Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ২৯, ২০২৬

বিধানসভায় ধ্বনিভোটে পাশ বহুচর্চিত গুন্ডাদমন বিল

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিধানসভায় ধ্বনিভোটে পাশ বহুচর্চিত গুন্ডাদমন বিল

রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা আরও কড়া হাতে নিয়ন্ত্রণে আনতে সোমবার বিধানসভায় ধ্বনিভোটে পাশ হল বহুচর্চিত ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’, যা ইতিমধ্যেই ‘গুন্ডাদমন বিল’ নামে পরিচিত। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিশাল লামা বিধানসভায় বিলটি পেশ করেন। বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ১৭৬, বিপক্ষে ৪১। ভোটদানে বিরত থাকেন ২০ জন বিধায়ক। ‘কালীঘাট তৃণমূল’ শিবিরও ভোটদানে অংশ নেয়নি।
বিলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে রাজ্যে সন্ত্রাস, অরাজকতা এবং হিংসার একাধিক ঘটনার উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই রাজ্যে পরিকল্পিতভাবে অশান্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “দেশের মধ্যে প্রথম সিএএ-বিরোধী মিছিল হয়েছিল বাংলায়। সিঁথির মোড় থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত মিছিল করে বাংলায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তারপর গোটা বাংলা জ্বলেছে। চাঁচলের সামসিতে রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছিল। রেলে কি শুধু হিন্দুরা চড়ে, মুসলমানরা চড়ে না? বেলডাঙা স্টেশন জ্বলেছে, ৫০০ হকারের দোকান পুড়েছে। নিমতিতায় ৬৮টি দোকান লুট হয়েছে, রেজিনগর স্টেশনে আগুন লাগানো হয়েছে। নবান্নের অদূরে সাঁতরাগাছিতে ৩৭টি বাসে আগুন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ২২টি ছিল সরকারি বাস। মোথাবাড়িতে বেছে বেছে হিন্দুদের দোকানে আগুন লাগানো হয়েছিল।”
তিনি আরও জানান, নতুন আইনের আওতায় শুধু অপরাধীদের কারাবাস নয়, অপরাধের ফলে হওয়া ক্ষতির জন্য তাঁদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা যাবে এবং সেই সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।বিরোধীদের উদ্দেশে কড়া বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “যাঁরা বিরোধিতা করতে চান, তাঁরা ইন্ডি-জোট শাসিত রাজ্যে গিয়ে করুন।”

বিলের সমর্থনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শিলিগুড়ির বিজেপি বিধায়ক তথা পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ বলেন, “যাঁরা মনে করেন সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা কোনও অপরাধ নয়, তাঁদের ভুল ভাঙানোর সময় এসেছে। সিএএ, ওয়াকফের নামে বাংলায় নৈরাজ্য হয়েছে। আগের সরকার শাহজাহানদের মতো গুন্ডাদের প্রশ্রয় দিয়েছে। কোটি কোটি টাকার বিছানায় ঘুমিয়েছেন তৃণমূলের নেতারা।”

তাঁর দাবি, “গরিবের টাকা লুট করার চেষ্টা করলে কঠোর শাস্তি হবে। সরকারি সম্পত্তির দিকে কেউ আর চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না। আমরা এমন ব্যবস্থা করছি, যাতে পুলিশকে আর টেবিলের তলায় লুকিয়ে থাকতে না হয়। পুলিশকে টেবিলের তলা থেকে বের করে গুন্ডাদের টেবিলের তলায় ঢোকানোর সময় এসেছে।”
শংকর ঘোষের বক্তব্যের পর গুন্ডাদমন বিলের বিরোধিতায় বক্তব্য রাখতে ওঠেন তৃণমূলের প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের সময়েই বিধানসভায় হট্টগোল শুরু হয়। ফলে কার্যত বিল নিয়ে নিজের বক্তব্য শেষ করতে পারেননি তিনি। ক্ষোভ প্রকাশ করে শোভনদেব বিলের প্রসঙ্গ এড়িয়ে বিরোধী দলনেতার পদে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণার বিষয়টি নিয়ে স্পিকারের কাছে আপত্তি জানান।
এরপর বিলের সমর্থনে বক্তব্য রাখেন আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি বিধায়ক তথা পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি বলেন, “তৃণমূল আমলে মানুষ দেওয়ালে পেরেক পুঁততেও ভয় পেত। যে সরকার ভোট-পরবর্তী হিংসাকে অপরাধ বলে মনে করত না, যে দলের নেতারা গাড়ির বনেটে দাঁড়িয়ে ডিজে বাজিয়ে হুমকি দিত, তাদের হাতে বাংলার শাসন ছিল। এটা বিড়ালকে মাছ পাহারা দেওয়ার মতোই ছিল।”অগ্নিমিত্রা আরও স্পষ্ট করেন, শুধু সরাসরি হিংসা নয়, উস্কানিমূলক মন্তব্যও এই আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অন্যদিকে, বিলের বিরোধিতা করেন ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। তাঁর অভিযোগ, এই আইনে পুলিশের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা তুলে দেওয়া হচ্ছে। নওশাদ বলেন, “সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের কথা বলা হয়েছে। তাহলে বিরোধীরা মত প্রকাশ করলেই কি তাঁদের সন্দেহ করা হবে? প্রকৃত অপরাধীদের অবশ্যই শাস্তি হোক, কিন্তু নির্দোষ মানুষ যেন কোনওভাবেই হয়রানির শিকার না হন।” তিনি এবং কুনাল ঘোষ বিলটি সিলেক্ট কমিটির কাছে পাঠানোর আবেদন জানান।
সরকারের দাবি, এই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য শুধু অপরাধ দমন নয়, দুর্নীতি ও লুটের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি উদ্ধার করাও। বিলের খসড়ায় বলা হয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির নিরিখে গঠিত কমিশন চাইলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণের দ্বিগুণ পর্যন্ত ‘দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ’ বা জরিমানা ধার্য করতে পারবে।
সরকারের মতে, বর্তমান আইন রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাকে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন। তৃণমূল আমলে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, জমি দখল, বেআইনি বালি ও পাথর কারবার এবং সংগঠিত গুন্ডামি যে চরমে পৌঁছেছিল, সেই পরিস্থিতির মোকাবিলায় এই নতুন আইন কার্যকর ভূমিকা নেবে বলেই সরকারের দাবি।

বিলে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সংজ্ঞাও বিস্তৃত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা বা নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ তৈরি করতে পারে— এমন সব কর্মকাণ্ডই এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা, মানুষের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করা, আইনসম্মত ব্যবসা-বাণিজ্য বা পেশায় বাধা সৃষ্টি, বেআইনিভাবে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দখল, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা, বেআইনি খনি, বালি বা পাথর উত্তোলন এবং বনজ ও বন্যপ্রাণী সম্পদের ক্ষতি করা।
অর্থাৎ, রাজনৈতিক হিংসার পাশাপাশি তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, জমি দখল, বেআইনি খনি ও বালি কারবার, সম্পত্তি ভাঙচুর এবং ব্যবসায় বাধা—সব ধরনের সংগঠিত সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডকেই এই আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খুলে দিল রাজ্য সরকার।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!