- দে । শ
- জুন ১, ২০২৬
প্রয়াত ভাষাতত্ত্ববিদ প্রবাল দাশগুপ্ত
ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী, বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব ও সমাজভাষাবিজ্ঞানের অগ্রগণ্য গবেষক এবং আন্তর্জাতিক এসপেরান্তো আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব প্রবাল দাশগুপ্ত রবিবার গভীর রাতে প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। তাঁর প্রয়াণের খবরে তাঁর প্রয়াণে ভাষাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিক্ষাজগতে শোকের ছায়া।
বিরল মেধার অধিকারী প্রবাল দাশগুপ্ত। তাত্ত্বিক ভাষাবিজ্ঞান, ভাষার রাজনীতি, অনুবাদ চর্চায় যাঁর অনায়াস বিচরণ। ভাষা ঘিরেই তাঁর আজীবন অনুসন্ধিৎসা। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ হয় ‘লিঙ্গুইস্টিক সোসাইটি অব ইন্ডিয়ার মুখপত্র’ ‘ইন্ডিয়ান লিঙ্গুইস্টিকস’ পত্রিকায়। সে সময়ে এমন গবেষণামূলক প্রকাশনা বিরল বলেই গণ্য হতো। অল্প বয়সেই তিনি যে অসাধারণ মেধা ও বিশ্লেষণক্ষমতার পরিচয় দিয়েছিলেন, পরবর্তী কয়েক দশকের কাজ তারই স্বাভাবিক পরিণতি।
১৯৫৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন প্রবাল। বিদ্বজ্জন পরিবারে বেড়ে ওঠা। পিতা অরুণকুমার দাশগুপ্ত ছিলেন খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘ দিন যুক্ত ছিলেন তিনি। মা মানসী দাশগুপ্ত ছিলেন সমাজমনোবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। পরবর্তী কালে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনের অধিকর্তার দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। ফলে শৈশব থেকেই প্রবালের চারপাশে ছিল চিন্তা, গবেষণা এবং সংস্কৃতিচর্চার আবহ। সংস্কৃত কলেজে ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি যান পুনের ডেকান কলেজে। পরে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ পান। ১৯৮০ সালে সেখান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল ‘কোয়েশ্চনস অ্যান্ড রিলেটিভ অ্যান্ড কমপ্লিমেন্ট ক্লজেস ইন আ বাংলা গ্রামার’, যেখানে বাংলা ভাষার প্রশ্নবাচক বাক্য, আপেক্ষিক উপবাক্য আর সম্পূরক উপবাক্যের গঠন নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছিলেন। দক্ষিণ এশীয় ভাষাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সে গবেষণা আজও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
দেশে ফিরে তিনি শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ডেকান কলেজ, হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে দীর্ঘ কর্মজীবন কাটিয়েছেন। আইএসআই-এ ভাষাবিজ্ঞান গবেষণা ইউনিটের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। গবেষণাগারে কিংবা শ্রেণিকক্ষে, সর্বত্রই তিনি ছিলেন কঠোর মানদণ্ডে বিশ্বাসী। কঠোরতার আড়ালে ছিল ছাত্রছাত্রীদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তাঁর বহু ছাত্রছাত্রী পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রবাল দাশগুপ্তের অবদান বহুমাত্রিক। ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, সমাজভাষাবিজ্ঞান, ভাষাদর্শন— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ভাষাবিজ্ঞানের অঙ্গনে বিশেষ ভাবে পরিচিত ছিলেন তথাকথিত ‘সাবস্ট্যান্টিভিস্ট’ ভাষাতাত্ত্বিক ধারার অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে। ভাষাকে শুধুমাত্র বিমূর্ত নিয়মের সমষ্টি হিসেবে না দেখে, মানুষের বাস্তব ভাষাচর্চা, সামাজিক ব্যবহার এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করার পক্ষে তিনি সওয়াল করেছিলেন। ভাষা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক স্তরে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল।
তাঁর লেখা একাধিক বই ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের কাছে অপরিহার্য পাঠ্য। ‘প্রজেক্টিভ সিনট্যাক্স, আফটার এটিমোলজি’ কিংবা ‘ইনহ্যাবিটিং হিউম্যান ল্যাঙ্গুয়েজেস: দ্য সাবস্ট্যান্টিভিস্ট ভিজুয়ালাইজেশন’-এর মতো বইয়ে ভাষার প্রকৃতি, মানবসমাজে তার ভূমিকা নিয়ে তিনি নতুন দৃষ্টিকোণ হাজির করেছিলেন। গবেষণার জগতে তাঁর পরিচিতি ছিল একজন মৌলিক চিন্তাবিদ হিসেবে, যিনি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বকে প্রশ্ন করতে কখনো দ্বিধা করতেন না।
তবে ভাষাবিজ্ঞানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর জনপরিসরেও প্রবাল দাশগুপ্তের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। ইংরেজি ভাষার সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ ‘দ্য আদারনেস অব ইংলিশ: ইন্ডিয়াজ় আন্টি টাং সিনড্রোম’ নব্বইয়ের দশকে ভাষা-রাজনীতির আলোচনায় সাড়া ফেলে দিয়েছিল। স্বাধীনতার পরবর্তী ভারতে ইংরেজির ভূমিকা, মধ্যবিত্ত সমাজের মানসিকতা এবং ভাষাগত ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ আজও সমান প্রাসঙ্গিক বলে মনে করেন গবেষকেরা।
আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রবাল দাশগুপ্তের পরিচিতির আর-এক বড়ো কারণ এসপেরান্তো ভাষা আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে সমতাভিত্তিক যোগাযোগ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে নির্মিত এসপেরান্তো ভাষার একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন তিনি। ১৯৮৩ সালে আকাদেমিও দে এসপেরান্তোর সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ক্রমশ আন্তর্জাতিক এসপেরান্তো জগতের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ‘ইউনিভার্সাল এসপেরান্তো অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৬ সালে ‘অকাদেমিও দে এসপেরান্তো’-র সভাপতি নির্বাচিত হন। আন্তর্জাতিক ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে ভারতীয়দের উপস্থিতি তুলনামূলক ভাবে সীমিত হলেও, প্রবাল দাশগুপ্ত এই পরিসরে ব্যতিক্রমী উচ্চতা অর্জন করেছেন।
এসপেরান্তো ভাষায় তিনি অনুবাদ করেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়েছেন এবং ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছেন। ভাষাগত সাম্য, সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ এবং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপের পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। ভাষাকে তিনি কখনো শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে ভাষা ছিল মানুষের স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি আর সামাজিক অস্তিত্বের ধারক-বাহক। কাজের স্বীকৃতিও এসেছে নানা মহল থেকে। ২০০৪ সালে ‘লিঙ্গুইস্টিক সোসাইটি অব আমেরিকা’ তাঁকে সম্মানসূচক সদস্যপদ দেয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর-দীনময়ী পুরস্কার’-এ সম্মানিত করে। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ‘অর্চনা চৌধুরী পুরস্কার’ পেয়েছিলেন।
❤ Support Us





