- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুন ৮, ২০২৬
পশ্চিম এশিয়ায় ফের যুদ্ধ পরিস্থিতি! ট্রাম্পের ‘অনুরোধ’ অগ্রাহ্য করে তেহরানে ইজরায়েলি হামলা, ইরান ছাড়ার নির্দেশ ভারতীয়দের
পশ্চিম এশিয়ায় ফের বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা! সংঘর্ষবিরতির মাধ্যমে সাময়িক ভাবে থিতিয়ে যাওয়া ইরান-ইজরায়েল সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। লেবাননে ইজরায়েলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তার পাল্টা জবাবে ইরানের মাটিতে ইজরায়েলের আক্রমণ, দু-দেশের নতুন সংঘাত ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে। সোমবার সকালে ইরানের রাজধানী তেহরান-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ইরানে অবস্থানরত সমস্ত ভারতীয় নাগরিককে অবিলম্বে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে আপাতত ইরান সফরের পরিকল্পনাও বাতিল করতে বলা হয়েছে।
সোমবার সকালে তেহরানে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের তরফে জারি করা এক জরুরি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অঞ্চলের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আগের সতর্কবার্তাই বহাল রাখা হচ্ছে। সমস্ত ভারতীয় নাগরিককে আপাতত ইরানে না-আসার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমানে ইরানে অবস্থানকারী ভারতীয়দের অনুরোধ করা হচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব নিরাপদ উপায়ে দেশ ত্যাগ করুন।’ দূতাবাস সূত্রে জানা যাচ্ছে, পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির উপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে। ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও নির্দেশিকা জারি করা হতে পারে।

গত কয়েক মাস ধরেই পশ্চিম এশিয়া উত্তপ্ত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বাহিনীর ইরান আক্রমণের পর উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। পরে সংঘর্ষ কিছুটা স্তিমিত হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এক দিকে চলছিল আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির আলোচনা, অন্যদিকে লেবাননে ইজরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননে ইজরায়েলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের প্রতিবাদেই রবিবার রাতে প্রত্যাঘাত করে তেহরান। ইরানের তরফে ইজরায়েলের দিকে অন্তত ১০ থেকে ১১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই মাঝ আকাশে ধ্বংস করে দিয়েছে। তবু হামলার জেরে উত্তর ইজরায়েল-সহ একাধিক এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে। সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এপ্রিল মাসে সংঘর্ষবিরতির পর এই প্রথম সরাসরি ইজ়রায়েলকে লক্ষ্য করে হামলা চালাল ইরান। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গোটা অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের হামলার পর পরিস্থিতি যাতে আরও জটিল না হয়, তার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ শুরু করে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানান, তিনি ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ফোন করে ইরানের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কোনো প্রতিশোধমূলক হামলা না চালানোর অনুরোধ করবেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিয়সকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ইরানের হামলার কথা শুনেছি। কিন্তু এখন আমাদের প্রয়োজন পরিস্থিতি শান্ত করা। আমরা আর কোনো হামলা চাই না।’ পরে জানা যায়, নিউ জার্সিতে নিজের গল্ফ ক্লাব থেকে প্রায় আধ ঘণ্টা ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। যদিও সে ফোনালাপ নিয়ে হোয়াইট হাউস বা ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দফতর আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।
এর আগে, এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ‘ওঁর (নেতানিয়াহুর) কোনো উপায় নেই। আমি সব সিদ্ধান্ত নিই। উনি নেবেন না।’ তাঁর দাবি, ইরানকে ঘিরে আমেরিকার যে নীতি, তারই অনুসরণ করতে হবে ইজরায়েলকে। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে একটি খুব ভাল চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছি আমরা। এখন যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে সে আলোচনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’ তবে বাস্তবে ট্রাম্পের আহ্বান বিশেষ কার্যকর হয়নি বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। সোমবার সকালেই ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ঘোষণা করে, পশ্চিম ও মধ্য ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে। এর কিছু পরেই ইরানের সংবাদমাধ্যম ‘মেহের নিউজ’ জানায়, রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন অংশে তীব্র বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গিয়েছে।
শুধু তেহরান নয়, ইসফাহান, তাবরিজ, তেহরানের পশ্চিমে অবস্থিত কারাজ শহরেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় হামলার খবর সামনে আসে। যদিও হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে এ পর্যন্ত স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে, ইজরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, তারা ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুকেই নিশানা করেছে। অন্যদিকে, ইরান আগাম সতর্কতা হিসেবে দেশের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করে রেখেছে বলে জানা যাচ্ছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে ইরানের আকাশসীমার বড়ো অংশ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আগত একাধিক উড়ান স্থগিত রাখা হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। ফলে বিদেশি নাগরিকদের নিরাপদে দেশত্যাগ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় দূতাবাসের নির্দেশিকাকে তাই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
এ দিকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা সমঝোতা আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ট্রাম্প অবশ্য আশাবাদী। তাঁর দাবি, ‘এই সংঘাত চুক্তিকে প্রভাবিত করবে না। কী ভাবে পরিস্থিতির সমাধান হয়, তা দেখা যাক। ইজরায়েলে ইরানের হামলা খুব বড়ো আকারের ছিল না। তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতিও হয়নি। বহু বছর ধরেই পশ্চিম এশিয়ায় এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ‘খুব ভাল চুক্তি’ হওয়ার সম্ভাবনা এখন উজ্জ্বল। যদিও, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এক দিকে ইরান ও ইজরায়েলের সরাসরি সামরিক সংঘাত, অন্য দিকে লেবানন, সিরিয়া এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্যে তার সম্ভাব্য অভিঘাত— সব মিলিয়ে অঞ্চলটি আবারও এক বৃহত্তর যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ফলে আপাতত প্রশ্ন একটাই, আমেরিকার কূটনীতি কি যুদ্ধের আগুন নেভাতে পারবে, না কি নতুন সংঘাত পশ্চিম এশিয়ার শান্তিকে আরও বহু দূরে ঠেলে দেবে?
❤ Support Us








