- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ৬, ২০২৬
গ্রীসে ‘নিষ্প্রাণ’ আগ্নেয়গিরির অন্দরে নীরব সঞ্চয়, নতুন গবেষণায় এক লক্ষ বছরের ম্যাগমার হদিস
গ্রীসের এথেন্সের অদূরে সারোনিক উপসাগরের শান্ত জলরেখা পেরিয়ে মেথানা উপদ্বীপকে বাইরে থেকে দেখলে আজও তাকে নিস্তরঙ্গ, প্রায় নিশ্চুপ ভূদৃশ্য বলেই মনে হয়। মেথানা আগ্নেয়গিরিকে এত দিন অনেকেই ‘মৃত’ বলেই ধরে নিয়েছিলেন। শেষ অগ্ন্যুৎপাতের পর কেটে গিয়েছে প্রায় দু–হাজার বছরেরও বেশি সময়। আপাত শান্ত–নীরব বুকে যে এত দীর্ঘকাল ধরে গোপনে ম্যাগমার সঞ্চরণ চলছিল, তা অনুমান করেননি বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক গবেষণা আগের সব ধারণাকে আমূল বদলে দিল। গবেষকদের বক্তব্য, মেথানা আগ্নেয়গিরি কখনোই পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল না, বরং অন্তত গত এক লক্ষ বছর ধরে ভূগর্ভে নীরবে চলেছে ম্যাগমার সঞ্চয়, চাপের বৃদ্ধি এবং আগ্নেয়গিরির রূপান্তর।
সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’–এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে এই তথ্য। ইটিএইচ জুরিখের গবেষক রাজভান-গ্যাব্রিয়েল পোপার নেতৃত্বে একদল ভূতত্ত্ববিদ গ্রীসের এথেন্সের কাছাকাছি সারনিক উপসাগর জুড়ে বিস্তৃত মেথানা উপদ্বীপের আগ্নেয় ইতিহাস নতুন করে বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, মেথানার দীর্ঘ ভূতাত্ত্বিক অতীতের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কার্যকলাপের প্রকৃতি বোঝা। গবেষণার ফল বলছে, গত সাত লক্ষ বছরে অন্তত ৩১ বার অগ্নুৎপাত ঘটেছে ওই আগ্নেয়গিরিতে । সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, গবেষকেরা প্রায় এক লক্ষ বছরের একটি দীর্ঘ ‘নিঃশব্দ পর্ব’-এর সন্ধান পেয়েছেন। আনুমানিক ২ লক্ষ ৮০ হাজার বছর আগে থেকে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার বছর আগে পর্যন্ত পৃষ্ঠদেশে কোনো অগ্ন্যুৎপাতের চিহ্ন ছিল না। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এত দীর্ঘ সময় ধরে অগ্ন্যুৎপাত না ঘটলে একটি আগ্নেয়গিরিকে কার্যত মৃত বলেই ধরা হয়। কিন্তু মেথানার ক্ষেত্রে ভূতাত্ত্বিক নথি একেবারে অন্য গল্প বলছে। পৃষ্ঠে নীরবতা থাকলেও ভূগর্ভে থেমে থাকেনি ম্যাগমার গতিবিধি। বরং দীর্ঘ সময়েই ক্রমাগত জমেছে গলিত শিলা, বেড়েছে চাপ, তৈরি হয়েছে ভূগর্ভস্থ আধার।
গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা শুধু দৃশ্যমান লাভা প্রবাহের উপর নির্ভর করেননি। মেথানা উপদ্বীপের বিভিন্ন অংশ থেকে সংগৃহীত শিলা, লাভা ও খনিজের নমুনা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জিরকন স্ফটিকের উপর। আণুবীক্ষণিক এই খনিজগুলি ম্যাগমা ঠান্ডা হওয়ার সময় তৈরি হয় এবং তার ভিতরে আটকে থাকে তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়ামের সূক্ষ্ম চিহ্ন। এই সূত্র ধরেই নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যায় কোন সময়ে ম্যাগমার সঞ্চরণ ঘটেছিল। গবেষকরা ১,২৫০টিরও বেশি জিরকন নমুনা বিশ্লেষণ করে আগ্নেয়গিরির অন্তর্লীন ইতিহাসের বিস্তারিত সময়রেখা তৈরি করেছেন। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য। জিরকন গঠনের সর্বাধিক হার দেখা গিয়েছে ঠিক সে সময়ে, যখন পৃষ্ঠে আগ্নেয়গিরি নিস্তব্ধ ছিল। অর্থাৎ বাইরে থেকে মৃতপ্রায় মনে হলেও ভূগর্ভে তখন বরং আরও সক্রিয় ভাবে তৈরি হচ্ছিল নতুন ম্যাগমা। গবেষকদের মতে, এ তথ্য আগ্নেয়গিরি-বিজ্ঞানের বহু প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
মেথানার ভূতাত্ত্বিক অবস্থানও এই প্রক্রিয়াকে বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগ্নেয়গিরিটি একটি সাবডাকশন জোনের উপরে অবস্থিত। অর্থাৎ, সেখানে একটি টেকটোনিক প্লেট অন্যটির নীচে ঢুকে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় জলসমৃদ্ধ পদার্থ ভূত্বকের গভীরে পৌঁছে ম্যাগমার জন্ম দেয়। বিজ্ঞানীদের ভাষায়, এ ধরনের ম্যাগমা ‘সুপারহাইড্রাস’। গভীরে প্রচণ্ড চাপের কারণে ম্যাগমা তরল অবস্থায় থাকে। কিন্তু উপরের দিকে উঠতে থাকলে চাপ কমে যায়। ফলে দ্রবীভূত জল গ্যাসে পরিণত হয়ে বুদ্বুদ তৈরি করে। গ্যাসই ম্যাগমাকে ক্রমশ আঠালো ও ঘন করে তোলে। রাজভান-গ্যাব্রিয়েল পোপার জানিয়েছেন, ঠিক গ্যাসযুক্ত পানীয়ের বোতল খুললে যেমন আচমকা বুদ্বুদ তৈরি হয়, ভূগর্ভেও অনেকটা তেমনটাই ঘটে। এতে ম্যাগমার গতি ১০০ থেকে ১,০০০ গুণ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, ফলে তা আর সহজে পৃষ্ঠে পৌঁছতে পারে না। বরং মাঝপথেই থেমে থেকে ভূগর্ভে জমতে থাকে। বছরের পর বছর, সহস্রাব্দের পর সহস্রাব্দ ধরে এমন বিপুল সঞ্চয় বিরাট আকারের ম্যাগমা-আধার তৈরি করে।
এ কারণেই গবেষকদের মতে, দীর্ঘ নীরবতা কখনো কখনো উল্টো অর্থও বহন করতে পারে। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও ভিতরে ভিতরে জমতে পারে বিপুল শক্তি। আর যখন সে শক্তি মুক্তির পথ খুঁজে পায়, তখন অগ্ন্যুৎপাত হতে পারে অনেক বেশি তীব্র। মেথানার নতুন আবিষ্কার তাই শুধুমাত্র স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক ঘটনা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে আগ্নেয়গিরি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বিজ্ঞানীদের মতে, নয়া গবেষণা বিশেষ ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ, পৃথিবীর বহু সক্রিয় আগ্নেয় অঞ্চল— প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল কিংবা ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ অংশ— একই ধরনের সাবডাকশন জোনের উপরে অবস্থিত। ফলে যেসব আগ্নেয়গিরিকে বহু দিন ধরে ‘মৃত’ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, তাদের নীচেও একই রকম গোপন ম্যাগমা-সক্রিয়তা থেকে যেতে পারে। বিশেষ করে জনবহুল নগরকেন্দ্রের কাছাকাছি আগ্নেয় অঞ্চলে এই ধরনের ভুল মূল্যায়নের ফল বিপজ্জনক হতে পারে। গবেষকদল তাই উন্নত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার উপর জোর দিয়েছেন।
❤ Support Us






