- দে । শ
- জুন ২৯, ২০২৬
ভাষানীতিতে সুর নরম সিবিএসই-র। দশম শ্রেণিকে অব্যাহতি, নবমে দুই বিদেশি ভাষা পড়ার অনুমতি
সিবিএসই-র নতুন ‘তিন ভাষা নীতি’ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, নাগাল্যাণ্ড সহ অ-হিন্দিভাষী রাজ্যগুলোতে শিক্ষক, অভিভাবক, পড়ুয়া, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলির তরফে কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্তের প্রবল বিরোধীতা করা হয়েছে।
বহুমুখী চাপের মুখে অবশেষে ভাষা নিয়ে বড়োড়ো শিথিলতার ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ (সিবিএসই)। বর্তমান দশম শ্রেণির পড়ুয়াদের নতুন তিন-ভাষা নীতির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে ইতিমধ্যেই দুটি বিদেশি ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীদের জন্যও এককালীন বিশেষ ছাড় ঘোষণা করেছে বোর্ড। তারা আগের মতোই দুটি বিদেশি ভাষা চালিয়ে যেতে পারবে, তবে তার সঙ্গে একটি ভারতীয় ভাষা অতিরিক্ত হিসেবে পড়তে হবে।
সোমবার প্রকাশিত সংশোধিত নির্দেশিকায় সিবিএসই স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বর্তমানে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত কোনো শিক্ষার্থীকেই নতুন তিন-ভাষা নীতি অনুসরণ করতে হবে না। এই ব্যাচ আগের নিয়মেই দুটি ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করবে এবং তাদের তৃতীয় ভাষা গ্রহণ কিংবা সেই বিষয়ে বোর্ড পরীক্ষা দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। একই সঙ্গে বর্তমানে সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে পড়া শিক্ষার্থীরা যখন দশম শ্রেণিতে উঠবে, তখনো তৃতীয় ভাষার জন্য বোর্ড পরীক্ষা দিতে হবে না।
কেন্দ্রীয় বোর্ডের এ সিদ্ধান্তের ফলে কার্যত স্বস্তি পেল বহু শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। কারণ, মে মাসে সিবিএসই ঘোষণা করেছিল যে নবম শ্রেণি থেকেই তিন-ভাষা নীতি কার্যকর হবে এবং তিনটি ভাষার মধ্যে অন্তত দুটি অবশ্যই ভারতীয় ভাষা হতে হবে। সে নির্দেশিকা প্রকাশের পরই প্রবল বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, জাপানি কিংবা আরবি-সহ বিদেশি ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করা বহু শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবর্ষের মাঝপথে বিষয় পরিবর্তনের আশঙ্কার মুখে পড়তে হয়। অভিভাবকদের অভিযোগ ছিল, পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবর্ষ চলাকালীন হঠাৎ ভাষা পরিবর্তনের নির্দেশ শুধু শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত মানসিক চাপই তৈরি করবে না, তাদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতিকেও ব্যাহত করবে। দেশজোড়া আপত্তির জেরেই গত সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইতিমধ্যেই বিদেশি ভাষা বেছে নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সোমবারের সংশোধিত নির্দেশিকায় সে আশ্বাসই আনুষ্ঠানিক রূপ পেল।
সিবিএসই জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে বর্তমানে নবম শ্রেণিতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এককালীন বিশেষ শিথিলতা হিসেবে দুটি বিদেশি ভাষা পড়া চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। তবে তাদের সঙ্গে একটি ভারতীয় ভাষাকে তৃতীয় ভাষা হিসেবে যুক্ত করতে হবে। অর্থাৎ, আগে থেকে নির্বাচিত বিদেশি ভাষা বাদ দিতে হবে না, আবার জাতীয় শিক্ষা নীতির মূল উদ্দেশ্য অনুযায়ী ভারতীয় ভাষা শিক্ষাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বোর্ডের বক্তব্য, এ ব্যবস্থা শুধুমাত্র বর্তমান শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান। নতুন শিক্ষাবর্ষ থেকে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভাষানীতি কার্যকর করা হবে।
সোমবারের বিবৃতিতে সিবিএসই জানিয়েছে, একাধিক ভারতীয় ভাষায় শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলাই বোর্ডের অন্যতম লক্ষ্য। তবে সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রক্রিয়া যাতে ভারসাম্যপূর্ণ থাকে, ভাষা শিক্ষার কারণে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়েও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বোর্ডের বক্তব্য, মাধ্যমিক স্তরে অর্থাৎ নবম ও দশম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষার প্রবর্তন আসলে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির মধ্যম স্তরে শুরু হওয়া ভাষা শিক্ষারই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ। সে ধারাবাহিকতাকেই জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-এর আলোকে বাস্তবায়িত করা হচ্ছে। সিবিএসই আরও স্পষ্ট করেছে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তিনটি ভাষা অধ্যয়ন করতে হবে। তিনটি ভাষার মধ্যে অন্তত দুটি অবশ্যই ভারতীয় ভাষা হতে হবে। ভারতীয় ভাষার তালিকায় রয়েছে হিন্দি, বাংলা, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, মারাঠি, সংস্কৃত, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, ওড়িয়া, অসমিয়া-সহ বিভিন্ন ভাষা। অন্যদিকে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, আরবি প্রভৃতিকে অ-ভারতীয় বা নন-নেটিভ ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে সিবিএসই একাধিক উদাহরণও প্রকাশ করেছে। বোর্ড জানিয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী যদি ইতিমধ্যেই দুটি ভারতীয় ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করে, যেমন হিন্দি ও তামিল, তাহলে তৃতীয় ভাষা হিসেবে সে আরও একটি ভারতীয় ভাষা অথবা ইংরেজি কিংবা ফরাসির মতো কোনো বিদেশি ভাষা বেছে নিতে পারবে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের কর্মসূত্রে অন্য রাজ্যে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে বোর্ড। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী মধ্যম স্তরে যে ভাষার সংমিশ্রণ নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিল, নবম শ্রেণিতেও সেই একই ভাষা চালিয়ে যেতে পারবে। সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলিকে ভাষা শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শিক্ষাসামগ্রী এবং অন্যান্য অবকাঠামো নিশ্চিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক সংকটের সম্ভাবনা মাথায় রেখে সিবিএসই নমনীয় নিয়োগ ব্যবস্থার কথাও বলেছে। বিদ্যালয়গুলি প্রয়োজনে বিদ্যমান ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদের নিয়োগ করতে পারবে। পাশাপাশি সাহোদয়া ক্লাস্টারের মাধ্যমে আন্তঃবিদ্যালয় শিক্ষক ভাগাভাগি, ভার্চুয়াল ক্লাস অথবা হাইব্রিড শিক্ষণ ব্যবস্থাও চালু করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বোর্ডের দাবি, ভাষানীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক শিক্ষণ-অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। সে কারণে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে ধারণাভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া, আনন্দময় শিক্ষাসামগ্রী তৈরি এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মতো পদক্ষেপও অব্যাহত থাকবে। সিবিএসই আরও জানিয়েছে, জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এ নির্দেশিকা জারি করা হয়েছে। তবে তার ফলে কোনো শিক্ষার্থী যাতে অসুবিধার সম্মুখীন না হয়, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বোর্ডের মতে, ভাষা শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক নয়; বরং আনন্দময়, অর্থবহ এবং কার্যকর ভাষা অধিগমনের পরিবেশ তৈরি করাই প্রকৃত লক্ষ্য। এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়গুলোকে অতিরিক্ত শিক্ষাসামগ্রী, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সহযোগিতা করা হবে বলেও জানিয়েছে সিবিএসই। পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে বহুভাষিক শিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি সুফল এবং ভারতীয় ভাষার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগের গুরুত্ব ইতিবাচকভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছে বোর্ড।
উল্লেখ্য, এপ্রিল মাসে সিবিএসই ঘোষণা করেছিল যে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে নতুন তিন-ভাষা নীতি কার্যকর করা হবে। একই সঙ্গে নবম শ্রেণিতে গণিত ও বিজ্ঞানে দুই-স্তরের মূল্যায়ন ব্যবস্থাও চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই কাঠামো অনুযায়ী গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে ‘স্ট্যান্ডার্ড’ এবং ‘অ্যাডভান্সড’—দুটি স্তর থাকবে। সব শিক্ষার্থী একই ৮০ নম্বরের মূল পরীক্ষায় অংশ নিলেও, উচ্চতর দক্ষতা প্রদর্শনে আগ্রহীরা অতিরিক্ত ‘অ্যাডভান্সড’ প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিতে পারবে। নবম শ্রেণিতে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া ব্যাচই ২০২৮ সালে প্রথম এই নতুন পদ্ধতিতে দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেবে।
❤ Support Us






