- বি। দে । শ
- মে ২, ২০২৬
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ফের জ্বলে ওঠার আশঙ্কা ! যুদ্ধবিরতির চুক্তি মানছে না ওয়াশিংটন, অভিযোগ তেহরানের
যুদ্ধবিরতি সম্পূর্ণভাবে নিরাপত্তা দিতে পারেনি, এরই মধ্যে ফের উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়ার আকাশ। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘাত আবারও শুরু হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তেহরানের অভিযোগ, সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ সত্ত্বেও ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি বা সমঝোতার প্রতি প্রকৃত অর্থে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়।
ইরানের সামরিক সদর দফতরের উপপ্রধান মোহাম্মদ জাফর আসাদি শুক্রবার সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া বিবৃতিতে বলেন, ‘আমেরিকা কোনো চুক্তি বা সন্ধিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাই নতুন করে সংঘর্ষের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।’ তাঁর দাবি, মার্কিন প্রশাসনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ এবং শীর্ষ কর্তাদের মন্তব্যে কূটনৈতিক সদিচ্ছার চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিতই বেশি স্পষ্ট। আসাদি আরও বলেছেন, ‘মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনেকটাই গণমাধ্যমমুখী। এক দিকে তেলের দাম যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, অন্য দিকে তারা নিজেরাই যে জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।’ একই সঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে এবং আমেরিকার যে কোনো নতুন দুঃসাহসিকতা বা অবিবেচক পদক্ষেপের জবাব দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, তেহরানের তরফে আলোচনার নতুন প্রস্তাব ডোনাল্ড ট্রাম্প খারিজ করে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউস ছেড়ে ফ্লোরিডার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সমঝোতা চায়, কিন্তু তারা এমন কিছু চাইছে, যা আমি মেনে নিতে পারি না।’ ট্রাম্পের আরও দাবি, ইরানের নেতৃত্ব অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন, দুই বা তিনটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত।
যদিও ওয়াশিংটন সূত্রে খবর, আলোচনার কাজ পুরোপুরি থেমে যায়নি। ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, যুদ্ধবিরতির জেরে সংঘাত কার্যত ‘সমাপ্ত’। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’-কে ‘অসাংবিধানিক’ বলেও অভিহিত করেছেন। মার্কিন আইনে বলা রয়েছে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ৬০ দিনের বেশি সামরিক অভিযান চালানো যায় না। ১ মে সে সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার মুখে, কিন্তু এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কংগ্রেসে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক টানাপড়েনও ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের আনা যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব খারিজ হয়ে যায়। এর ফলে প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা আপাতত ব্যর্থ।
এই অবস্থায় হোয়াইট হাউসের অবস্থানও কিছুটা দ্ব্যর্থক। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেছেন, ‘আমরা যুদ্ধে নেই। এ মুহূর্তে সক্রিয় বোমাবর্ষণ বা সরাসরি সামরিক অভিযান চলছে না। আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি।’ তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে জানান, প্রশাসনের ধারণা, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে ৬০ দিনের আইনি ঘড়ি আপাতত থেমে থাকবে। তবে ইরানের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। তেহরানের বক্তব্য, যুদ্ধের আগে ইসলামাবাদে আলোচনাসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক পর্যায়ে তারা যথেষ্ট নমনীয়তা দেখিয়েছে। কিন্তু তার প্রতিদানে আমেরিকার তরফে সমঝোতার বদলে চাপ আর আক্রমণাত্মক অবস্থানই ক্রমশ বেড়েছে। ইরানি সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক আলোচনায় অবরোধ প্রত্যাহারের প্রশ্নে তেহরান কিছুটা নরম হলেও, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি এখনো তাদের কাছে অগ্রাধিকারের জায়গায় রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র এসমায়িল বাঘাই আরও এক ধাপ এগিয়ে মার্কিন জনসাধারণকেই সরাসরি প্রশ্ন তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ অপ্ররোচিত আগ্রাসন। আমেরিকার মানুষের অধিকার আছে, কেন এই বেআইনি যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হলো, সে বিষয়ে সরকারের কাছে তাঁরা জবাবদিহি দাবি করুক।’ এ দিকে মার্কিন জনমতও প্রশাসনের পক্ষে এককাট্টা নয়। ওয়াশিংটন পোস্ট-এবিসি-ইপসস–এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ৬১ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ ট্রাম্পের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও পরিস্থিতি মোটেই স্থিতিশীল নয়। কূটনৈতিক আলোচনার পর্দার আড়ালে অবিশ্বাস, রাজনৈতিক সংঘাত এবং সামরিক প্রস্তুতির সমান্তরাল স্রোত চলছেই। তেহরানের মূল্যায়ন স্পষ্ট, আপাত শান্তির আবরণ থাকলেও, পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠার আশঙ্কা এখনো কাটেনি।
❤ Support Us







