- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ৬, ২০২৬
ভোট-পরবর্তী হিংসায় সন্দেশখালিতে রাতভর অশান্তি ! গুলিবিদ্ধ ন্যাজাট থানার ওসি, জখম পুলিশকর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান
বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার চব্বিশ ঘণ্টাও পেরোয়নি। তার মধ্যেই আবারও উত্তপ্ত উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি।মঙ্গলবার গভীর রাতে ন্যাজাট থানার রাজবাড়ি এলাকায় দুই রাজনৈতিক শিবিরের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে দুষ্কৃতীদের গুলিতে আহত হলেন ন্যাজাট থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ভরত প্রসূন পুরকায়স্থ। তাঁর সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এক মহিলা কনস্টেবল, আরও এক পুলিশকর্মী, এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর ২ জওয়ান। ভোট-পরবর্তী অশান্তির আবহে এই ঘটনায় নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সন্দেশখালি। আতঙ্ক ছড়িয়েছে গোটা এলাকায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, মঙ্গলবার রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ন্যাজাট থানার অন্তর্গত রাজবাড়ি এলাকায় দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে বচসা শুরু হয়। প্রথমে তর্কাতর্কি, পরে তা দ্রুত সংঘর্ষের চেহারা নেয়। অভিযোগ, একদল দুষ্কৃতী একটি বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চালাচ্ছিল। খবর পেয়ে ন্যাজাট থানার ওসি ভরত প্রসূন পুরকায়স্থের নেতৃত্বে বিশাল পুলিশবাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। পুলিশ গ্রামে ঢুকতেই আচমকা পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। অভিযোগ, একটি বাড়ির ভিতর থেকে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে অতর্কিতে গুলি চালাতে শুরু করে দুষ্কৃতীরা। মুহূর্তে থমকে যায় অভিযান। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে রাজবাড়ি এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথমে চিৎকার, তার পর পরপর গুলির আওয়াজ। আতঙ্কে ঘরের আলো নিভিয়ে দরজা-জানলা বন্ধ করে দেন অনেকেই।
হামলায় গুলিবিদ্ধ হন ওসি ভরত প্রসূন পুরকায়স্থ। তাঁর পায়ে গুলি লাগে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। একই সঙ্গে আহত হন তাঁর সঙ্গে থাকা এক মহিলা কনস্টেবল এবং আরও এক পুলিশকর্মী। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে গুলির আঘাতে জখম হন কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুই জওয়ানও। প্রথম ধাক্কায় এলাকায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। পরে অতিরিক্ত বাহিনী ডেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা শুরু হয়। রাতেই আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কয়েক জনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁদের ইএম বাইপাসের ধারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ওসি-সহ আহত পুলিশকর্মী ও জওয়ানরা। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁদের কয়েক জনের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল হলেও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
বুধবার সকাল হতেই সন্দেশখালির চেহারা যেন বদলে যায়। ন্যাজাট থানার বিটপোল, সরবেড়িয়া, আগারহাটি, বামনঘেরি এবং রাজবাড়ি সংলগ্ন এলাকা কার্যত জনশূন্য। রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। গ্রামজুড়ে থমথমে পরিবেশ। বিশাল পুলিশবাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। এলাকায় টহল দিচ্ছেন বসিরহাট পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অলকানন্দ ভাওয়াল। রাতভর তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র, কয়েক রাউন্ড কার্তুজ এবং তাজা বোমা উদ্ধার করেছে পুলিশ। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, কারা ওই বাড়ির ভিতরে আশ্রয় নিয়েছিল, কারা গুলি চালিয়েছে এবং কোথা থেকে অস্ত্র সেখানে পৌঁছল। ঘটনায় ইতিমধ্যেই কয়েক জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে। যদিও এ পর্যন্ত পুলিশের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেফতারের কথা জানানো হয়নি। স্থানীয়দের একাংশ জানিয়েছেন, রাতের অন্ধকারে আচমকা চিৎকার শুনে দরজা খুলতেই দেখেন এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। তাঁদের কথায়, পুলিশ পৌঁছতেই গুলি চলতে শুরু করে। তার পরেই যে যেদিকে পেরেছেন ছুটে পালিয়েছেন। অনেক পরিবার রাত কাটিয়েছে ঘরের আলো নিভিয়ে আতঙ্কে।
গত কয়েক মাস ধরেই সন্দেশখালির নাম রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার কেন্দ্রে। জমি দখল, স্থানীয়দের উপর অত্যাচার এবং যৌন নির্যাতনের অভিযোগে এই এলাকা বারবার শিরোনামে উঠে এসেছে। সে সময় স্থানীয় তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহানের নাম সামনে আসে। পরে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয়। তদন্তকারীরা তাঁকে একাধিক মামলায় প্রধান অভিযুক্ত বলে চিহ্নিত করেন। সেই অস্থিরতার আবহ এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তার মধ্যেই নতুন করে রাতের গুলির ঘটনা সন্দেশখালিকে আবারও রাজ্যের অশান্তির মানচিত্রে ঠেলে দিল।
তবে, শুধু সন্দেশখালিই নয়, ভোট-পরবর্তী উত্তেজনার আঁচ ছড়িয়েছে রাজ্যের বহু প্রান্তেও। ভোটপরবর্তী হিংসায় বলি অন্তত ৪ জন। এবারে দুই দফাতেই মোটের উপর শান্তিপূর্ণ ভাবে নির্বাচন মিটেছিল। কিন্তু ফল ঘোষণার পর ছবিটা দ্রুত বদলে গিয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে সামনে আসছে সংঘর্ষ, প্রতিশোধ, হামলা এবং পাল্টা হামলার খবর।ভোট-পরবর্তী হিংসা ঠেকাতে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভাঙচুর, হামলা বা উসকানিমূলক ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্য দিকে বিজেপি নেতৃত্বের তরফেও জানানো হয়েছে, কোনও দলীয় কার্যালয় দখল বা ভাঙচুর বরদাস্ত করা হবে না। এই পরিস্থিতিতে রাজবাড়ি এলাকায় ১৪৪ ধারা জারির বিষয়টি বিবেচনা করছে স্থানীয় প্রশাসন। আপাতত নজর তদন্তের অগ্রগতির দিকে। তবে গ্রামবাসীদের কথায়, মঙ্গলবার রাতের গুলির পর সন্দেশখালির বাতাসে এখনও আতঙ্কের গন্ধ। শান্তি ফিরলেও সেই রাতের শব্দ অনেক দিন মনে থেকে যাবে।
❤ Support Us







