয়ে গুলিবর্ষণ এবং সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলি। তিন দিন আগেই একটি সেনা চৌকিতে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ১৫ জন পাক সেনার মৃত্যু হয়েছে। হামলার নেপথ্যে ছিল তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)। আচমকা হামলায় সেনারা পাল্টা জবাব দেওয়ার সুযোগই পায়নি।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত দীর্ঘ দিন ধরেই সংঘর্ষের কেন্দ্র। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ চরমে পৌঁছয়। তারপর থেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় অশান্তি অব্যাহত। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, পাকিস্তান যখন সৌদি আরবকে ‘রক্ষা’ করার জন্য সেনা পাঠাচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশের ভিতরে টিটিপি জঙ্গিরা একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে সেনাদের হত্যা করছিল।
অন্য দিকে, ভারতের কূটনৈতিক মহল বিস্মিত হয়েছিল পাকিস্তানের আচরণে। নিজেদের ঘরের নিরাপত্তা সামলাতে ব্যর্থ হয়েও ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে মরিয়া। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে পাক সেনাপ্রধান তথা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প। পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও মুনিরের সঙ্গে কৌশলগত আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এমনকি ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকাকেও কৃতিত্ব দেওয়া হয়।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি অনেকটাই শক্তিশালী করেছে। ভারত-পাক উত্তেজনার পরে ইসলামাবাদ সফল ভাবে আন্তর্জাতিক মহলে এই বার্তা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে যে তারা ভারতের মোকাবিলায় শক্ত অবস্থান নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ‘লেনদেন-ভিত্তিক’ বিদেশনীতি কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান নিজেকে আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক সঙ্কট নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই সাফল্যের উল্টো দিকে দেশের অভ্যন্তরে ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী সঙ্কট পাক প্রশাসনকে চাপে ফেলছে। গ্লোবাল টেররিজ়ম ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত দেশের তালিকায় প্রথম স্থানে উঠে এসেছে পাকিস্তান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পাকিস্তান বরাবরই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে ছিল, তবে এ বার প্রথম স্থানে পৌঁছেছে। হামলার ৭৪ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ৬৭ শতাংশ ঘটেছে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বালোচিস্তানে।
তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে চলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের একাংশের মতে, এই সংগঠনগুলি এখন আরও সংগঠিত, পরিশীলিত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
চলতি বছরের শুরুতেই বালোচিস্তানের রাজধানী কোয়েটা ও বন্দরনগরী গোয়াদর-সহ অন্তত ন’টি জেলায় আত্মঘাতী হামলা চালায় বিএলএ। থানা, বাজার, ব্যাঙ্ক ও নিরাপত্তা চৌকিগুলিকে লক্ষ্য করে চালানো ওই হামলায় বহু অসামরিক নাগরিক ও সেনার মৃত্যু হয়। ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে ভয়াবহ আত্মঘাতী বিস্ফোরণে অন্তত ৩১ জন নিহত হন।
মার্কিন-ইরান সংঘাত শুরুর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। আফগান সীমান্তবর্তী এলাকায় হামলার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। বাজাউর জেলার একটি কলেজে আত্মঘাতী হামলার পর একই কায়দায় পুলিশ চৌকিতেও হামলা চালানো হয়। নিহত হন সাধারণ নাগরিক ও পুলিশকর্মীরা। গোয়াদরের কাছে কোস্ট গার্ড টহলদলের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তিন জন কর্মকর্তাকে হত্যা করে বালোচ বিদ্রোহীরা। পাকিস্তানি সামুদ্রিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বিএলএ-র এটাই প্রথম বড় নথিভুক্ত হামলা।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। তিনি বলেন, “ভৌগোলিক ভাবে বালোচিস্তান পাকিস্তানের ৪০ শতাংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে। এত বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। আমাদের সেনারা সেখানে মোতায়েন রয়েছে, কিন্তু এত বড় অঞ্চল পাহারা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা শারীরিক ভাবে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে।”
চলতি মাসেই পাকিস্তানে পরপর পাঁচটি বড় হামলায় ৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ৭ মে খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাঙ্গু জেলার থাল এলাকায় মর্টার হামলায় দুই শিশু-সহ ছ’জন নিহত হন। ১০ মে একটি চেকপয়েন্টে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণে অন্তত ১৫ জন নিহত হন। ১২ মে বিস্ফোরকবোঝাই তিন চাকার গাড়িতে আত্মঘাতী হামলায় মৃত্যু হয় অন্তত ন’জনের, আহত হন ৩৪ জন। তার দু’দিন পর বালোচিস্তানে সংঘর্ষে পাঁচ সেনা ও সাত জঙ্গি নিহত হয়। ১৫ মে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাক নিয়ে নিরাপত্তা চৌকিতে হামলা চালিয়ে অন্তত ন’জন আধাসামরিক সেনাকে হত্যা করে জঙ্গিরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে গিয়ে পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দিকে পর্যাপ্ত নজর দিতে পারছে না। ইরান সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের ফলে দেশের অন্যান্য অংশে নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ছে। সেই সুযোগেই টিটিপি ও বিএলএ-র মতো সংগঠনগুলি নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করছে এবং নিজেদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে।
ফলে এক দিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে কূটনৈতিক সাফল্যের প্রচার, অন্য দিকে দেশের মাটিতে লাগাতার রক্তক্ষয়— এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই ক্রমশ চাপে পড়ছে পাকিস্তান এবং আসিম মুনির নেতৃত্বাধীন পাক সেনাবাহিনী।
❤ Support Us







