Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুন ১১, ২০২৬

ফের জ্বলছে পশ্চিম এশিয়া: ইরানে মার্কিন হামলা, হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা তেহরানের। চাপে বিশ্ব অর্থনীতি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ফের জ্বলছে পশ্চিম এশিয়া: ইরানে মার্কিন হামলা, হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা তেহরানের। চাপে বিশ্ব অর্থনীতি

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহ আরও ঘনীভূত হলো। আলোচনার পথ ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসার মধ্যেই ফের ইরানের উপর ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই সতর্ক করেছিলেনআলোচনায় দেরি হলে তার মূল্য দিতে হবে তেহরানকে। হুঁশিয়ারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের একাধিক কৌশলগত এলাকায় নতুন করে হামলা চালায় আমেরিকা। পাল্টা কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে তেহরান। হরমুজ প্রণালীকে সব ধরনের নৌযানের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছেওই জলপথ ব্যবহার করার চেষ্টা করলে যে কোনো জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হবে।

 মাস ধরে চলতে থাকা সংঘাতের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে অনেকেই আশার আলো দেখছিলেন। ট্রাম্প নিজেও কয়েক দিন আগে দাবি করেছিলেনযুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে একটি সম্ভাব্য চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু সে আশাবাদ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বুধবার সকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেনইরান ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ক্ষেপণ করছে আলোচনাকে ব্যবহার করছে কৌশলগত সুবিধা অর্জনের জন্য। তাঁর কথায়আমেরিকাকে বোকা বানানোর চেষ্টা’ করছে তেহরান। এর পরেই বুধবার রাত থেকে শুরু হয় নতুন মার্কিন অভিযান। ইরানের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গিয়েছেদক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাসসিরিক এবং মিনাব-সহ একাধিক এলাকায় প্রবল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। পরে কেশমকারগান  সিরিক অঞ্চলেও হামলার খবর প্রকাশ্যে আসে। অঞ্চলগুলির অধিকাংশই হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত, সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছেপ্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে  আত্মরক্ষামূলক’ অভিযান চালানো হয়েছে। মার্কিন বাহিনীর দাবিসাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ধারাবাহিক আগ্রাসন এবং মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলার জবাব হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থানজরদারি কেন্দ্রযোগাযোগ অবকাঠামো  রাডার স্টেশনগুলিকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। শুধু স্থলভাগে হামলাই নয়মার্কিন সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে ইরান থেকে তেল পরিবহণকারী ট্যাঙ্কারেও গুলি চালানো হয়েছে। আমেরিকার অভিযোগজাহাজটি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানি তেল পরিবহণ করছিল।

অন্যদিকেহামলার পরই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় তেহরান। বৃহস্পতিবার সকালে আইআরজিসি ঘোষণা করেবিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্যিক রুট হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজতেলবাহী ট্যাঙ্কার-সহ সব ধরনের নৌযানের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইরানের সেনা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যকোনো জাহাজ যদি এই জলপথ ব্যবহার করার চেষ্টা করেতা হলে সেটিকে সরাসরি সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির খবর সামনে আসে। যদিও সে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনিবে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চরমে, তা স্পষ্ট।

যদিও, হরমুজ নিয়ে ইরানের দাবি পুরোপুরি খারিজ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্যহরমুজ প্রণালীর উপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতেই রয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত আছে।

সেন্টকম জানিয়েছেবাণিজ্যিক জাহাজগুলি নিয়মিত ভাবে ওই জলপথ ব্যবহার করছে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়নি। এ প্রসঙ্গে ট্রাম্প আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্যমার্কিন সেনাবাহিনীর গোপন অভিযানের ফলে ইরানের চাপ সত্ত্বেও ১০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল নিরাপদে বিশ্ববাজারে পৌঁছেছে। শুধু তা-ই নয়২০০-রও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। যদিও এ পরিসংখ্যানের স্বাধীন কোনো নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়িয়েছে ট্রাম্পের আরেকটি দাবি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেনমার্কিন হামলা চলাকালীন ইরানের নেতারা সরাসরি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে ফোন করে হামলা বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ইরানের বিপ্লবী গার্ড  দাবি সঙ্গে সঙ্গেই উড়িয়ে দিয়েছে। তেহরানের বক্তব্যএমন কোনো যোগাযোগ বা অনুরোধের ঘটনা ঘটেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেছেনসাম্প্রতিক হামলায় ৪৯টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে কিছু লক্ষ্যবস্তু তেহরান থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে ছিল। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেনইরান যদি আমেরিকার প্রস্তাবিত শর্তে রাজি না হয়তা হলে আগামী দিনগুলিতে আরও ব্যাপক সামরিক অভিযানের মুখে পড়তে হতে পারে।

এ দিকে যুদ্ধের অভিঘাত ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায়। বাহরাইনকুয়েত এবং জর্ডনে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। কুয়েত সাময়িক ভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। বাহরাইন ও জর্ডনও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র  ড্রোন হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে। বিশ্ব অর্থনীতির উপরেও তার প্রভাব স্পষ্ট। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে ওই জলপথ ঘিরে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কাপরিস্থিতি আরও খারাপ হলে জ্বালানি বাজারে নতুন সঙ্কট তৈরি হতে পারে।

চলমান পশ্চিম এশিয়া সংকটের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিয়েছে ভারত। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হরিশ পার্বতনেনি বলেছেনএ অঞ্চলে হামলার ফলে বহু ভারতীয় নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। ৩ জন নাবিকের মৃত্যুর খবর এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি সমস্ত পক্ষকে সংযম প্রদর্শনউত্তেজনা এড়ানো ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’ তিনি জোর দিয়ে বলেছে, ‘ভারত বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কঠোর বিরোধিতা করে। বহু ভারতীয় নাবিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’

তবে, যুদ্ধের আবহে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলে ইঙ্গিত মিলছে। ট্রাম্প দাবি করেছেনইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির খসড়া প্রায় প্রস্তুত। কিন্তু এখনো পর্যন্ত সে চুক্তিতে সই করতে রাজি হয়নি তেহরান। ফলে যুদ্ধ নাকি সমঝোতা— পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে এগোবে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আন্তর্জাতিক মহল। বিশ্বনেতাদের নজর এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণএ সংঘাতের পরিণতি শুধু পশ্চিম এশিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকবে নাতার অভিঘাত পড়তে পারে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিজ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপর।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!