Advertisement
  • দে । শ
  • মে ৬, ২০২৬

কী হলো বনের রাজার! ৫ মাসে ২৮ বাঘের মৃত্যুতে প্রশ্নের মুখে মধ্যপ্রদেশের সংরক্ষণ কাঠামো

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কী হলো বনের রাজার! ৫ মাসে ২৮ বাঘের মৃত্যুতে প্রশ্নের মুখে মধ্যপ্রদেশের সংরক্ষণ কাঠামো

ভারতে ‘বাঘের রাজ্য’ নামে পরিচিত মধ্যপ্রদেশে ফের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বাঘমৃত্যুর পরিসংখ্যান। বছরের এখনো ৫ মাসও পূর্ণ হয়নি। তার মধ্যেই রাজ্যে ২৮টি বাঘের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি (এনটিসিএ)-র সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, শুধু এপ্রিলের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ১২টি বাঘের। ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে— দেশে সর্বাধিক বাঘের আবাসস্থল হয়েও কেন বারবার ‘বনের রাজা’র মৃত্যুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে মধ্যপ্রদেশ?

ভারতে বর্তমানে ৩,০০০-এরও বেশি বাঘ রয়েছে। ২০২২ সালের ‘অল ইন্ডিয়া টাইগার এস্টিমেশন’-এর হিসেব অনুযায়ী, তার মধ্যে প্রায় ৭৮৫টি বাঘ রয়েছে মধ্যপ্রদেশে। অর্থাৎ দেশের মোট বাঘসংখ্যার সবচেয়ে বড়ো অংশই এই রাজ্যে। কানহা, বান্ধবগড়, পেঞ্চ, পন্না-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংরক্ষিত বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রদেশকে ভারতের বাঘ সংরক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে। কিন্তু সে সাফল্যের সমান্তরালে ক্রমশ বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা।

এনটিসিএ-র পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে মধ্যপ্রদেশে ৩৪টি বাঘের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় ৪৩। ২০২৩ সালে প্রায় ৪৫, ২০২৪ সালে ৪৭। আর ২০২৫ সালে সংখ্যাটি পৌঁছে যায় ৫৫-তে। ১৯৭৩ সালে ‘প্রজেক্ট টাইগার’ চালু হওয়ার পর এক বছরে এত বেশি বাঘমৃত্যুর নজির কোনো রাজ্যে আগে দেখা যায়নি। শুধু মধ্যপ্রদেশ নয়, গোটা দেশেই গত বছর ১৬৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা ছিল ১২৬। অর্থাৎ জাতীয় স্তরেও সংকেতটি উদ্বেগজনক। চলতি বছরও উদ্বেগজনক প্রবণতা থামার লক্ষণ নেই। এ বছরের প্রথম মৃত্যু নথিভুক্ত হয় ৭ জানুয়ারি, বান্ধবগড় টাইগার রিজার্ভে। গত কয়েক বছরের একই সময়সীমায় যেখানে ১৬ থেকে ১৯টি বাঘের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে এ বছর মাত্র কয়েক মাসে সংখ্যাটি পৌঁছে গিয়েছে ২৮-এ। বন দফতরের রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এনটিসিএ এই পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করছে।

কিন্তু কেন মরছে এত বাঘ? বন আধিকারিকদের একাংশের মতে, বাঘের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এলাকা দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ। বিশেষ করে তরুণ পুরুষ বাঘ নতুন আবাসভূমির খোঁজে একে অপরের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রদেশে বাঘের ঘনত্ব বেশি হলেও সব বনাঞ্চল পরস্পরের সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে সংযুক্ত নয়। ফলে আবাসস্থলের উপর চাপ বাড়ছে। সংরক্ষণবিদদের মতে, এটাই বহু ‘প্রাকৃতিক’ মৃত্যুর অন্যতম কারণ। তবে সমস্যার পরিধি শুধু সেখানেই থেমে নেই। সম্প্রতি কানহা টাইগার রিজার্ভে একটি বাঘিনী ও তার চারটি শাবকের মৃত্যু রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা উস্কে দিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ক্যানাইন ডিস্টেম্পার ভাইরাস (সিডিভি)-এর সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। এ ভাইরাস সাধারণত সংলগ্ন গ্রামের টিকাহীন কুকুরের মাধ্যমে বনে প্রবেশ করে। মানুষের হাম রোগের মতোই অত্যন্ত সংক্রামক এই ভাইরাস বাঘের শ্বাসযন্ত্র, পরিপাকতন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত হানে। জ্বর, কাশি, খিঁচুনি থেকে দ্রুত মৃত্যু— বন্য পরিবেশে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় বিপদ আরও গভীর।

এর পাশাপাশি রয়েছে বনের ধারে বিদ্যুতের তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা, মানুষ-বন্যপ্রাণ সংঘাত এবং চোরা শিকারের আশঙ্কা। এনটিসিএ-র নীতি অনুযায়ী, প্রতিটি বাঘমৃত্যুকেই প্রথমে সম্ভাব্য চোরা শিকার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। পরে তদন্তে অন্য কারণ নিশ্চিত হলে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়। উদ্বেগের মধ্যেই আলোচনায় এসেছে পন্না টাইগার রিজার্ভের সাম্প্রতিক ঘটনা। মাত্র কয়েক দিন আগে উদ্ধার করা হয়েছিল দুই বছরের একটি পুরুষ বাঘকে। অমঙ্গঞ্জ বাফার রেঞ্জের তারা গ্রামে মানববসতির খুব কাছে চলে আসায় ২৬ এপ্রিল তাকে ধরা হয়েছিল। পশুচিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণের পর তাকে সুস্থ ঘোষণা করা হয়। তার গলায় রেডিও-কলার পরিয়ে ফের জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পন্না রিজার্ভের রামপুরা বিটের একটি নালার ধারে বাঘটির মৃতদেহ উদ্ধার হয়।

সোমবার অমঙ্গঞ্জ বাফার এলাকার মধ্যে দেহটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পন্না টাইগার রিজার্ভের ফিল্ড ডিরেক্টর ব্রিজেন্দ্র শ্রীবাস্তব।তিনি জানিয়েছেন, ‘মৃতদেহটি অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে। ঘটনাস্থলে প্রাথমিক ভাবে চোরা শিকার বা বাহ্যিক আঘাতের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন নেই। নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা যাবে না।’ বন দফতর দাবি করেছে, সমস্ত প্রোটোকল মেনে উদ্ধার, চিকিৎসা এবং পুনর্মুক্তির কাজ করা হয়েছিল। ঘটনাস্থলের প্রমাণও সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। তবু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, রেডিও-কলার পরানো, সুস্থ বলে ঘোষিত এবং পর্যবেক্ষণে থাকা একটি বাঘ কী ভাবে কয়েক দিনের মধ্যে মারা গেল? পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার কোথায় ফাঁক রইল?

বন্যপ্রাণ কর্মী অজয় দুবে এই মৃত্যুকে সরাসরি প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে আখ্যা দিয়েছেন। সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘শুধু দুর্ভাগ্যজনক নয়, বাঘমৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছে বনদফতরের ব্যাপক ত্রুটি ও পদ্ধতিগত ভুল সিদ্ধান্ত। বন আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়াই এই পুনরাবৃত্ত মৃত্যুর মূল কারণ। উচ্চপ্রযুক্তির ‘কলার’ পরানোর কোনো মানেই হয়না, যদি মাটিতে থাকা কর্মীরা নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করেন।’ পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করেছে সরকার। বিশেষ করে বান্ধবগড়ে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছে। বিভিন্ন আবেদনের ভিত্তিতে দ্রুত রিপোর্ট, তদন্তের অগ্রগতি ও জবাবদিহি চাওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে গ্রামের কুকুরদের টিকাকরণ শুরু হয়েছে। জোরদার করা হয়েছে চোরা শিকার বিরোধী টহল। পাশাপাশি বন করিডর উন্নত করে বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলগুলিকে আরও কার্যকর ভাবে সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। তবু সংরক্ষণবিদদের মতে, সমস্যার মূল জায়গা আরও গভীরে। বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে সাফল্যের ইঙ্গিত। কিন্তু শুধু সংখ্যা বাড়লেই সংরক্ষণ সফল হয় না। প্রয়োজন নিরাপদ বিস্তৃত আবাসভূমি, সংযুক্ত করিডর, বনসীমান্তে কম ঝুঁকি আর দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল নজরদারি ব্যবস্থা। মধ্যপ্রদেশের পরিচয়, পর্যটন অর্থনীতি এবং বন্যপ্রকৃতির গর্ব, সব কিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে বাঘ। সে কারণেই এই মৃত্যুগুলি শুধু পরিসংখ্যান নয়; বিশেষ সতর্কবার্তা। এখন দেখার, ‘টাইগার স্টেট’ তার সবচেয়ে বড়ো প্রতীককে রক্ষায় কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!