- মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
- জুন ৩০, ২০২৬
আর্থিক সঙ্গতি, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বিশ্বকাপে অধরা সাফল্য উপসাগরীয় দেশগুলির ?
উপসাগরীয় দেশগুলি ক্রীড়াজগতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিগত কয়েক বছর ধরে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে । তাসত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের পারফরমেন্স ধারাবাহিকভাবেই দুর্বল । যেমন এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে গেছে বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ সৌদি আরব ও কাতার । আরও দুই উপসাগরীয় দেশ ইরান, ইরাকের অবস্থাও খুবই সঙ্গীন । অর্থ, সুযোগ–সুবিধা থাকা সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশগুলি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কেন ব্যর্থ ?
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরান কিংবা ইরাকের কথা বাদ দিন । আর্থিক কিংবা পরিকাঠামোর দিক দিয়ে ততটা শক্তিশালী নয়। কিন্তু সৌদি আরব কিংবা কাতার ? ক্রীড়াক্ষেত্রে এই দুই দেশ বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ম্যাঞ্চেস্টার সিটি ও পিএসজি–র মতো ইউরোপের সেরা ফুটবল ক্লাব অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে ফর্মুলা ওয়ান রেস, গলফ ট্যুর এবং ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনে এই দেশগুলি ক্রীড়াক্ষেত্রে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছে । তবুও, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের জাতীয় দলের পারফরমেন্সের ক্ষেত্রে এই বিপুল অর্থ এবং বিশ্বমানের সুযোগ–সুবিধাও তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে । ২০২৬ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে সৌদি আরব ও কাতারের লজ্জাজনক পারফরমেন্স এবং প্রতিযোগিতা থেকে তাদের দ্রুত বিদায়ই তার সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ । সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ সত্ত্বেও উপসাগরীয় দেশগুলি কেন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে ?
আসলে উপসাগরীয় দেশগুলির ক্রীড়া কৌশলের বড় অংশই ‘স্পোর্টসওয়াশিং’ দ্বারা চালিত হয়েছে । এর অর্থ হল, তারা নিজেদের ভাবমূর্তি উন্নত করতে এবং পর্যটনকে উৎসাহিত করতে বড় বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজনের ওপর অত্যাধিক বেশি মনোযোগ দিচ্ছে । উদাহরণস্বরূপ, কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। সৌদি আরব ২০৩১ বিশ্বকাপের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত । এই দেশগুলি রাতারাতি ঝকঝকে স্টেডিয়াম এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করে। কিন্তু ক্রীড়াক্ষেত্রে তৃণমূল স্তরের উন্নয়নের দিকে একেবারেই নজর দেয় না । এর অর্থ হল, এই দেশগুলি তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরিতে এখনও অনেক পিছিয়ে আছে । যে কোনও দেশে একটা শক্তিশালী ক্রীড়া ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে কয়েক দশক সময় লাগে । শুধুমাত্র বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে তা সম্ভব নয় ।
সৌদি আরব সেখানকার ঘরোয়া ফুটবল লিগ, সৌদি প্রো লিগকে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় লিগে পরিণত করার জন্য ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, নেইমার, করিম বেঞ্জিমা, সাদিও মানের মতো বিশ্বের নামী–দামী কিছু ফুটবলারকে চুক্তিবদ্ধ করেছে । তাদের এই কৌশল ঘরোয়া লিগ, প্রো লিগকে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি এনে দিলেও স্থানীয় ফুটবলারদের মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে । বিদেশী তারকাদের আগমনের ফলে সৌদি আরবের তরুণ এবং স্থানীয় ফুটবলাররা খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে । যখন দেশের সেরা খেলোয়াড়রা নিজেদের লিগেই বেঞ্চে বসে থাকে, তখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতীয় দলের পারফরমেন্সে অবনতি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার ফুটবলাররা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা এবং সিরি আ–র মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও কঠিন ইউরোপীয় লিগগুলিতে খেলে নিজেদের দক্ষতা শাণিত করে । উপসাগরীয় দেশগুলির ফুটবলারদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা ভিন্ন । কাতার এবং সৌদি আরবের ফুটবলাররা নিজেদের ঘরোয়া লিগগুলিতে মোটা অঙ্কের অর্থ, বিলাসবহুল সুযোগ–সুবিধা এবং ভিআইপি আপ্যায়ন পেয়ে থাকে। এই নিরাপত্তা ও আরামই ফুটবলারদের স্বাচ্ছন্দ্যের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে ইউরোপীয় লিগগুলিতে খেলতে বাধা দেয় । ফুটবলাররা যদি বিশ্বের সেরাদের বিরুদ্ধে না খেলে, তাহলে তাঁরা বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চের চাপ সামলাতে পারবেন না ।
ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ইউরোপীয় দেশগুলির তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে, বিশেষ করে কাতারে, স্থানীয় জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম । স্বল্প জনগোষ্ঠী থেকে তারকা ক্রীড়াবিদ খুঁজে বের করা এবং গড়ে তোলা বরাবরই একটা বড় চ্যালেঞ্জ । উপরন্তু, অন্যান্য দেশে খেলাধুলাকে পেশাদারী জীবন হিসেবে গ্রহণ করার যে সংস্কৃতি বা আবেগ দেখা যায়, ঐতিহ্যগতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলিতে তার অভাব রয়েছে ।
২০২৬ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব উপসাগরীয় দেশগুলির এই সব দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে । কাতার মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘বি’–তে সবার শেষে থেকে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেছে । সৌদি আরবও গ্রুপ ‘এইচ’–এ স্পেন, কেপ ভার্দে এবং উরুগুয়ের মতো দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে সুপার ৩২–এ পৌঁছতে ব্যর্থ । এই পারফরমেন্স আবারও প্রমাণ করেছে যে, টাকা দিয়ে বিশ্বের সেরা স্টেডিয়াম, সবচেয়ে দামী কোচ এবং নামকরা বিদেশি খেলোয়াড় কেনা যায় । কিন্তু জাতীয় দলের ভেতরে জয়ের মানসিকতা এবং প্রতিভা শুধু ডলার দিয়ে রাতারাতি তৈরি করা যায় না ।
❤ Support Us








