- বি। দে । শ
- মে ২, ২০২৬
হাসপাতালে ইরানের নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি
ইরানের কারাগার থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ২০২৩ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি-কে। জানা যাচ্ছে, শুক্রবার তাঁর শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে জেল কর্তৃপক্ষ। ‘নার্গিস মোহাম্মদি ফাউন্ডেশন’-এর দাবি, উত্তর-পশ্চিম ইরানের জাঞ্জান কারাগারে তিনি দু–বার জ্ঞান হারান। তার পরেই তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ফাউন্ডেশনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মোহাম্মদি দীর্ঘদিন ধরেই গুরুতর হৃদ্রোগজনিত সঙ্কটে ভুগছেন। অবস্থার অবনতি হলে, কারাগারের চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, জেলের ভিতরে তাঁর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাঁকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা প্রয়োজন। সে কারণেই হাসপাতালেই স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফাউন্ডেশনের আরও অভিযোগ, আগেই তাঁকে তেহরানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
মার্চের শেষ দিকেও নার্গিসের শারীরিক অবস্থার অবনতির খবর সামনে এসেছিল। সে সময় তাঁর আইনজীবীরা কারাগারে গিয়ে দেখা করে জানান, তাঁকে অত্যন্ত দুর্বল, ফ্যাকাশে এবং ওজনহীন দেখাচ্ছিল। হাঁটাচলাও করতে পারছিলেন না তিনি। আইনজীবীদের আশঙ্কা, সে সময়েও তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, জেল কর্তৃপক্ষ তখন গুরুত্ব দেয়নি।
৫৩ বছর বয়সি নার্গিস মোহাম্মদি গত ১২ ডিসেম্বর পূর্ব ইরানের শহর মাশহাদ সফরের সময় গ্রেফতার হন। তার পর থেকেই তিনি জেলবন্দি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে সমাবেশ, সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার ইত্যাদি অভিযোগে তাঁকে সাত বছরের বেশি কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ডিসেম্বরের গ্রেপ্তারের সময়ই তাঁর উপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। তারপর থেকেই তাঁর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। তবে অভিযোগ নিয়ে এখনো পর্যন্ত ইরান সরকারের তরফে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। এবছরের ফেব্রুয়ারিতে নোবেল কমিটি এক বিবৃতিতে মোহাম্মদির উপর ‘চলমান প্রাণঘাতী হামলা’-র নিন্দা জানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলেও তাঁর স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তবে, নার্গিস মোহাম্মদি এই প্রথম কারাবাস নয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশ এবং সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারের অভিযোগে এর আগেও তাঁকে একাধিক বার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০১১ সালে প্রথম তাঁকে আটক করা হয়। ২০১৫ সালে ফের গ্রেফতার করা হয়। পরে তাঁকে এভিন জেল এবং জাঞ্জান কেন্দ্রীয় কারাগারে বিভিন্ন সময়ে রাখা হয়েছে। ২০২০ সালে সাজা কমানো হলে তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন। পরে চিকিৎসাজনিত কারণে ২০২৪ সালের শেষ দিকে সাময়িক মুক্তিও মিলেছিল। গত বছরের ডিসেম্বরেই আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। নার্গিস মোহাম্মদি দীর্ঘ ৩ দশক ধরে ইরানে নারীর অধিকার, মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং বৃহত্তর মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। তিনি ইরানের ‘মানবাধিকার রক্ষাকারী কেন্দ্র’-এর উপ-পরিচালক। ২০২৩ সালে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় ‘ইরানে নারীর উপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সকলের জন্য মানবাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে তাঁর নিরলস লড়াই’-এর স্বীকৃতিস্বরূপ।
২০২২ সালে মাশা আমিনি-র মৃত্যুর পরে ইরান জুড়ে যে তীব্র বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, সে সময়ও কারাগার থেকেই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মোহাম্মদি। তিনি বলেছিলেন, ‘যত বেশি আমাদের বন্দি করা হবে, আমরা ততই শক্তিশালী হব।’ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কারাগারের অন্ধকারের মধ্যে থেকেও নার্গিস মোহাম্মদি ইরানের নারীমুক্তি আন্দোলনের এক প্রতীক। কিন্তু সে প্রতীকের শরীরই এখন গভীর সঙ্কটে। তাঁর বর্তমান শারীরিক অবস্থার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক বন্দিদের চিকিৎসার অধিকার নিয়েও কি আবার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে চলেছে ইরান?
❤ Support Us







