- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ২২, ২০২৬
বাংলার ‘এসআইআর’-এ আপিলের পাহাড়, থমকে ট্রাইব্যুনালের গতি। ২৫ লক্ষ মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি মাত্র ০.২৬ শতাংশ
ভোট শেষ হয়েছে প্রায় ৩ সপ্তাহ আগে। নতুন সরকার গঠনের রাজনৈতিক উত্তাপও অনেকটাই স্তিমিত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’-কে ঘিরে যে বিতর্ক বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিকে তোলপাড় করেছিল, তার রেশ এখনো কাটেনি। বরং নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য সামনে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে গোটা প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং বিচারব্যবস্থার বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ায় বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রায় ২৫ লক্ষ আপিলের মধ্যে এ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৬,৫৮১টি মামলা। শতাংশের হিসাবে যা দাঁড়ায় মাত্র ০.২৬। অর্থাৎ, ভোট শেষ হয়ে গেলেও অধিকাংশ আবেদনকারী এখনও জানেন না তাঁদের নাম আদৌ ভোটার তালিকায় ফিরবে কি না। এই আপিলগুলি শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গত ২০ মার্চ গঠন করা হয়েছিল ১৯টি বিশেষ আপিল ট্রাইব্যুনাল। অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্ট বিচারপতিদের নেতৃত্বে তৈরি এই ট্রাইব্যুনালগুলির কাজ ছিল, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের দেওয়া সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা। কারণ, ‘এসআইআর’ চলাকালীন বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, বহু প্রকৃত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ১৪ মে পর্যন্ত ১৯টির মধ্যে ১২টি ট্রাইব্যুনাল মিলিয়ে মোট ৬,৫৮১টি আপিলের নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৪,০৪৩টি আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিষ্পত্তিকৃত মামলার প্রায় ৬১.৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট ভোটারদের নাম ফের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খারিজ হয়েছে ১,২৬৭টি আবেদন। তবে বাকি প্রায় ১,২০০টির কী হয়েছে, তা সরকারি নথিতে স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনের একাংশের বক্তব্য, কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের নাম ভোটের আগে প্রকাশিত সম্পূরক তালিকাতেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। ফলে ওই আপিলগুলিতে আলাদা করে সিদ্ধান্ত জানানোর প্রয়োজন পড়েনি।
বিপুল মামলার জটের মধ্যেও সবচেয়ে বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে উত্তর কলকাতা এবং দক্ষিণ কলকাতা অঞ্চলে। দু-জায়গা মিলিয়ে ১,৭৭৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে, যা মোট নিষ্পত্তিকৃত মামলার প্রায় ২৭ শতাংশ। এই ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বে ছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি এস শিবজ্ঞানম। কিন্তু ৭ মে তিনি ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের পরও এই দুই জেলায় ৫১ হাজার ২৩৪টি আপিল এখনও ঝুলে রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ধরা পড়েছে সীমান্তবর্তী দুই জেলা মুর্শিদাবাদ ও মালদহে। দুই জেলাতেই ‘এসআইআর’ চলাকালীন সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই আপিলের সংখ্যাও সর্বাধিক। অথচ নিষ্পত্তির হার সেখানে কার্যত শূন্যের কাছাকাছি। সরকারি তথ্য বলছে, মুর্শিদাবাদে ৬ লক্ষ ২৯ হাজার ৩৯২টি আপিল জমা পড়েছিল। তার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১১২টি। মালদহে ৫ লক্ষ ২৬ হাজার ২১৫টি আপিলের বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৮৫টি মামলার। ফলে কয়েক লক্ষ পরিবার এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ভোট শেষ হয়ে গেলেও তাঁদের নাগরিক পরিচয় আর ভোটাধিকার ঘিরে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
নির্বাচন কমিশনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনেই গোটা আপিল প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর দাবি, ‘যোগ্য ভোটারদের বক্তব্য জানানোর পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অনলাইন এবং অফলাইন— দু–ভাবেই শুনানি চলছে।’ যদিও কমিশনের নিজেদের পরিসংখ্যানই অন্য ছবি তুলে ধরছে। তথ্য অনুযায়ী, ১২টি ট্রাইব্যুনালে মাত্র ৯৮ জন অনলাইনে এবং ২১ জন অফলাইনে হাজির হয়ে নিজেদের বক্তব্য রেখেছেন। ফলে এত বিপুল সংখ্যক মামলার তুলনায় শুনানির গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, বিশেষ এই সংশোধনের উদ্দেশ্য ছিল ভোটার তালিকাকে আরও ‘নির্ভুল’ ও ‘স্বচ্ছ’ করা। বহু ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র, বয়স, ঠিকানা বা অন্যান্য নথিতে ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ ধরা পড়েছিল। সে কারণেই এমন নজিরবিহীন যাচাই অভিযান চালানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৪ জুন নির্বাচন কমিশন হঠাৎ করেই পশ্চিমবঙ্গে ‘এসআইআর’-এর সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় দু–দশক ধরে যে সংক্ষিপ্ত বার্ষিক সংশোধন প্রক্রিয়া চলছিল, তা থেকে সরে এসে সম্পূর্ণ নতুন করে ভোটার তালিকা তৈরির পথে হাঁটে কমিশন। বিদ্যমান ভোটারদেরও নথিভিত্তিক যাচাইয়ের আওতায় আনা হয়, যা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন নির্বাচন কমিশনের সফটওয়্যার প্রায় ৬০.০৬ লক্ষ ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ বা তথ্যে অসঙ্গতির অভিযোগে চিহ্নিত করে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কলকাতা হাই কোর্ট প্রায় ৭০০ বিচার বিভাগীয় আধিকারিকের নাম সুপারিশ করে যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য। তাঁদের মধ্যে অনেককেই ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্য থেকেও আনা হয়েছিল।
এই বিচার বিভাগীয় আধিকারিকরাই চূড়ান্ত যাচাইয়ের পর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা থেকে ২৭.১৬ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল ঝড় ওঠে। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, বিপুল সংখ্যক প্রকৃত ভোটারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন ধারাবাহিক ভাবে দাবি করে এসেছে, ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেই গত ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ করে জানায়, নির্বাচন কমিশন এবং তৎকালীন তৃণমূল সরকার, উভয়ের মধ্যেই আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এরপর আদালত বিচার বিভাগীয় হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেয়। পরে ১০ মার্চ শীর্ষ আদালত আরও নির্দেশ দেয়, যাঁরা বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট, তাঁদের জন্য পৃথক আপিল ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
আদালতের নির্দেশ মেনে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পলের সুপারিশে নির্বাচন কমিশন ২০ মার্চ ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসে, ততই স্পষ্ট হতে থাকে যে, বিপুল সংখ্যক মামলার তুলনায় ট্রাইব্যুনালের কাজ অত্যন্ত ধীর গতিতে চলছে। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগে পর্যন্ত যাঁরা ট্রাইব্যুনাল থেকে স্বস্তি পাবেন, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ওই নির্দেশ কার্যকর করে ভোটের আগে মাত্র ১,৬০৭ জনের নাম ফের তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, বাদ পড়া বাকি প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগই পাননি।
এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন মোট কত আপিল জমা পড়েছে এবং কতগুলির নিষ্পত্তি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেনি। যদিও কমিশন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কিন্তু প্রায় ২৫ লক্ষ আপিলের তুলনায় সংখ্যা যে নগণ্য, তা নিয়ে সংশয় নেই প্রশাসনিক এবং আইন মহলে। এর মধ্যেই এসআইআর প্রক্রিয়ার বৈধতা, বিদ্যমান ভোটারদের নথিভিত্তিক যাচাই এবং ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। ফলে ভোট মিটলেও বাংলার ভোটার তালিকা বিতর্ক যে এখনো শেষ হয়নি, তা স্পষ্ট।
❤ Support Us





