- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জুলাই ৬, ২০২৬
ফের বিস্মৃতির অতলে পাঞ্জাবের রক্তাক্ত নব্বই ? মুক্তির দু-দিনেই ওটিটি থেকে উধাও দিলজিৎ দোসাঞ্জের ‘সতলুজ’
মাত্র দু–দিন। দীর্ঘ তিন বছরের অপেক্ষা, ১২৭টি কাটছাঁটের বিতর্ক, নাম পরিবর্তন, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি আটকে যাওয়া— সব বাধা অতিক্রম করে অবশেষে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দর্শকের সামনে এসেছিল দিলজিৎ দোসাঞ্জ অভিনীত বহুচর্চিত ছবি ‘সতলুজ’। কিন্তু সে স্বস্তিও স্থায়ী হলো না। মুক্তির মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ছবিটি ভারতের জন্য নিজেদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নিল ওটিটি সংস্থা জি৫। সংস্থার তরফে শুধু জানানো হয়েছে, ‘বর্তমান পরিস্থিতি’ বিবেচনা করে ছবিটিকে আপাতত ‘অন পজ়’ রাখা হয়েছে। তবে সে ‘পরিস্থিতি’ যে ঠিক কী, তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি সংস্থা।
এ ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে পাঞ্জাবের নব্বই দশকের রক্তাক্ত ইতিহাস, মানবাধিকার কর্মী যশবন্ত সিং খালরার সংগ্রাম, সেন্সর বোর্ডের ভূমিকা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র বনাম স্মৃতির দীর্ঘ বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে— একটি চলচ্চিত্রকে ঘিরে এত অস্বস্তি কেন ? আর কেনই বা ভারতের অন্যতম বিতর্কিত মানবাধিকার-অধ্যায় আজও রাজনৈতিকভাবে এত স্পর্শকাতর? ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য আরও বহু আগে। ছবিটির প্রথম নাম ছিল ‘পাঞ্জাব ’৯৫’। পরিচালক হানি ত্রেহানের এ ছবি নির্মিত হয়েছে মানবাধিকার কর্মী যশবন্ত সিং খালরার জীবন ও সংগ্রামকে কেন্দ্র করে। ছবিতে তাঁর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরেই এই ছবিকে ঘিরে কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র শংসাপত্র পর্ষদ (সিবিএফসি)-র সঙ্গে নির্মাতাদের সংঘাত চলছিল।
প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগে সেন্সর বোর্ড ছবিটিতে ১২৫টিরও বেশি কাটছাঁটের নির্দেশ দেয়। পরে পরিচালক দাবি করেন, সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭-এ। শুধু কিছু দৃশ্য বাদ দেওয়া নয়, ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র যশবন্ত সিং খালরার নাম পর্যন্ত বদলে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। নির্মাতারা সেই পরিবর্তন মানতে অস্বীকার করেন। ফলে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ছবিটি মুক্তিই পায়নি। অবশেষে নতুন নাম— ‘সতলুজ’ নিয়ে কোনো কাটছাঁট ছাড়াই ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পায় ছবিটি। কিন্তু মুক্তির মাত্র দু–দিনের মাথায় ভারতের দর্শকদের জন্য সেটি অদৃশ্য হয়ে গেল। জি৫ জানিয়েছে, তারা ছবির নির্মাতা ও সৃজনশীল ভাবনার পাশে রয়েছে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আপাতত ভারতে ছবিটি প্রদর্শন করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি আইনি পথ অনুসরণ করে দ্রুত ছবিটিকে ফিরিয়ে আনার আশ্বাসও দিয়েছে সংস্থা। কিন্তু কী এমন বিষয় রয়েছে ছবিটিতে, যা এত বড়ো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে?
‘সতলুজ’-এর কেন্দ্রে রয়েছেন যশবন্ত সিং খালরা। পেশায় তিনি ছিলেন ব্যাঙ্ককর্মী। কিন্তু আশির দশকের শেষ থেকে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঞ্জাবে জঙ্গি দমন অভিযানের আবহে তিনি মানবাধিকার রক্ষার কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত করেন। ‘অপারেশন ব্লু স্টার’, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, ১৯৮৪ সালের শিখ-বিরোধী দাঙ্গা এবং তার পরবর্তী সশস্ত্র সংঘর্ষে পাঞ্জাব কার্যত এক অস্থির সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় অসংখ্য পরিবার অভিযোগ করতে শুরু করে, তাঁদের আত্মীয়দের পুলিশ আটক করলেও পরে তাঁদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। অভিযোগগুলিকে গুরুত্ব দিয়েই তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন খালরা।
তাঁর অনুসন্ধান পৌঁছে যায় অমৃতসরের বিভিন্ন পুরসভার দাহ-নিবন্ধন, শ্মশানের রেজিস্টার এবং প্রশাসনিক নথিতে। সে নথি ঘেঁটে তিনি দাবি করেন, বহু অজ্ঞাতপরিচয় দেহ পুলিশ গোপনে দাহ করেছে। অভিযোগ, যাঁরা নিখোঁজ হয়েছিলেন, তাঁদের বহুজনের দেহ পরিবারের অজান্তেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছিল। তাঁর সংগৃহীত তথ্য শুধু পাঞ্জাব নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলেও প্রবল আলোড়ন তোলে। যিনি অন্যের নিখোঁজ হওয়ার তদন্ত করছিলেন, শেষ পর্যন্ত নিজেও নিখোঁজ হয়ে যান। ১৯৯৫ সালে একদিন নিজের বাড়ির বাইরে থেকে যশবন্ত সিং খালরা নিখোঁজ হয়ে যান। পরে তদন্তে অভিযোগ ওঠে, তাঁকে পাঞ্জাব পুলিশের কয়েকজন সদস্য অপহরণ করেছিলেন। কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই)-র তদন্তে দাবি করা হয়, তাঁকে বেআইনিভাবে আটক রেখে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে ২০০৭ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট চার প্রাক্তন পুলিশকর্মীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই রায় ছিল রাষ্ট্রের জবাবদিহির দাবিতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
পরিচালক হানি ত্রেহান বারবার অভিযোগ করেছেন, ‘আমাদের কাজই আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। যদি আপত্তি থাকে, আদালত সিদ্ধান্ত নিক। কিন্তু বাস্তবের একজন মানুষের নাম ইতিহাস থেকে মুছে দিতে বলা মানে সেই ইতিহাসকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা।’ ত্রেহানের আরও অভিযোগ, ‘এই ১২৭টি কাট চাপানোর চেষ্টা কেবল একটি ছবির উপর চাপানো হয়নি, চাপানো হয়েছে গণতন্ত্রের উপর।’ নির্মাতারা সে নির্দেশ কার্যকর করতে অস্বীকার করায় ছবিটি আর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি। ওটিটিতে ছবি মুক্তির পর ছবিটি সরিয়ে নেওয়া হতে পারে বলে আশঙ্কা করছিলেন দিলজিৎ দোসাঞ্জ। তিনি মজা করেই বলেছিলেন, ‘আজ শনিবার। মনে হচ্ছে সোমবারের মধ্যেই ছবিটা হয়তো সরিয়ে নেওয়া হবে। আপনারা দেখে নিন, ডাউনলোড করে রাখুন।’ সে কথাই সত্যি হওয়ায়, পরে সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, ‘আমরা কি নিজেদের গল্পও বলতে পারব না? ১৯৯৫ সালে খালরা সাহেবের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। আজও তাঁর কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা চলছে।’ ছবিটি সরিয়ে নেওয়ার পর আরও এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছি। ‘সতলুজ’ খালরা সাহেবের গল্প।’
ছবি সরানো নিয়ে জি৫ অবশ্য সেন্সর-বিতর্ক বা কোনো সরকারি নির্দেশের সঙ্গে ছবি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে যুক্ত করেনি। সংস্থার বক্তব্য, দর্শকদের অভূতপূর্ব সমর্থনের জন্য তারা কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে জানানো হয়েছে, ছবির সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির পাশে তারা দৃঢ়ভাবে রয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছবিটিকে আবার দর্শকদের সামনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। তবে কেন ভারতে ছবিটি আপাতত দেখা যাচ্ছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। সমালোচকদের মতে, ‘সতলুজ’ কেবল একটি জীবনীমূলক চলচ্চিত্র নয়। এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং সাংবিধানিক অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে অস্বস্তিকর, কঠিন কিছু প্রশ্ন তুলেছে। ছবিতে যশবন্ত সিং খালরাকে কোনো অতিমানবীয় নায়ক হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং এমন এক সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি সরকারি নথি, পৌরসভার রেজিস্টার এবং প্রশাসনিক কাগজপত্রের সাহায্যে সত্যের অনুসন্ধান করেছিলেন।
পরিচালক হানি ত্রেহানও সংঘাতকে সাদা-কালো করে দেখানোর পথ এড়িয়ে গিয়েছেন। ছবিতে পুলিশকেও একমাত্রিক খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং দেখানো হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠান যখন নিজের কাজের জবাবদিহি বন্ধ করে দেয়, তখন গণতন্ত্রের ভিত কোথায় গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। আলোচকদের মতে, ছবিটি ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ নয়, বরং সংবিধানের মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড়ানো এক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। ছবির মূল প্রশ্ন— গণতন্ত্র কি নিরাপত্তার নামে নিজের নাগরিকদের স্মৃতি, অধিকার আর ইতিহাসকে বিস্মৃত করতে পারে ?
তিন বছরের সেন্সর জট। ১২৭টি কাটছাঁটের দাবি। নাম পরিবর্তন। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না পাওয়া। পরে ওটিটিতে আনকাট সংস্করণে মুক্তি। এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তির দু’দিনের মধ্যেই প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া— ‘সতলুজ’-এর যাত্রাপথ যেন ছবিটির বিষয়বস্তুর মতোই বিতর্কে মোড়া। সামাজিক মাধ্যমেও বহু দর্শক লিখেছেন, কোনো প্ল্যাটফর্ম থেকে একটি চলচ্চিত্র সরিয়ে দেওয়া গেলেও, একবার কোনো গল্প মানুষের কাছে পৌঁছে গেলে সে গল্প নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক এবং আত্মসমালোচনা থামে না। ফলে ‘সতলুজ’ আপাতত ভারতের দর্শকদের নাগালের বাইরে থাকলেও, ছবিটিকে ঘিরে প্রশ্নগুলি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে— শিল্পীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কতটুকু? বেবাক ইতিহাসকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরার অধিকার কতটুকু? আর গণতন্ত্র কি তার অস্বস্তিকর স্মৃতিগুলিকে চিরকাল পর্দার আড়ালে রাখতে পারে ?
❤ Support Us








