- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ১৫, ২০২৬
সিন্ধু সভ্যতার ‘নৃত্যরত নারী’র শরীরে ছায়ার আচ্ছাদন ! এনসিইআরটি-র নতুন পাঠ্যবই ঘিরে বিতর্ক
হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতার কথা উঠলেই ইতিহাসপ্রেমীদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি পরিচিত অবয়ব— কোমরে হাত, সামান্য উঁচু চিবুক আর আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রোঞ্জের ‘নৃত্যরত নারী’। সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পনিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত এই মূর্তিই এ বার বিতর্কের কেন্দ্রে। অভিযোগ, এনসিইআরটি-র নতুন নবম শ্রেণির চারুকলা পাঠ্যবই ‘মধুরিমা’-য় ব্যবহৃত ‘ড্যান্সিং গার্ল’ বা ‘নৃতরত নারী’-র ছবিতে মূল ভাস্কর্যের রূপ বদলে দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যবইয়ের ‘হিস্ট্রি অফ আর্টস’ অধ্যায়ে ব্যবহৃত ছবিতে মূর্তিটির অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে গাঢ় ছায়া বা আচ্ছাদনের ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে মূল ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যে দৃশ্যমান শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলি আর স্পষ্টভাবে বোঝা না যায়। এই পরিবর্তন ঘিরেই প্রশ্ন উঠছে, ভারতীয় ইতিহাস ও শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনকে কি ‘বয়সোপযোগী’ করে তোলার নামে বদলে দেওয়া হচ্ছে ?
শিক্ষামহলের একাংশের প্রশ্ন, ইতিহাসের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্ননিদর্শনকে ‘বিকৃত’ করে, মূল রূপে হস্তক্ষেপ করা কতটা গ্রহণযোগ্য? কারণ, এর আগে এনসিইআরটি-র ষষ্ঠ শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ে একই মূর্তির যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা মূল নিদর্শনের অনেক বেশি কাছাকাছি ছিল। উল্লেখযোগ্য ভাবে, প্রায় ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকে ব্যবহৃত এই প্রত্ননিদর্শনের ছবিতে এমন পরিবর্তনের নজির আগে দেখা যায়নি বলেই দাবি করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভারতীয় শিল্প-ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচিত নিদর্শনের উপস্থাপনায় এই পরিবর্তনের নেপথ্যে কী যুক্তি রয়েছে?
প্রবল বিতর্কের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এনসিইআরটি-র নতুন ষষ্ঠ শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যবই প্রণয়ন কমিটির প্রধান মিশেল ড্যানিনো। সংবাদ মাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, বই তৈরির সময় তাঁকে জানানো হয়েছিল যে ‘ড্যান্সিং গার্ল’ মূর্তিটি নাকি কমবয়সি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘বয়সোপযোগী’ নয়। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, তাঁর দল এ যুক্তির সঙ্গে একমত ছিলেন না। ড্যানিনোর দাবি, ‘আমরা ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষকদের সঙ্গেও আলোচনা করেছিলাম। তাঁরাও জানিয়েছিলেন, ‘ড্যান্সিং গার্ল’ নিয়ে কখনো কোনো সমস্যা হয়নি।’ নগ্নতাকে অনুপযুক্ত হিসেবে দেখার প্রবণতারও সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধারণা ভিক্টোরীয় যুগের সেকেলে মানসিকতারই প্রতিফলন। তাঁর প্রশ্ন, এক দিকে যখন ভারতীয় শিক্ষাকে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে, তখন অন্য দিকে প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকে এমন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা কতটা যুক্তিযুক্ত?
নবম শ্রেণির বইয়ে ব্যবহৃত পরিবর্তিত ছবির বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ড্যানিনো আরও বলেন, ‘ভারতীয় শিল্পকলার ইতিহাসের এমন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের শিল্প নিদর্শনকে যদি তার মূল রূপে এবং যথাযথ অনুপাতে উপস্থাপন করা না যায়, তা হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।’ এই পরিবর্তনকে ঐতিহাসিক সত্যের বিকৃতি বলেও মনে করছেন তিনি। তাঁর মতে, মধ্যযুগে মাইকেলঅ্যাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ মূর্তিতে গির্জার পক্ষ থেকে ডুমুরপাতা যোগ করে যেমন মূল শিল্পকর্মের চরিত্র বদলে দেওয়া হয়েছিল, এ ঘটনাও অনেকটা তেমনই। ড্যানিনোর আরও বক্তব্য, কোনো প্রত্নবস্তুর ভগ্নাংশ পুনর্গঠনের প্রয়োজন না থাকলে তার ছবিতে পরিবর্তন আনা কার্যত একটি ‘কৃত্রিম’ বা ‘ভুয়ো’ নিদর্শন তৈরি করার সমতুল্য।
ইতিহাসবিদদের মতে, ‘ড্যান্সিং গার্ল’ শুধুমাত্র একটি শিল্পকর্ম নয়, সিন্ধু সভ্যতায় নারীর সামাজিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং ধাতুবিদ্যার উৎকর্ষ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে। প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সালের এই ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য বিশ্লেষণ করেই গবেষকেরা সে সময়ের ধাতু প্রক্রিয়াকরণের উন্নত প্রযুক্তির সন্ধান পেয়েছেন। রাজস্থানের ভিরানা প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া মৃৎপাত্রের খণ্ডেও একই ধরনের কোমরে হাত রাখা ভঙ্গির চিত্র পাওয়া গিয়েছে। গবেষকদের মতে, এরকম ভঙ্গির নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বা শিল্পমূল্য ছিল। বর্তমানে ‘ড্যান্সিং গার্ল’ মূর্তিটি নয়াদিল্লির জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এনসিইআরটি-র নবম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে মূর্তিটিকে মোহেনজোদাড়ো থেকে প্রাপ্ত একটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, এটি ‘লস্ট-ওয়াক্স’ বা মোম-ঢালাই পদ্ধতিতে নির্মিত, যে প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড এবং ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যায়।
তবে, ছবিটির পরিবর্তিত উপস্থাপনা নিয়ে এখনো পর্যন্ত স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি এনসিইআরটি। সংস্থার অধিকর্তা দীনেশ প্রসাদ সাকলানি জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এর পিছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে হরপ্পা সভ্যতার খননকার্যে পাওয়া অন্যান্য নিদর্শনের সঙ্গে ‘ড্যান্সিং গার্ল’-এর ছবিও রয়েছে। এই বিষয়ে পাঠ্যবই উন্নয়ন দলের সদস্যেরাই বিশদে বলতে পারবেন।’ একই প্রতিষ্ঠানের দুই পৃথক পাঠ্যবইয়ে একই প্রত্ননিদর্শনের ভিন্ন উপস্থাপনা ঘিরে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, ইতিহাস ও শিল্পকলার পাঠে ‘বয়সোপযোগিতা’র সংজ্ঞা কী? আর সে সংজ্ঞার আড়ালে কি ধীরে ধীরে বদলে দেওয়া হচ্ছে প্রাচীন ভারতের শিল্পঐতিহ্যের মূল রূপ?
❤ Support Us







