- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুন ২১, ২০২৬
ঐতিহ্যের উৎস সন্ধানে: নূহ-মনু ও আব্রাহাম-ব্রহ্ম
লেখক দর্শনের অধ্যাপক, রাজনৈতিক কর্মী । প্রচলিত ছক ভেঙে, তাঁর কর্ণপাত আর দৃষ্টিপাত ছাড়িয়ে যায় ইতিহাস,বৃহত্তর সমাজবিদ্যা, ভাষা বিজ্ঞান এবং সাহিত্যের ক্রমাগত অন্বেষণের নানাদিকে । তাঁর প্রগাঢ় ভাবনাচিন্তা বিস্মিত করে তোলে আমাদের ।
পর্ব | ১
সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর বয়সের তুলনায় মানবসভ্যতার লিপিবদ্ধ ইতিহাসের আয়ু নিতান্তই ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশ মাত্র । মানুষের পরিচিত ইতিহাসের পরিসীমা বড়জোর পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছর । তার মধ্যে খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ থেকে ৩০০০ অব্দের মধ্যবর্তী কালখণ্ডটি মানব ইতিহাসের এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ, ঐতিহাসিকরা যাকে ‘ইতিহাস ও পুরাণের সন্ধিলগ্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন । এই মাহেন্দ্রক্ষণেই মানুষ প্রাগৈতিহাসিক যুগের লক্ষাধিক বছরের দীর্ঘ মৌখিক স্মৃতি সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে লিপির উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো তার অভিজ্ঞতাকে পাথরের গায়ে কিংবা কাদার ফলকে স্থায়ী রূপ দিতে সক্ষম হয় । সহজ কথায়, যেদিন থেকে মানুষ লিখতে শিখল, ঠিক সেদিন থেকেই জন্ম নিল আমাদের এই ‘পরিচিত ইতিহাস’। এই আদি লিখিত উপাখ্যানগুলোর গর্ভেই প্রোথিত আছে আমাদের সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের শেকড় । উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় — নূহ কিংবা মনুর সময়ের প্রলয়ঙ্করী মহাপ্লাবনের কাহিনি অথবা আব্রাহাম ও ব্রহ্মার মধ্যে ধারণাগত মিল এবং তাঁদের স্ত্রীদের নামের ভাষাগত সাদৃশ্যের কথা । আজ আমরা ধর্মগ্রন্থ বা পুরাণে যা পাঠ করি, তা নিছক অলীক কল্পনা নয় । আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের আলোকে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আখ্যানগুলো কোনো কাল্পনিক রূপকথা নয়; বরং নব্যপ্রস্তর বা ব্রোঞ্জ যুগের সূচনালগ্নে হিমবাহ-পরবর্তী পৃথিবীর এক বাস্তব ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বিপর্যয়ের সম্মিলিত মানবস্মৃতি । খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকে যখন প্রথম নগর সভ্যতার বিকাশ ঘটল এবং লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন হলো, তখন প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই ভয়ংকর বাস্তব অভিজ্ঞতাই রূপকের ছদ্মবেশে আমাদের পরিচিত ইতিহাসের পাতায় প্রথম স্থান করে নিল । এই রূপকগুলোই পরবর্তীকালে মানবসভ্যতার পৌরাণিক ও ধর্মীয় আখ্যানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে ।
মানুষের তৈরি ৫,০০০ বা ৬,০০০ বছরের সংক্ষিপ্ত লিপিবদ্ধ ইতিহাসের বহু আগে, প্রাগৈতিহাসিক কালের লক্ষাধিক বছরের বিস্মৃত অন্ধকার অধ্যায়েই সমগ্র মানবজাতি এক আদি উৎসভূমি থেকে তাদের অভিন্ন যাত্রা শুরু করেছিল । ইতিহাসের বিবর্তনে নদীগুলো আজ ভিন্ন ভিন্ন সাগরে গিয়ে মিশলেও, তাদের উৎস যে একই পর্বতচূড়ায় ছিল — এই তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব আজ তা-ই সগৌরবে প্রমাণ করে
পুরাণ যেখানে শেষ হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান সেখান থেকেই তার নতুন জানালা খুলে দিয়েছে । এই প্রাগৈতিহাসিক কাল কেবল কয়েক হাজার বছরের নয়, এর পরিধি লক্ষাধিক বছরের এক সুবিস্তৃত ও রহস্যময় অধ্যায়ে ব্যাপৃত । চিরাচরিত লিখিত ইতিহাস বা প্রত্নতত্ত্বের আলো যেখানে পৌঁছাতে অক্ষম, আধুনিক বিজ্ঞান সেখানে আজ মশাল জ্বালিয়ে দিয়েছে । ‘পপুলেশন জেনেটিক্স’ (জনসমষ্টির বংশগতিবিদ্যা) বা ডিএনএ বিশ্লেষণ — বিশেষ করে ওয়াই ক্রোমোজোম (Y-chromosome) এবং মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ-র ‘হ্যাপ্লোগ্রুপ স্টাডি’—আদিম মানুষের পরিভ্রমণ ও অভিবাসনের এমন সব অকাট্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আমাদের সামনে হাজির করছে, যা এতদিন কেবল লোকগাথা, ভাষা বা পুরাণের কুয়াশাচ্ছন্ন অনুমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল । ডেভিড রাইখ কিংবা টনি জোসেফের মতো গবেষকদের প্রদর্শিত জিনগত মানচিত্র আজ প্রমাণ করছে যে, ভৌগোলিক সীমানা বা ধর্মীয় আচারের বহু আগেই মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ রক্তের এক অবিভাজ্য সূত্রে একে অপরের সাথে যুক্ত ছিল ।
আধুনিককালের অনেক গবেষক ও পণ্ডিত দাবি করেন যে, ভারতীয় ধর্ম-সংস্কৃতির ধরন ও এর অন্তর্নিহিত দর্শন সেমেটিক ধর্ম-সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বা স্বতন্ত্র । আপাতদৃষ্টিতে এই দাবিটি অমূলক নয়; কারণ স্থান ও কালের অমোঘ প্রভাবে, ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশের অভিঘাতে এবং ইতিহাসের সুদীর্ঘ বিবর্তনের ধারায় এই দুই সংস্কৃতির বাহ্যিক আচার, উপাসনা পদ্ধতি ও সামাজিক কাঠামোতে সময়ের ব্যবধানে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে । কিন্তু এই বাহ্যিক ভিন্নতাই কি শেষ কথা ? ইতিহাসের ধূসর পাতা উল্টে গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আপাত-বিচ্ছিন্ন এই দুটি ধারার আদি উৎস বা মূল চেতনা হয়তো একই বিন্দুতে প্রোথিত । এই গভীর ও অন্তলীন ঐতিহাসিক সত্যের সাদৃশ্য আমরা তখনই খুঁজে পাই, যখন সেমেটিক ঐতিহ্যের দুই চরিত্র ‘নূহ’ ও ‘আব্রাহাম’-এর সাথে ভারতীয় ঐতিহ্যের ‘মনু’ ও ‘ব্রহ্মা’-র ধারণাগত, গাঠনিক ও সমান্তরাল অবস্থান নিয়ে নিবিড় অনুসন্ধান করি ।
মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে ‘তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব’ এবং নৃবিজ্ঞানের ‘ডিফিউশনিজম’ বা সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তিবাদ তত্ত্বের ওপর । নৃ-তাত্ত্বিক মতবাদ অনুযায়ী, কোনো মৌলিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা আধ্যাত্মিক ধারণা একটি নির্দিষ্ট আদি কেন্দ্রে জন্ম নিয়ে কালক্রমে মানব অভিবাসন, পরিভ্রমণ এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে
এই অন্বেষণ কেবল দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির তাত্ত্বিক তুলনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা আধুনিক বিজ্ঞান — বিশেষ করে পপুলেশন জেনেটিক্স ও প্রত্নতত্ত্ব — এবং প্রাচীন ইতিহাসের এক অনবদ্য ও রোমাঞ্চকর মেলবন্ধন হয়ে ওঠে । এই সংশ্লেষ আমাদের সামনে এক পরম সত্যকে উন্মোচিত করে: মানুষের তৈরি ৫,০০০ বা ৬,০০০ বছরের সংক্ষিপ্ত লিপিবদ্ধ ইতিহাসের বহু আগে, প্রাগৈতিহাসিক কালের লক্ষাধিক বছরের বিস্মৃত অন্ধকার অধ্যায়েই সমগ্র মানবজাতি এক আদি উৎসভূমি থেকে তাদের অভিন্ন যাত্রা শুরু করেছিল । ইতিহাসের বিবর্তনে নদীগুলো আজ ভিন্ন ভিন্ন সাগরে গিয়ে মিশলেও, তাদের উৎস যে একই পর্বতচূড়ায় ছিল — এই তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব আজ তা-ই সগৌরবে প্রমাণ করে । মানব সভ্যতার উন্মেষলগ্নে, ইতিহাস ও পুরাণের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা এমন দুটি প্রাগৈতিহাসিক অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যুগল-চরিত্র নিয়ে আলোচনা করব, যা ধারণাগত দিক থেকে দুটি ভিন্ন ও দূরবর্তী সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে । এই চরিত্রগুলো হলো — সেমেটিক ঐতিহ্যের নূহ ও আব্রাহাম এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের মনু ও ব্রহ্মা। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্য (যেমন: মেসোপটেমিয়া, লেভান্ত ও পারস্য) এবং প্রাচীন ভারতের (সিন্ধু সভ্যতা ও বৈদিক সংস্কৃতি) মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও আধ্যাত্মিক আদান-প্রদানের বিষয়টি বহু বছর ধরে নৃবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ এবং তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ববিদদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে । এই সংযোগের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে ‘তুলনামূলক পুরাণতত্ত্ব’ এবং নৃবিজ্ঞানের ‘ডিফিউশনিজম’ বা সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তিবাদ তত্ত্বের ওপর । নৃ-তাত্ত্বিক মতবাদ অনুযায়ী, কোনো মৌলিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা আধ্যাত্মিক ধারণা একটি নির্দিষ্ট আদি কেন্দ্রে জন্ম নিয়ে কালক্রমে মানব অভিবাসন, পরিভ্রমণ এবং বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে । খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের দিকে, বিশেষ করে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দের সমকালীন বিশ্বে মেসোপটেমিয়া এবং সিন্ধু সভ্যতার (যা আক্কাদীয় লিপিতে ‘মেলুহা’ নামে পরিচিত ছিল) মধ্যকার গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রাচীন ডিএনএ বিশ্লেষণভিত্তিক জিনগত সংযোগ থেকে এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত । তারই সমান্তরাল স্রোতে পরিভ্রমণ করেছে মানুষের আদিম মনস্তত্ত্ব, যৌথ অবচেতন স্মৃতি এবং মহাকাব্যিক ধর্মীয় উপাখ্যানসমূহ । এই পটভূমিতেই আদিম মানবজাতির দুই সমান্তরাল বিশ্বাসের নদী কীভাবে একই উৎস থেকে জলপান করে পুষ্ট হয়েছিল, তা অনুসন্ধান করাই এই প্রবন্ধের মূল অন্বেষণ ।
২
মহাপ্রলয়ের বিশ্বজনীন স্মৃতি থেকে নূহ ও মনুর মধ্যকার সংযোগ এখন এক প্রামাণ্য, বৈজ্ঞানিকভাবে কৌতূহলোদ্দীপক এবং নৃতাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠেছে । মহাপ্রলয়ের আখ্যানটি ধারণাগত দিক থেকে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রাচীন সভ্যতার যৌথ স্মৃতিতে প্রোথিত আছে । বৈশ্বিক জলপ্লাবনের গল্পটি এক মহাসত্য ঘটনা হিসেবে বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ও ধর্মগ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে । ভারতীয় প্রাচীন ঐতিহ্য, ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ ও ‘মৎস্য পুরাণ’-এর বর্ণনা অনুসারে, বিবস্বতের পুত্র সত্যব্রত (যিনি বৈবস্বত মনু নামে পরিচিত) একটি ক্ষুদ্র মাছকে পরম যত্নে রক্ষা করেছিলেন । মাছটি ক্রমে বড় হয়ে মনুকে আসন্ন প্রলয়ঙ্করী জলপ্লাবনের বিষয়ে সতর্ক করে এবং একটি বিশাল নৌকা তৈরির নির্দেশ দেয় । প্রলয় শুরু হলে ঈশ্বরের সেই ‘মৎস্য অবতার’ মনুর নৌকাটিকে নিজের বিশাল শিংয়ের সাহায্যে টেনে নিয়ে যায় এবং হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে (‘নৌবন্ধন’ পর্বত) নোঙর করে । এই প্রলয়-পরবর্তী পৃথিবীতে মনুর মাধ্যমেই নতুন করে মানবজাতির সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটে। অন্যদিকে বাইবেল, কুরআন এবং প্রাচীন মেসোপটেমীয় ঐতিহ্যে বর্ণিত উপাখ্যান অনুযায়ী, তৎকালীন মানবজাতির অবাধ্যতায় ঈশ্বর (আল্লাহ) এক মহাপ্লাবনের সিদ্ধান্ত নেন । সেই পাপিষ্ঠ সমাজে একমাত্র ধার্মিক পুরুষ নূহ-কে (আ.) ঈশ্বর একটি বিশাল নৌকা বা কিশতি (Ark) তৈরির নির্দেশ দেন, যাতে সমস্ত প্রাণিকুলের এক জোড়া করে নমুনা এবং তাঁর অনুগামীরা আশ্রয় নেন । প্রলয়ের জল শান্ত হলে এই নৌকা শেষ পর্যন্ত ‘আরারাত’ পর্বতের চূড়ায় গিয়ে থিতু হয়। আদি মেসোপটেমীয় উৎস অনুযায়ী, এই কাহিনির আরও প্রাচীন রূপ পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের সুমেরীয় সভ্যতার কাদা-মাটির ফলকে খোদাই করা ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’ (Epic of Gilgamesh)-এর ‘উতনাপিশতিম’ (Utnapishtim) বা ‘জিউসুদ্রা’র চরিত্রে, যা এই কাহিনির মূল উৎসের গভীরতাকে নির্দেশ করে।
ভারতে ‘মনুস্মৃতি’ যেমন প্রাচীন আইনসংহিতা হিসেবে পরিচিত, সেমেটিক ঐতিহ্যে তেমনি ‘নূহাইদ লজ’ বা নূহের শরীয়ত বিদ্যমান । প্রলয়ের জল শান্ত হলে নূহের নৌকা মাউন্ট আরারাত বা জুদি পর্বতের চূড়ায় ভিড়েছিল; অন্যদিকে, ভারতীয় ঐতিহ্যে মৎস্য অবতারের সহায়তায় মনুর নৌকা হিমালয়ের ‘নৌবন্ধন’ পর্বতে আশ্রয় নেয় । এই পৌরাণিক সামঞ্জস্য কেবল কাকতালীয় নয়; বরং এটি আদিম মানবগোষ্ঠীর অভিন্ন অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন, যা সহস্রাব্দের বিবর্তনে ভিন্ন সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের সামনে এসে পৌঁছেছে
বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত আমেরিকান লোকবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী অ্যালান ডান্ডেস (১৯৩৪–২০০৫) তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ The Flood Myth-এ দেখিয়েছেন যে, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রাচীন সংস্কৃতিতেই মহাপ্লাবনের কাহিনি বিদ্যমান । মেসোপটেমিয়ার ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’ থেকে শুরু করে হিব্রু বাইবেল, পবিত্র কুরআন এবং ভারতের ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ ও ‘মৎস্য পুরাণ’-এ বর্ণিত আখ্যানগুলোর কাঠামোগত মিল বিস্ময়কর। সেমেটিক ঐতিহ্যের নূহ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের মনু — উভয়েই ঈশ্বর-মনোনীত পরম ধার্মিক পুরুষ এবং মানবজাতির আদি পিতা হিসেবে স্বীকৃত। উল্লেখযোগ্য যে, ‘মনু’ থেকেই ‘মানুষ’ বা ‘মানব’ শব্দের উৎপত্তি এবং তিনিই প্রথম নৈতিক আইনপ্রণেতা হিসেবে বিবেচিত হন। মহাপ্লাবনের সতর্কবার্তা পেয়ে নৌকা তৈরির ক্ষেত্রেও এদের কাহিনিতে ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে । নূহ যেমন তাঁর পরিবার, অনুগামী এবং প্রতিটি জীবজন্তুর এক জোড়া নমুনা নৌকায় আশ্রয় দিয়েছিলেন, তেমনি মনু সপ্তর্ষি, তাবৎ উদ্ভিদের বীজ ও প্রাণিকুলকে সঙ্গে নিয়ে প্রলয় থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন । সংস্কৃত ‘মনু’ (যাঁকে কেন্দ্র করেই ‘মানব’ বা ইংরেজি ‘Man’ শব্দের উদ্ভব) এবং হিব্রু ‘নূহ’ (যার অর্থ বিশ্রাম বা প্রশান্তি) — এই শব্দ দুটির মধ্যে ভাষাগত মিল না থাকলেও, দুই ঐতিহ্যে তাঁদের ভূমিকা প্রায় অভিন্ন। উভয়ই প্রলয়-পরবর্তী নতুন পৃথিবীর রূপকার এবং সমাজ পরিচালনার প্রথম নৈতিক আইনের প্রবক্তা । ভারতে ‘মনুস্মৃতি’ যেমন প্রাচীন আইনসংহিতা হিসেবে পরিচিত, সেমেটিক ঐতিহ্যে তেমনি ‘নূহাইদ লজ’ (Noahide Laws) বা নূহের শরীয়ত বিদ্যমান । প্রলয়ের জল শান্ত হলে নূহের নৌকা মাউন্ট আরারাত বা জুদি পর্বতের চূড়ায় ভিড়েছিল; অন্যদিকে, ভারতীয় ঐতিহ্যে মৎস্য অবতারের সহায়তায় মনুর নৌকা হিমালয়ের ‘নৌবন্ধন’ পর্বতে আশ্রয় নেয় । এই পৌরাণিক সামঞ্জস্য কেবল কাকতালীয় নয়; বরং এটি আদিম মানবগোষ্ঠীর অভিন্ন অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন, যা সহস্রাব্দের বিবর্তনে ভিন্ন সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের সামনে এসে পৌঁছেছে ।
আধুনিক ভূতত্ত্ব ও জলবায়ুবিদ্যা অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ বছর আগে পৃথিবীর সর্বশেষ ‘হিমযুগ’ (Ice Age)-এর অবসান ঘটে । বিশাল হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা হঠাৎ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়, যা সম্ভবত কৃষ্ণসাগর কিংবা মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু অববাহিকার মতো নিম্নাঞ্চলে প্রলয়ঙ্করী বন্যার সৃষ্টি করেছিল । লিখিত ইতিহাসের বহু আগের এই বাস্তব প্রাকৃতিক বিপর্যয়টিই কালক্রমে মানুষের যৌথ অবচেতন স্মৃতিতে এবং জোসেফ ক্যাম্পবেলের তত্ত্বানুযায়ী “ধ্বংস ও পুনর্জন্মের” এক বিশ্বজনীন রূপক হিসেবে পুরাণ ও ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে । অ্যালান ডান্ডেসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চরিত্রগুলো কেবল ‘ব্যক্তি’ নয়, বরং ‘সাংস্কৃতিক নায়ক’ হিসেবে কাজ করেন । তাঁরা পুরোনো পৃথিবীর জ্ঞান ও নৈতিকতাকে বহন করে নতুন পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন । ডান্ডেসের এই গবেষণা নূহ, মনু, জিউসুদ্রা কিংবা উতনাপিশতিমের মধ্যকার ভৌগোলিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দেয় । এটি আমাদের বোঝায় যে, মহাপ্লাবনের গল্পটি আদতে পুরো মানবজাতির একটি অবিভাজ্য অভিজ্ঞতার আখ্যান, যা ভাষা ও ধর্মের বাধা পেরিয়ে আমাদের সবাইকে একই শিকড়ে সংযুক্ত করে ।
গিলগামেশ মহাকাব্যের নায়ক ‘উতনাপিশতিম’ বা সুমেরীয় কাহিনির ‘জিউসুদ্রা’ হলেন নূহ ও মনুর প্রাচীনতম প্রতিরূপ । প্রত্নতাত্ত্বিক গ্রেগরি পোসেলের গবেষণায় উঠে এসেছে , খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০- ২০০০ অব্দে সিন্ধু সভ্যতার (মেলুহা) সাথে সুমেরীয় সভ্যতার নিবিড় বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। এই বাণিজ্যিক পথ ধরেই সুমেরীয় ‘মহাপ্লাবনের লোকগাথা’ একদিকে ভারতে এসে ‘মৎস্য পুরাণ’ ও ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’-এর মনু কাহিনির রূপ নেয়, অন্যদিকে পশ্চিমে গিয়ে হিব্রু বাইবেলের নূহ-এর আখ্যানে পরিণত হয়
বিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিখ্যাত আমেরিকান পুরাণতাত্ত্বিক জোসেফ ক্যাম্পবেল (১৯০৪–১৯৮৭)-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, ‘জলপ্লাবন’ মানব চেতনার এক সামষ্টিক অবচেতন রূপক । এটি মূলত ‘ধ্বংস ও পুনর্জন্মের’ প্রতীক। ক্ষয়িষ্ণু ও পাপমগ্ন পৃথিবী বিলুপ্ত করে এক নতুন ও পবিত্র পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য নূহ ও মনু — উভয়কেই ঈশ্বর ‘বীজ’ হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন । অ্যালান ডান্ডেসের মতে, বরফ যুগের অবসান এবং মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু অববাহিকায় সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী বন্যা প্রাচীন মানুষের মনে যে গভীর রেখাপাত করেছিল, তা-ই কালক্রমে নূহ ও মনুর মহাকাব্যিক রূপ ধারণ করেছে । ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্রত্নতাত্ত্বিকরা মেসোপটেমিয়ায় ‘গিলগামেশ মহাকাব্য’ এবং ‘আত্রাহাসিস’-এর কিউনিফর্ম বা কাদার ফলক আবিষ্কার করেন, যা মহাপ্লাবনের আদি রূপের সন্ধান দেয় । গিলগামেশ মহাকাব্যের নায়ক ‘উতনাপিশতিম’ বা সুমেরীয় কাহিনির ‘জিউসুদ্রা’ হলেন নূহ ও মনুর প্রাচীনতম প্রতিরূপ । প্রত্নতাত্ত্বিক গ্রেগরি পোসেলের গবেষণায় উঠে এসেছে যে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০- ২০০০ অব্দে সিন্ধু সভ্যতার (মেলুহা) সাথে সুমেরীয় সভ্যতার নিবিড় বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল। ধারণা করা হয়, এই বাণিজ্যিক পথ ধরেই সুমেরীয় ‘মহাপ্লাবনের লোকগাথা’ একদিকে ভারতে এসে ‘মৎস্য পুরাণ’ ও ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’-এর মনু কাহিনির রূপ নেয়, অন্যদিকে পশ্চিমে গিয়ে হিব্রু বাইবেলের নূহ-এর আখ্যানে পরিণত হয় ।
সেমেটিক ঐতিহ্যে নূহ একজন মহামানব, পয়গম্বর এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। পক্ষান্তরে, ভারতীয় ঐতিহ্যে কোনো মহামানবকে দেবত্বে উন্নীত করার এক সুদীর্ঘ পরম্পরা রয়েছে; ‘মনু’ চরিত্রটি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ । ভারতীয় ঐতিহ্যে মনু একই সঙ্গে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও পৌরাণিক সত্তা । ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে ‘মনুস্মৃতি’ পর্যন্ত সর্বত্রই তাঁকে মানবজাতির আদি পিতা, প্রথম রাজা এবং সমাজ পরিচালনার আইনপ্রণেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে । ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করা হয়, প্রাচীন ভারতে সমাজকে সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে একাধিক সমাজসংস্কারক ‘মনু’ উপাধি গ্রহণ করে এই নিয়মগুলো প্রণয়ন করেছিলেন । এই মহামানবের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, তাঁর নামানুসারেই এই ভূখণ্ডের প্রজাতিটির নাম হয়েছে ‘মনুষ্য’ বা ‘মানুষ’। ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হলো —মহামানবকে কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁদের প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ ঈশ্বরের আসনে অধিষ্ঠিত করা (যেমন, বুদ্ধদেব বা চৈতন্যদেব); মনুও সেই সংস্কৃতিরই অংশ । ভারতীয় সংস্কৃতিতে মনু যেমন সৃষ্টির আদি সমাজপতি এবং প্রথম সামাজিক বিধানের প্রবক্তা, সেমেটিক সংস্কৃতিতেও নূহ-এর অবস্থান অনেকটা একই রকম। উভয় চরিত্রের বৈশ্বিক প্রভাব ও ভূমিকা আলোচনার দাবি রাখে ।
বিশ্বচক্রে আমরা সপ্তম মনু বা ‘বৈবস্বত মনু’-র শাসনাধীন। সনাতন ঐতিহ্যে মনুর তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান: প্রথমত, তিনি মানবজাতির আদি পিতা । ‘মনু’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘যিনি চিন্তা করেন’ বা ‘মননশীল সত্তা’ এবং তাঁর নাম থেকেই ‘মানুষ’ শব্দের উৎপত্তি । মহাপ্লাবনের পর বৈবস্বত মনুই নতুন মানববংশের আদি পুরুষ হিসেবে গণ্য হন
সেমেটিক আখ্যানে নূহ-এর অবদান প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়: প্রথমত, মানবজাতির দ্বিতীয় আদি পিতা: মহাপ্লাবনের ফলে পৃথিবীর অবাধ্য ও পাপিষ্ঠ মানবগোষ্ঠী বিলুপ্ত হওয়ার পর কেবল নূহ-এর নৌকার আরোহীরাই টিকে ছিলেন । প্লাবনের পর তাঁর বংশধরদের মাধ্যমেই পৃথিবীতে পুনরায় মানববসতি ও সভ্যতার বিকাশ ঘটে । এজন্য সেমেটিক ঐতিহ্যে আদমের পর নূহ-কে মানবজাতির ‘দ্বিতীয় আদি পিতা’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি ভারতীয় ঐতিহ্যের ‘বৈবস্বত মনু’-কেন্দ্রিক নতুন মানবসৃষ্টির আখ্যানের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। দ্বিতীয়ত, ‘নূহীয় বিধান’ (Noahide Laws): ইহুদি ঐতিহ্য (তালমুদ) অনুসারে, প্লাবনের পর ঈশ্বর নূহ-এর মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির জন্য সাতটি মৌলিক নৈতিক আইন নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন । ‘মনুস্মৃতি’-র সমান্তরালে এই বিধানের মূল ভিত্তি হলো: মূর্তিপূজা বর্জন, ঈশ্বরনিন্দা না করা, হত্যা, ব্যভিচার ও চুরি পরিহার, নিষ্ঠুরতা বর্জন এবং সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা । তৃতীয়ত, পরম ধৈর্য ও অবিচলতার প্রতীক: সেমেটিক আখ্যানে নূহ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঈশ্বরের একনিষ্ঠ প্রতিনিধি । দীর্ঘকাল নিজ জাতিকে একত্ববাদের পথে আহ্বান জানানো সত্ত্বেও জাতি তাঁকে উপহাস ও নির্যাতন করেছে । কিন্তু তাঁর অটল ধৈর্য তাঁকে ‘ঈশ্বরের ওপর নিঃশর্ত বিশ্বাসের’ অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে ।
ভারতীয় জনমানসে ‘মনু’ কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি মহাজাগতিক উপাধি । হিন্দু কালগণনা অনুযায়ী, ব্রহ্মার এক দিনে চৌদ্দজন মনু পর্যায়ক্রমে আবির্ভূত হন এবং প্রত্যেকের শাসনকালকে বলা হয় এক-একটি ‘মন্বন্তর’। বর্তমান বিশ্বচক্রে আমরা সপ্তম মনু বা ‘বৈবস্বত মনু’-র শাসনাধীন। সনাতন ঐতিহ্যে মনুর তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান: প্রথমত, তিনি মানবজাতির আদি পিতা । ‘মনু’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ ‘যিনি চিন্তা করেন’ বা ‘মননশীল সত্তা’ এবং তাঁর নাম থেকেই ‘মানুষ’ শব্দের উৎপত্তি । মহাপ্লাবনের পর বৈবস্বত মনুই নতুন মানববংশের আদি পুরুষ হিসেবে গণ্য হন। দ্বিতীয়ত, তিনি প্রথম রাজা ও সমাজ-নিয়ন্তা । ঋগ্বেদ ও পুরাণ অনুযায়ী, মনু পৃথিবীর প্রথম রাজা । যাযাবর ও বিশৃঙ্খল সমাজকে সুশৃঙ্খল করতে তিনি প্রথম দণ্ডনীতি ও শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন; ‘মনুস্মৃতি’ এই সামাজিক সুশাসনেরই প্রাচীন আকর গ্রন্থ। এবং তৃতীয়ত, তিনি ধর্ম ও যজ্ঞের প্রবক্তা । মনু ছিলেন পরম ঋষি । দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞের বিধান এবং নৈতিক জীবনযাপনের পথপ্রদর্শক হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় ।
সেমেটিক ঐতিহ্যের নূহ এবং ভারতীয় ঐতিহ্যের মনু রক্তমাংসের ব্যক্তি হিসেবে একই সময়ে জীবিত ছিলেন কি না, তা আধুনিক ইতিহাসের লিখিত দলিলে প্রমাণ করা কঠিন । কারণ তাঁদের আখ্যান প্রাগৈতিহাসিক বা প্রাক-লিপির যুগের । তবে নৃবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব এবং ভাষাতত্ত্বের আলোকে তাঁরা যে একই ঐতিহাসিক কালখণ্ড ও বৈশ্বিক ঘটনার সমান্তরাল প্রতিনিধি, তা জোরালোভাবে প্রতীয়মান হয় । গবেষকরা এই অভিন্নতাকে মূলত তিনটি প্রমাণের ভিত্তিতে দাঁড় করিয়েছেন:
মহাপ্লাবন: বৈজ্ঞানিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট – নূহ ও মনুর আখ্যান কেবল ধর্মীয় উপাখ্যান নয়, বরং মানব ইতিহাসের এক সুদূরপ্রসারী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের স্মৃতিবহনকারী দলিল । ১৯৯৭ সালে ভূবিজ্ঞানী উইলিয়াম রায়ান এবং ওয়াল্টার পিটম্যান এক যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রদান করেন । তাঁদের মতে, আজ থেকে প্রায় ১০,০০০ থেকে ১২,০০০ বছর আগে ( খ্রিষ্টপূর্ব ১০,০০০–৮,০০০ অব্দ) পৃথিবীর সর্বশেষ ‘হিমযুগ’ সমাপ্ত হয় । বিশাল হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৪০০ ফুট পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় । এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ফলে কৃষ্ণসাগর, মেসোপটেমিয়া এবং সিন্ধু অববাহিকার মতো নিম্নাঞ্চলে প্রলয়ঙ্করী বন্যার সৃষ্টি হয়েছিল । সম্ভবত এই বৈশ্বিক বিপর্যয়ই নূহ ও মনুর আখ্যানের ঐতিহাসিক ও বাস্তব প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করেছে । গিলগামেশ মহাকাব্য প্রমাণ করে যে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩,০০০ অব্দ নাগাদ মহাপ্লাবনের কাহিনি একটি সুসংহত লিখিত রূপ লাভ করেছিল। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া ও সিন্ধু সভ্যতার (যা সুমেরীয় ফলকে ‘মেলুহা’ হিসেবে উল্লিখিত) মধ্যকার নিবিড় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানই এই লোকগাথা ছড়িয়ে পড়ার প্রধান মাধ্যম ছিল ।
ভাষাতাত্ত্বিক সাদৃশ্য ও ব্যুৎপত্তি– এই দুই চরিত্রের নামের মধ্যকার ভাষাতাত্ত্বিক সাদৃশ্য অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক । ওল্ড টেস্টামেন্ট বা তাওরাতের মূল হিব্রু ভাষায় ‘নূহ’ (Noah/ Noach) শব্দের অর্থ ‘বিশ্রাম’ বা ‘প্রশান্তি’। অন্যদিকে, ভারতীয় সংস্কৃতির আদি ধাতু ‘নৌ’ (Nau) থেকে নৌকা বা জলযানের ধারণাটি উদ্ভূত হয়েছে । অনেক ভাষাবিদের মতে, প্রাক-ইন্দো-ইউরোপীয় এবং সেমেটিক ভাষার আদি সংযোগস্থলে ‘জলযান’ বা ‘জল থেকে রক্ষাকর্তা’র যে অভিন্ন মূল শব্দ (Root Word) বিদ্যমান ছিল, তা থেকেই এই বিবর্তন । এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সেই আদি শব্দমূলটি ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ধারায় পশ্চিমে বিবর্তিত হয়ে ‘নূহ’ (প্রশান্তির প্রতীক) এবং পূর্বে ‘মনু’ (নৌকার অধিপতি বা নৌ-চালনাকারী) শব্দে রূপান্তরিত হয়েছে ।
মহাপ্লাবনের চিত্রায়ন: অভিন্ন উৎসের ইঙ্গিত – ভৌগোলিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও দুই সংস্কৃতির প্রাচীন শিল্পকলা ও উপাখ্যানে মহাপ্লাবনের চিত্রায়ন অভিন্ন উৎসের ইঙ্গিত বহন করে। ভারতীয় ঐতিহ্যের ‘শতপথ ব্রাহ্মণ’ ও ‘মৎস্য পুরাণ’ অনুযায়ী, মৎস্যরূপী বিষ্ণু বৈবস্বত মনুকে বিশাল নৌকা তৈরির নির্দেশ দেন । প্রলয়ের জলরাশিতে সেই নৌকা হিমালয়ের ‘নৌবন্ধন’ শৃঙ্গে স্থিত হয়, যেখানে মনু পৃথিবীর বীজ ও প্রাণিকুল রক্ষা করেন । অন্যদিকে, সেমেটিক ঐতিহ্য (তাওরাত, বাইবেল ও কুরআন) অনুযায়ী, ঈশ্বর নূহ-কে এক বিশাল কাষ্ঠনির্মিত জাহাজ তৈরির নির্দেশ দেন । সেই জাহাজে তিনি প্রতিটি প্রজাতির প্রাণীর জোড়া ও পুণ্যবান মানুষদের আশ্রয় দেন, যা শেষ পর্যন্ত মাউন্ট আরারাত-এর চূড়ায় গিয়ে স্থির হয় । নূহ ও মনুর এই সমান্তরাল আখ্যান মানবসভ্যতার আদিমতম স্মৃতির এক অভিন্ন প্রতিধ্বনি । বৈজ্ঞানিক তথ্য ও ঐতিহাসিক উপাত্তের সমন্বয়ে এই পর্যালোচনা প্রমাণ করে যে, মানবজাতি অতি প্রাচীনকাল থেকেই একই বিশ্বজনীন বিপর্যয়ের অভিজ্ঞতাকে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চশমায় ব্যাখ্যা করে আসছে ।
ক্রমশ…
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us






