- দে । শ
- মে ২২, ২০২৬
জাতীয় সড়কে সিসি ক্যামেরায় সেনার উপর নজরদারি ! পাঠানকোটে ধৃত পাক-গুপ্তচর
পাঠানকোটের সেনা করিডরের উপর নজরদারি চালাতে জাতীয় সড়কের ধারে গোপনে বসানো হয়েছিল সিসিটিভি ক্যামেরা। তাতে ধরা পড়ত সেনা কনভয়ের যাতায়াত, সেনা অফিসারদের চলাফেরা, আধাসামরিক বাহিনীর গাড়ি চলাচল-সহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গতিবিধি। অভিযোগ, সে লাইভ ফুটেজ সরাসরি পাঠানো হতো পাকিস্তানে থাকা হ্যান্ডলারদের কাছে।
সীমান্তবর্তী পাঞ্জাবে নতুন করে গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কা বাড়িয়ে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর্দাফাঁস করল পাঞ্জাব পুলিশ। গ্রেফতার করা হয়েছে বলজিৎ সিং ওরফে বিট্টু নামে এক ব্যক্তিকে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, তিনি একটি বৃহত্তর আন্তঃদেশীয় গুপ্তচর নেটওয়ার্কের অংশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পাঠানকোটের চাক ধাড়িওয়াল গ্রামের বাসিন্দা বলজিৎ জাতীয় সড়ক ৪৪-এর ধারে সুজনপুর এলাকার কাছে একটি দোকানে ইন্টারনেট-ভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। জায়গাটি কৌশলগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পাঠানকোট থেকে জম্মুর দিকে যাওয়ার এ করিডর দিয়েই নিয়মিত সেনাবাহিনীর কনভয়, সামরিক ট্রাক এবং আধাসামরিক বাহিনীর গাড়ি যাতায়াত করে। তদন্তকারীদের দাবি, সে সমত গতিবিধির উপর নজর রাখতেই বিশেষ ভাবে ক্যামেরা বসানো হয়েছিল।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ক্যামেরাগুলি এমন ভাবে স্থাপন করা হয়েছিল যাতে জাতীয় সড়ক দিয়ে যাওয়া সামরিক কনভয়ের স্পষ্ট ভিডিও ধরা পড়ে। শুধু সেনার গাড়িই নয়, কোন সময়ে কত সংখ্যক বাহিনী যাচ্ছে, কী ধরনের যানবাহন ব্যবহার হচ্ছে— সেসব তথ্যও সংগ্রহের চেষ্টা চলছিল বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের। আরও উদ্বেগের বিষয়, ক্যামেরার লাইভ ভিডিও ফিড সরাসরি পাকিস্তানে থাকা অপারেটিভদের কাছে পৌঁছে যেত বলে অভিযোগ। গোয়েন্দা সূত্রে সন্দেহজনক গতিবিধির খবর পাওয়ার পরেই নজরদারি শুরু করে পাঞ্জাব পুলিশ। পরে প্রযুক্তিগত সূত্র ধরে বলজিৎকে আটক করা হয়। জেরায় তিনি স্বীকার করেছেন, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ওই ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, গোটা কাজের পিছনে ছিল বিদেশি যোগাযোগ। দুবাইয়ে থাকা এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি না কি নিয়মিত নির্দেশ দিত বলজিৎকে। এ কাজের বিনিময়ে অভিযুক্তকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি পুলিশের।
অভিযুক্তের কাছ থেকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও একটি ওয়াই-ফাই রাউটার উদ্ধার করেছে তদন্তকারী দল। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা এখন পরীক্ষা করে দেখছেন, ক্যামেরার ডেটা কোথায় কোথায় পাঠানো হয়েছিল এবং কত দিন ধরে নজরদারি চলছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, শুধু পাঠানকোট নয়, সীমান্তবর্তী আরও কিছু এলাকায় একই ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলিও। কারণ, পাঠানকোট বরাবরই অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। জম্মু-কাশ্মীরের প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত এই করিডর দিয়ে নিয়মিত সেনা চলাচল করে। অতীতে এখানকার বিমানঘাঁটিতে জঙ্গি হামলাও হয়েছিল। ২০১৬ সালের পাঠানকোট এয়ারবেস হামলার ঘটনা এখনো দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম বড়ো সতর্কবার্তা হিসেবে মনে করা হয়। ফলে, সেনা ঘাঁটি সংলগ্ন এলাকায় নতুন করে নজরদারি চক্রের অভিযোগ স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
তদন্তকারীদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর গুপ্তচরবৃত্তির ধরন বদলেছে। আগের মতো সরাসরি সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য পাচারের বদলে এখন ব্যবহার করা হচ্ছে ইন্টারনেট-ভিত্তিক ক্যামেরা, সিম-চালিত ডিভাইস ও সৌরশক্তিচালিত নজরদারি ব্যবস্থা। এতে সন্দেহ কম হয়, দীর্ঘ সময় গোপনে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। নতুন ঘটনার সূত্র ধরে ফের সামনে এসেছে গত মাসে পাঞ্জাবে ধরা পড়া দুই আইএসআই-সমর্থিত গুপ্তচর মডিউলের প্রসঙ্গ। তখন পাঞ্জাব পুলিশ দাবি করেছিল, চিনে তৈরি সৌরশক্তিচালিত সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করে সেনা ঘাঁটি এবং প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত স্থাপনার লাইভ ভিডিও পাকিস্তানে পাঠানো হচ্ছিল। জলন্ধরে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স শাখা এক অভিযানে সুখবিন্দর সিং ওরফে সুখাকে গ্রেফতার করেছিল। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছিল একটি চিনা নির্মিত সিসিটিভি ক্যামেরা, সৌর প্যানেল এবং ৪জি সংযোগ ব্যবস্থা।
একই সময়ে কপুরথলায় কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে যৌথ অভিযানে আরও একটি গুপ্তচর চক্র ভেঙে দেওয়া হয়। সেখানে সোনা এবং সন্দীপ সিং ওরফে সোনু নামে দুই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছিল, সেনা ছাউনির কাছে একটি খুঁটির উপর সিম-ভিত্তিক ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারি চালানো হচ্ছিল। পাকিস্তানে থাকা ‘ফৌজি’ নামে এক হ্যান্ডলার ক্যামেরা বসানোর জন্য অভিযুক্তদের ৩৫ হাজার টাকা দিয়েছিল বলেও জানিয়েছিল পুলিশ। একই সঙ্গে মাদক পাচারের সঙ্গেও যোগ মিলেছিল ওই চক্রের। পাঞ্জাব পুলিশের ডিজিপি গৌরব যাদব তখন জানিয়েছিলেন, এ ধরনের চিনা ক্যামেরা বিশেষ ভাবে অফ-গ্রিড নজরদারির জন্য তৈরি। সৌরশক্তি ও ৪জি সংযোগ ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ বা তারের প্রয়োজন পড়ে না। ফলে জনবহুল এলাকা কিংবা জাতীয় সড়কের ধারে সহজেই গোপনে বসানো সম্ভব হয়।
বর্তমান ঘটনায় মোট ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। বলজিৎ সিং ছাড়াও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে বিক্রমজিৎ সিং ওরফে ভিক্কা, বলবিন্দর সিং ওরফে ভিকি এবং তরণপ্রীত সিং ওরফে তন্নু। পুলিশের সন্দেহ, এরা সকলে কোনো না কোনো ভাবে দেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। পলাতক অভিযুক্তদের খোঁজে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এই গোটা নেটওয়ার্কের সঙ্গে পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের সরাসরি যোগ রয়েছে কি না। একই সঙ্গে দুবাই-যোগ, আর্থিক লেনদেন এবং বিদেশি যোগাযোগের তথ্যও বিশদে পরীক্ষা করা হচ্ছে। গোয়েন্দাদের একাংশের আশঙ্কা, শুধু নজরদারি নয়, ভবিষ্যতে সম্ভাব্য নাশকতার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও তথ্য সংগ্রহ করা হয়ে থাকতে পারে।
❤ Support Us






