- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- মে ৬, ২০২৬
বাংলাদেশে হামের প্রকোপ, আক্রান্ত ৪৭ হাজারের বেশি, শিশুসহ মৃত ৩১৭। ভারতের সীমান্ত অঞ্চল ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশে হামের প্রকোপ এই মুহূর্তে অতিমারীর আকার নিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৬ শিশুমৃত্যুর খবর মিলতেই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে ঢাকায়। সরকারি হিসেব বলছে, নিশ্চিত এবং উপসর্গ-ভিত্তিক মিলিয়ে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৭। মার্চের মাঝামাঝি থেকে শুরু হওয়া সংক্রমণে ইতিমধ্যেই আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭ হাজার ছাড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে এ ধরনের সংক্রামক রোগের এমন ব্যাপক বিস্তার দেখা যায়নি।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা ডিজিএইচএস জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় যে ৬ টি মৃত্যুর খবর নথিভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে ২ জনের শরীরে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছিল। বাকি ৪ জনের ক্ষেত্রে ছিল হাম-সদৃশ উপসর্গ। নিশ্চিত হওয়া দুটি মৃত্যুই ঢাকা বিভাগে। এর ফলে সেখানে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৫৪। অন্য দিকে, সিলেট বিভাগে দুজন এবং খুলনা ও রাজশাহিতে এক জন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে। সে হিসেব ধরলে সন্দেহভাজন মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৬৩। একই সময়ে নতুন করে ২৫৯টি নিশ্চিত সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ফলে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা এখন ৫,৭২৬। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১,১৮৬টি নতুন সন্দেহভাজন সংক্রমণের খবর নথিভুক্ত করেছে ডিজিএইচএস। সব মিলিয়ে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি।
পরিসংখ্যানের উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১৭ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, যা চলতি প্রাদুর্ভাবের মধ্যে এক দিনে সর্বাধিক। অর্থাৎ, মৃত্যুর গতি সাময়িক ভাবে কিছুটা কমলেও সংক্রমণের বিস্তার যে এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তা স্পষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৯,১৬১টি সন্দেহভাজন এবং প্রায় ৩ হাজারের কাছাকাছি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণ ধরা পড়েছিল। এরপর সংক্রমণ ছড়িয়েছে ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায়। ৮টি বিভাগের সব কটিতেই রোগের উপস্থিতি মিলেছে। ডব্লিউএইচও এ পরিস্থিতিকে জাতীয় স্বাস্থ্যস্তরে ‘উচ্চ ঝুঁকি’ বলে চিহ্নিত করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা শিশুদের বয়সের পরিসংখ্যান। মোট আক্রান্তের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সি। তার মধ্যে ২ বছরের কম বয়সি শিশু ৬৬ শতাংশ। আবার আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৯ মাসেরও কম। অর্থাৎ, যাদের অনেকেই এখনো নিয়মিত টিকার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছয়নি। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এ তথ্যই স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে জনসমষ্টির রোগপ্রতিরোধে বড়ো ধরনের ফাঁক তৈরি হয়েছে। ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা সবচেয়ে বেশি সংক্রামিত এলাকা। শুধু ঢাকাতেই সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৮ হাজারের বেশি। ঘন জনবসতি, সীমিত স্বাস্থ্যপরিকাঠামো এবং টিকাকরণে অনিহা— এই তিনটি কারণকে বিশেষ ভাবে দায়ী করছেন স্বাস্থ্যকর্তারা।
বাংলাদেশের একাধিক সংবাদপত্র প্রতিবেদনে, এই প্রাদুর্ভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘এড়ানো যেত এমন বিপর্যয়’ হিসেবে। সেখানে সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রাক্তন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে। অভিযোগ, ১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা ‘হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন সেক্টর প্রোগ্রাম’ ২০২৫ সালের মার্চে যথাযথ বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই বাতিল করা হয়। পরিবর্তনকাল সামলানোর জন্য যে অন্তর্বর্তী প্রকল্পের কথা বলা হয়েছিল, তা অনুমোদন পেতে লেগে যায় সে বছরের নভেম্বর পর্যন্ত। তার ফলেই টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়া থমকে যায়। ১৪ হাজারেরও বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকে ওষুধের জোগান কমতে শুরু করে। জরুরি মজুতও ফুরিয়ে আসে। এর আগে বাংলাদেশ ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা সংগ্রহ করত। কিন্তু পরে ওই ব্যবস্থা বদলে অর্ধেক টিকা উন্মুক্ত দরপত্রে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইউনিসেফ আগেই এ পরিবর্তন নিয়ে সতর্ক করেছিল। বাস্তবে নতুন পদ্ধতিতে একটি টিকাও দেশে পৌঁছয়নি বলেও অভিযোগ।
প্রাদুর্ভাবের মানবিক মূল্যও কম নয়। নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ কোনো ডোজই পায়নি। আরও ১৪ শতাংশ মাত্র একটি ডোজ নিয়েছিল। অর্থাৎ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত শিশুরা সম্পূর্ণ টিকাসুরক্ষার বাইরে ছিল। এর পাশাপাশি কৃমিনাশক ট্যাবলেট এবং ভিটামিন এ-র মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিও এক বছরের বেশি সময় ধরে স্থগিত ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে শিশুদের সংক্রমণ প্রতিরোধক্ষমতা আরও দুর্বল হয়েছে। সংক্রমণ রুখতে ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ জুড়ে হাম-রুবেলা টিকাকরণ অভিযান শুরু হয়েছে। ৩০ মার্চ জাতীয় টিকাকরণ প্রযুক্তিগত উপদেষ্টা গোষ্ঠী এই কর্মসূচির অনুমোদন দেয়। ৫ এপ্রিল ১৮টি অগ্রাধিকার জেলার ৩০টি উপজেলায় অভিযান শুরু হয়। ২০ এপ্রিল থেকে তা সারা দেশে সম্প্রসারিত হয়েছে। ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সি শিশুদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে। আক্রান্তদের চিকিৎসায় ভিটামিন এ সরবরাহও বাড়ানো হয়েছে। জেলা পর্যায়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল সক্রিয় করা হয়েছে এবং হাসপাতালগুলিতে পৃথকীকরণ ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে।
তবু উদ্বেগ কাটছে না। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, বাংলাদেশের ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিয়মিত জনচলাচলের কারণে সংক্রমণ সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা যথেষ্ট। যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকার সঙ্গে ভারতের ব্যস্ত স্থলবন্দর রয়েছে। ফলে আঞ্চলিক স্তরেও ঝুঁকি এখন ‘উচ্চ’ বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশ এক সময় হাম নির্মূলে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হত। দুই দশক ধরে টিকাকরণ ধারাবাহিক ভাবে বেড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক এ সঙ্কট দেখিয়ে দিল, জনস্বাস্থ্যের পরিকাঠামোয় সামান্য শৈথিল্যও কত দ্রুত বহু বছরের সাফল্যকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।
❤ Support Us






