Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুন ৪, ২০২৬

হিজবুল্লাহ থামলেই যুদ্ধবিরতি! মার্কিন মধ্যস্থতায় নতুন সমঝোতা ইজরায়েল-লেবাননের  

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হিজবুল্লাহ থামলেই যুদ্ধবিরতি! মার্কিন মধ্যস্থতায় নতুন সমঝোতা ইজরায়েল-লেবাননের  

কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, সীমান্তজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা, হাজার হাজার প্রাণহানি এবং পশ্চিম এশিয়া জুড়ে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার আবহে যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিল ইজরায়েল ও লেবানন। মার্কিন মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর দুই দেশ শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে। তবে সমঝোতার কেন্দ্রে রয়েছে তেল আভিভের শর্ত; ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহকে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে হামলা বন্ধ করতে হবে। দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের সামরিক উপস্থিতি গুটিয়ে না নিলে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়িত হবে না।

বুধবার ওয়াশিংটনে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তত্ত্বাবধানে হওয়া বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দু-দেশ নতুন করে যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটতে রাজি হয়েছে। সেই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে একাধিক ‘পাইলট সিকিউরিটি জোন’ গড়ে তোলার বিষয়েও তাদের ঐকমত হয়েছে। এ অঞ্চলগুলিতে শুধুমাত্র লেবাননের সরকারি সশস্ত্র বাহিনী নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। কোনও অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র সংগঠন, বিশেষত হিজবুল্লাহর সদস্যদের সেখানে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে না।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো লিতানি নদী এবং ইজরায়েল-লেবানন সীমান্তের মধ্যবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে হিজবুল্লাহর সমস্ত সামরিক কার্যকলাপ বন্ধ করা। প্রায় ৩০ কিলোমিটার বিস্তৃত ওই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, ওই অঞ্চলগুলির নিরাপত্তা গঠন ও বাস্তবায়নে তারা সরাসরি সহায়তা করবে। যদিও এ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক মানচিত্র প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ঠিক কোন কোন এলাকা এই নিরাপত্তা বলয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে, তা স্পষ্ট নয়।

কূটনৈতিক সূত্রের মতে, নতুন সমঝোতার পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে লেবাননে ধারাবাহিক হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে। সে নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন ট্রাম্প। একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দাবি, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আচরণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভও প্রকাশ করেন। কারণ, ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমঝোতার পথে লেবানন ইস্যুই ক্রমশ প্রধান বাধা হয়ে উঠছিল। আসলে চলমান মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো লেবাননে ইজরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ হওয়া। তেহরান বারবার স্পষ্ট করেছে, লেবাননে হামলা চলতে থাকলে কোনো বৃহত্তর আঞ্চলিক সমঝোতা সম্ভব নয়। সে কারণেই ওয়াশিংটন লেবানন ও ইজরায়েলের মধ্যে অচলাবস্থা কাটাতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়।

দক্ষিণ লেবাননে বহু বছর ধরেই সক্রিয় ইরান-সমর্থিত শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহ। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং সশস্ত্র বাহিনী— এই তিন ভূমিকাতেই তারা লেবাননের অন্যতম শক্তিশালী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ইজরায়েল, আমেরিকা, ব্রিটেন-সহ একাধিক দেশ হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত মার্চ মাস থেকে সংঘর্ষ নতুন মাত্রা পায়, যখন ইজরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ সীমান্তে রকেট হামলা শুরু করে। তার পর থেকেই দক্ষিণ লেবাননে ধারাবাহিক বিমান হামলা এবং স্থল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে তেল আভিভের বাহিনী।

তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো অগ্নিগর্ভ। বুধবারই উত্তর ইজরায়েলের দিকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে। ইজরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা সীমান্ত অতিক্রম করে আসা একটি ‘শত্রুভাবাপন্ন উড়ন্ত বস্তু’ এবং দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। পরে হিজবুল্লাহ দাবি করে, ইজ়রায়েলের ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ জবাব হিসেবেই তারা এই হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলি বিমান হামলাও অব্যাহত রয়েছে।  লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, বুধবার বিভিন্ন হামলায় অন্তত ৯ থেকে ১০ জন নিহত হয়েছেন। টাইর শহরের কাছে আল-হাউশ এলাকায় ৪ জন সিরীয় এবং ২ জন ফিলিস্তিনি নাগরিকের মৃত্যুর খবর মিলেছে। চেহুর এলাকায় একটি অ্যাম্বুল্যান্সে হামলায় ২ প্যারামেডিক নিহত হয়েছেন বলেও দাবি বেইরুটের। লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, পৃথক হামলায় তাদের এক সেনা নিহত হয়েছেন, দুই সেনা আহত হয়েছেন। সেনাবাহিনীর অভিযোগ, ইজরায়েলি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে সামরিক যান, ঘাঁটি ও সেনা সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করছে।

তবে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে হিজবুল্লাহর অবস্থান ঘিরে। কারণ, ওয়াশিংটনের আলোচনায় সংগঠনটির কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল না। ফলে আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। হিজবুল্লাহর একাধিক নেতা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, আলোচনার ফলাফল তাঁরা মানতে বাধ্য নন। বুধবারের বৈঠক নিয়ে সংগঠনটির তরফে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াও জানানো হয়নি। ইজরায়েল অবশ্য শুরু থেকেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে— হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা ও দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়াই স্থায়ী শান্তির একমাত্র পথ। তেল আভিভের মতে, সংগঠনটির সামরিক অবকাঠামো অক্ষত থাকলে সীমান্তে স্থিতিশীলতা ফিরবে না।

এদিকে ইরানও সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, বেইরুটের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি অভিযান অব্যাহত থাকলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী আবারও সংঘাতে অংশ নিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, লেবানন, গাজা এবং বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ার সংকটকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সংঘর্ষে এখনো পর্যন্ত অন্তত ৩,৫০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জ জানিয়েছে, ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অন্যদিকে, ইজরায়েলের দাবি, সীমান্ত সংঘর্ষে তাদের অন্তত ২৬ জন সেনা, বেশ কয়েক জন সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন। এখন, সব পক্ষের নজর ২২ জুনের দিকে। ওইদিন ফের আলোচনায় বসার কথা রয়েছে ইজরায়েল ও লেবাননের প্রতিনিধিদের। লক্ষ্য, সর্বাত্মক ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তির রূপরেখা তৈরি করা। কিন্তু সীমান্তে যখন এখনো রকেট, ড্রোন কিংবা বিমান হামলা থামেনি, তখন কূটনৈতিক সমঝোতা বাস্তবে কতটা সফল হবে, সে প্রশ্নের উত্তর আপাতত ভবিষ্যতের হাতেই।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!