- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুন ২১, ২০২৬
বলাগড় বন্দর : জমি নীতি ও পুনর্বাসন, ইতিহাসের শিক্ষা
• পর্ব ৩ •
পুনর্বাসন প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা যায় যে, ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভীষণ কঠিন সত্য, কারণ যে কোনো বৃহৎ পরিকাঠামো, শিল্প বা বন্দর প্রকল্পের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অনিবার্য প্রয়োজন জমি। জমি অধিগ্রহণ ও তার সুষম ও মানবিক পুনর্বাসন নীতিই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেয়, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবে রূপ পাবে, না কি তা কেবলই ফাইলবন্দি হয়ে সরকারি দফতরের ধুলো জমা আলমারিতে ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে।
৯০ দশকে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীনই বলাগড়ের চর এলাকাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সমস্ত জমি অধিগ্রহণ করা আছে, সুতরাং এ বন্দর গড়ে তুলতে এখানে জমি পেতে খুব একটা বেশি সমস্যা হবে না বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। যদিও বর্তমানে অধিগৃহীত ফাঁকা জমিতে পুরনো মালিকেরা চাষ করছেন, তাঁরা হয়তো পুনর্বাসনের জন্য কিছু আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারেন
চতুর্থ পর্বে তাই আমার আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো বলাগড় বন্দর নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা এবং বর্তমানে তা কি অবস্থায় আছে। অতি সম্প্রতি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পর, বিজেপি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। ফলে, রাজ্যের শিল্পায়নের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহন অনেক ক্ষেত্রেই সহজ হবে বলে অনেকে মনে করছেন। তবে বলাগরের বন্দরের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে সরকারি জমী অধিগ্রহণ নীতি এবং অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, একটি সঠিক পুনর্বাসনের রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে ।
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বলাগড় বন্দর তৈরি করতে জমির অধিগ্রহণে সাধারণত কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ৯০ দশকে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীনই বলাগড়ের চর এলাকাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সমস্ত জমি অধিগ্রহণ করা আছে, সুতরাং এ বন্দর গড়ে তুলতে এখানে জমি পেতে খুব একটা বেশি সমস্যা হবে না বলেই পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। যদিও বর্তমানে অধিগৃহীত ফাঁকা জমিতে পুরনো মালিকেরা চাষ করছেন, তাঁরা হয়তো পুনর্বাসনের জন্য কিছু আর্থিক সুবিধা দাবি করতে পারেন। জানিয়ে রাখা ভালো, আসাম রোড থেকে রাস্তা এমনকি রেল লাইনের জন্য রাস্তা প্রভৃতি কাজের জন্য যে জমি দরকার সে সবও অধিগ্রহণ করা আছে।
কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা, যাদের নিজস্ব কেন্দ্রীয় আইন রয়েছে। কিন্তু বাস্তব হলো, রাজ্যের পূর্ণ সহযোগিতা ও স্থানীয় মানুষের সম্মতি ছাড়া ভারতের কোনো প্রান্তেই জমি অধিগ্রহণ করা বা প্রকল্প চালানো কার্যত অসম্ভব। তাই বলাগড় প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেন্দ্র ও রাজ্য, উভয় সরকারকে এক টেবিলে বসে এমন একটি ‘ল্যান্ড পুলিং’ বা ক্রয়ের মডেল তৈরি করতে হবে, যা স্থানীয় মানুষের মনে কোনো ক্ষোভ বা উচ্ছেদের ভয় তৈরি করবে না
অপরদিকে, আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি আধুনিক অভ্যন্তরীণ জলপথ টার্মিনাল বা নদী বন্দর গড়ে তুলতে গেলে কেবল নদীর ঘাটে দুটো জেটি বা ক্রেন বানালেই চলবে না। তার সাথে সমান্তরালভাবে প্রয়োজন জাহাজ থেকে নামানো পণ্য খালাস করে রাখার বিশাল চত্বর বা স্ট্যাকিং ইয়ার্ড, লজিস্টিকস পার্ক, প্রশাসনিক ভবন, শুল্ক দপ্তর এবং বন্দরকে মূল সড়ক বা রেললাইনের সাথে যুক্ত করার জন্য চওড়া কানেক্টিভিটি করিডোর বা রাস্তা। প্রাথমিক সমীক্ষা ও নকশা অনুযায়ী, বলাগড়ের প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমির বড়ো অংশ নদীগর্ভে জেগে ওঠা চর বা সরকারি খাস জমি। কিন্তু সংযোগকারী রাস্তা এবং লজিস্টিকস হাবের জন্য কিছু পরিমাণ ব্যক্তি-মালিকানাধীন বহুফসলি কৃষিজমিরও প্রয়োজন হওয়া স্বাভাবিক। যা আগেই নেওয়া আছে। এখানে বড়ো জটিলতা হলো মালিকানার চরিত্রে। নদীর চরে যে সমস্ত মানুষ বছরের পর বছর ধরে ঘরবাড়ি বেঁধে আছেন বা চাষবাস করছেন, তাদের অনেকেরই হয়তো বৈধ বা পাকাপোক্ত কাগজের দলিল নেই। ফলে খাতায়-কলমে সেটা সরকারি খাস জমি হলেও, বাস্তবে সেখানে একটি সচল জনবসতি ও গ্রামীণ জীবিকার অস্তিত্ব রয়েছে, যাকে অস্বীকার করা যায় না।
সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ল্যান্ড মুভমেন্ট বা জমি আন্দোলনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে জমির প্রশ্নটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। যে কোনো সরকারের জন্য অ্যাসিড টেস্ট। অন্যদিকে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা, যাদের নিজস্ব কেন্দ্রীয় আইন রয়েছে। কিন্তু বাস্তব হলো, রাজ্যের পূর্ণ সহযোগিতা ও স্থানীয় মানুষের সম্মতি ছাড়া ভারতের কোনো প্রান্তেই জমি অধিগ্রহণ করা বা প্রকল্প চালানো কার্যত অসম্ভব। তাই বলাগড় প্রকল্পকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেন্দ্র ও রাজ্য, উভয় সরকারকে এক টেবিলে বসে এমন একটি ‘ল্যান্ড পুলিং’ বা ক্রয়ের মডেল তৈরি করতে হবে, যা স্থানীয় মানুষের মনে কোনো ক্ষোভ বা উচ্ছেদের ভয় তৈরি করবে না। এই মুহূর্তে রাজ্যে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার থাকার ফলে অনেকেই মনে করছে জমি কেন্দ্রিক জটিলতা এখানে হবে না।
যাদের সম্পূর্ণ জমি চলে যাচ্ছে, তাদের কেবল টাকা না দিয়ে যদি অন্য কোনো সরকারি স্থানে বিকল্প জমি বা জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া যায়, তবে জনপ্রতিরোধ অনেকটাই কমে। ক্ষতিপূরণের একটি অংশ এককালীন না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ‘অ্যানুইটি’ বা ‘রয়্যালটি’ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে প্রতি মাসে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলে তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলাগড়ের ক্ষেত্রে একটি আধুনিক, একইসঙ্গে মানবিক পুনর্বাসন মডেল ভাবা যেতে পারে, যা কেবল এককালীন কিছু আর্থিক ক্ষতিপূরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যাদের সম্পূর্ণ জমি চলে যাচ্ছে, তাদের কেবল টাকা না দিয়ে যদি অন্য কোনো সরকারি স্থানে বিকল্প জমি বা জীবিকার নিশ্চয়তা দেওয়া যায়, তবে জনপ্রতিরোধ অনেকটাই কমে। ক্ষতিপূরণের একটি অংশ এককালীন না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ‘অ্যানুইটি’ বা ‘রয়্যালটি’ হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে প্রতি মাসে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলে তাদের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।
বলাগড় বন্দর প্রকল্প কোনো নতুন জমি আন্দোলনের পুনরাবৃত্তি ঘটাবে, না কি এটি ভারতের বুকে সহমত ও সুষ্ঠু পুনর্বাসনের একটি উজ্জ্বল মডেল হয়ে উঠবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে নীতি নির্ধারক দের রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর দূরদর্শিতার ওপর। জোর করে জমি কেড়ে নেওয়া যেমন অপরাধ, তেমনই পুনর্বাসনের সঠিক প্যাকেজ না দিয়ে স্রেফ রাজনীতির কারণে প্রকল্প আটকে রাখাও এক ধরনের প্রগতি-বিরোধী মানসিকতা। জমির আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো বা স্থানীয় যুবকেরা বন্দরের সংযোগকারী বাণিজ্যিক এলাকায় স্থায়ী দোকানঘর তৈরির জন্য বা খাবার হোটেল খোলার জন্য অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জায়গা পায়। পৈতৃক জমি বা চরের চাষ হারানোর একমাত্র স্থায়ী উপশম হতে পারে বন্দরের প্রবেশদ্বারে নিজের একটা স্বাধীন উপার্জনের স্থায়ী দোকান বা গুমটি ঘর, যা তাদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন করে বেঁচে থাকার রসদ জোগাবে।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
বলাগড় বন্দর : পরিবেশগত সংশয় – গঙ্গা, সবুজ দ্বীপ ও জীববৈচিত্র্য
❤ Support Us






