- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ৪, ২০২৬
প্রাইভেট টিউশন পড়ানো যাবে না স্কুল শিক্ষকদের, আইন ভাঙলে কড়া শাস্তির হুঁশিয়ারি বিকাশ ভবনের
সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলে কর্মরত শিক্ষকের প্রাইভেট টিউশন করানো নিয়ে বিতর্ক বহু দিনের। স্কুল শিক্ষকদের প্রাইভেট টিউশনি পড়ানোর ব্যাপারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে আইনে। কিন্তু আইনকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দশকের পর দশ ধরে চলে আসছে এ ব্যাবস্থা। এনাদের কাছে না পড়লে নাম্বার কমে যাবে, এ ভয়ে অভিভাবকরাও স্কুল শিক্ষকদের কাছেই সন্তানদের পাঠান। ফলে, বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, সরকারি মাইনের থেকে টিউশন বা কোচিং সেন্টারে পড়িয়ে বেশি অর্থ উপার্জন করেন অনেক মাস্টারমশাই।
এবার এ বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসল নতুন রাজ্য সরকার। শিক্ষার অধিকার আইন (আরটিই) এবং পূর্ববর্তী সরকারি নির্দেশিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সমস্ত জেলা স্কুল পরিদর্শকদের কাছে ফরমান পাঠাল স্কুল শিক্ষা দফতর। নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, সরকারি, সরকার-পোষিত এবং সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের কোনো শিক্ষক ব্যক্তিগত টিউশন বা গৃহশিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কড়া পদক্ষেপ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকাশ ভবন থেকে জারি হওয়া ওই নির্দেশিকাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শিক্ষা মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। কারণ, অতীতেও একাধিক বার একই ধরনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলেও বাস্তবে তার প্রভাব খুব একটা দেখা যায়নি বলে অভিযোগ। বরং বিভিন্ন জেলার বহু শিক্ষক প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে টিউশন পড়িয়ে চলেছেন বলে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ উঠছে। শিক্ষা দফতর সূত্রের খবর, সম্প্রতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি)-র তরফে রাজ্য সরকারের কাছে একটি নোটিস পাঠানো হয়। সেখানে অভিযোগ করা হয়, শিক্ষার অধিকার আইন এবং আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও একাংশ সরকারি শিক্ষক নিয়মিত প্রাইভেট টিউশন করাচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের উপর চাপ সৃষ্টি করে টিউশনে যোগ দিতে বাধ্য করার অভিযোগও কমিশনের কাছে পৌঁছেছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, টিউশন না পড়লে পরীক্ষায় কম নম্বর দেওয়া, খাতার মূল্যায়নে পক্ষপাতিত্ব করা কিংবা বিভিন্ন ভাবে ছাত্রছাত্রীদের মানসিক চাপে রাখার মতো ঘটনাও ঘটছে। যদিও এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা পৃথক ভাবে যাচাই করা হয়নি। তবে মানবাধিকার কমিশনের হস্তক্ষেপের পরই রাজ্য প্রশাসন বিষয়টিকে নতুন করে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে বলে মনে করছে শিক্ষা মহলের একাংশ। বিকাশ ভবনের জারি করা নির্দেশিকায় আইনি অবস্থানও বিস্তারিত ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষার অধিকার আইন, ২০০৯-এর ২৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী কোনো কর্মরত শিক্ষক ব্যক্তিগত টিউশন বা বাণিজ্যিক শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন না। পাশাপাশি ২০১১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া শিক্ষা দফতরের বিজ্ঞপ্তি এবং ২০১৮ সালের স্কুল শিক্ষা দফতরের নির্দেশিকাতেও একই নিষেধাজ্ঞার কথা স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছিল।
তবে নিয়মের ব্যতিক্রমও রয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি পিছিয়ে পড়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘রেমেডিয়াল কোচিং’, অতিরিক্ত ক্লাস বা বিশেষ শিক্ষাসহায়ক কর্মসূচির আয়োজন করে, তা হলে শিক্ষকরা সেখানে পাঠদান করতে পারবেন। কিন্তু সে পরিষেবা কোনো ভাবেই ব্যক্তিগত আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে হতে পারবে না বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্যের সমস্ত জেলা স্কুল পরিদর্শকদের বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক বেআইনিভাবে প্রাইভেট টিউশন করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা দ্রুত তদন্ত করতে হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নির্দেশিকার প্রতিলিপি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং উচ্চশিক্ষা দফতরের অতিরিক্ত মুখ্য সচিবের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
শিক্ষক সংগঠনগুলির একাংশ অবশ্য প্রশ্ন তুলেছে নির্দেশিকার বাস্তবায়ন নিয়ে। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, ‘এ ধরনের নির্দেশ আগেও বহু বার জারি হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে শুধু বিজ্ঞপ্তি জারি করলেই হবে না, কার্যকর পদক্ষেপও জরুরি।’ অন্যদিকে শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারীর মতে, ‘সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কিন্তু একই সঙ্গে স্কুলশিক্ষার মানোন্নয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক পরিকাঠামো এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্রছাত্রীরা যদি স্কুলেই প্রয়োজনীয় শিক্ষাসহায়তা পায়, তা হলে টিউশনের উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমবে।’
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদও ২০১৮ সালে জারি করা বিধিতে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের প্রাইভেট টিউশন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু শিক্ষা মহলের একাংশের দাবি, বাস্তবে এখনো বহু শিক্ষক বিভিন্ন কোচিং সেন্টার, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগে গৃহশিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে নতুন নির্দেশিকার পর প্রশাসন কতটা কঠোর অবস্থান নেয়, সে দিকেই এখন নজর শিক্ষা মহলের।
❤ Support Us







