- বি। দে । শ
- মে ৬, ২০২৬
নেপালে সাংবিধানিক নিয়োগের নতুন পরিকাঠামো, আপত্তি সত্ত্বেও অধ্যাদেশে সই রাষ্ট্রপতি পৌডেলের
কয়েক দিনের টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত সাংবিধানিক পরিষদ সংক্রান্ত অধ্যাদেশে সই করলেন নেপালের রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল। বালেন শাহ-র সরকার কোনো সংশোধন না করেই পুনরায় পাঠিয়েছিল বিলটি। রাষ্ট্রপতি প্রথম দফায় আপত্তি জানিয়ে সেটি ফেরত পাঠালেও, মন্ত্রিসভা আগের অবস্থানেই অনড় থাকে। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক করে সরকারি মুখপাত্র সস্মিত পোখরেল জানিয়ে দেন, আগের খসড়াই রাষ্ট্রপতির কাছে ফের পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে, পুনরায় রাষ্ট্রপতির দফতরে পৌঁছয় অধ্যাদেশ। মঙ্গলবার তাতে অনুমোদন দেন রাষ্ট্রপ্রধান। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সাংবিধানিক সংস্থাগুলির গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের পথ কার্যত প্রশস্ত হলো।
নেপালের রাজনৈতিক মহলে গত কয়েক দিন ধরে এই অধ্যাদেশ ঘিরে জোর বিতর্ক চলছিল। রাষ্ট্রপতি পৌডেলের আপত্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাংবিধানিক পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি। তাঁর মত ছিল, ৬ সদস্যের এই পরিষদের সিদ্ধান্ত কেবল বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, সমস্ত সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য, অতীতেও অনুরূপ বিধান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি একই অবস্থান নিয়েছিলেন। নতুন অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, অন্তত ৪ সদস্য উপস্থিত থাকলেই সাংবিধানিক পরিষদের বৈঠক বৈধ বলে গণ্য হবে। উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। অর্থাৎ, ৪ সদস্যের বৈঠকে ৩ জনের সম্মতিতেই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সুপারিশ পাস হয়ে যেতে পারে। সমালোচকদের বক্তব্য, এতে পূর্ণ সদস্যসংখ্যার প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্নও সামনে আসছে।
অধ্যাদেশ জারির আগে প্রচলিত আইনে ডেকোরাম পূরণের জন্য ৫ সদস্যের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক ছিল। শুধু তা-ই নয়, প্রথম বৈঠকে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতো। যদি ঐকমত্যে পৌঁছনো না যেত, তবে পরবর্তী বৈঠকে পূর্ণ সদস্যসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান ছিল। নতুন ব্যবস্থায় সেই কাঠামো অনেকটাই শিথিল হল বলেই মনে করছেন আইনজ্ঞদের একাংশ। তাঁদের মতে, সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে কোনো অধ্যাদেশ একবার পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানোর সুযোগ দিলেও সরকার যদি সেটি আবার সুপারিশ করে পাঠায়, তা হলে অনুমোদন দেওয়া রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব। নেপালের বরিষ্ঠ আইনজীবী চন্দ্রকান্ত গাওয়ালি জানান, পুনরায় সুপারিশ করা হলে রাষ্ট্রপতির আর তা আটকে রাখার সাংবিধানিক অবকাশ থাকে না।
এই অধ্যাদেশের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। সাংবিধানিক পরিষদই দেশের প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, রাষ্ট্রদূত, কমিশনার এবং ১৩টি সাংবিধানিক কমিশনের প্রধানদের নাম সুপারিশ করে। বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। বিশেষত প্রধান বিচারপতির পদে নিয়োগ বিলম্বিত হওয়ায় প্রশাসনিক ও বিচারিক স্তরে অস্বস্তি বাড়ছিল। সরকারের বক্তব্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতেই এই সংশোধন জরুরি হয়ে পড়েছিল। বর্তমান ৬ সদস্যের সাংবিধানিক পরিষদের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ। অন্য সদস্যরা হলেন প্রধান বিচারপতি, প্রতিনিধি সভার স্পিকার, জাতীয় পরিষদের চেয়ার, প্রতিনিধি সভায় বিরোধী দলের নেতা এবং ডেপুটি স্পিকার। বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার শাসক শিবিরের অন্তর্গত। কার্যনির্বাহী প্রধান বিচারপতিকে তুলনামূলক নিরপেক্ষ বলেই ধরা হয়। অন্য দিকে ডেপুটি স্পিকার এবং বিরোধী দলের নেতা যথাক্রমে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি এবং নেপালি কংগ্রেসের প্রতিনিধি।
এ ঘটনায় নেপালের সাংবিধানিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূচনা হল বলেই মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল। এক দিকে সরকার বলছে, প্রশাসনিক অচলাবস্থা কাটিয়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কার্যকর রাখতে দ্রুত নিয়োগ অপরিহার্য। অন্য দিকে বিরোধী শিবির ও আইনজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, সংখ্যার সরল অঙ্কে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন ডেকে আনতে পারে।
❤ Support Us








