- ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র বি। দে । শ
- জুন ১২, ২০২৬
অ্যানিমে নিয়ে ‘ইয়ার্কি’! ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে জাপান
‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ (মাগা) রাজনীতির সঙ্গে জাপানি মাঙ্গা ও অ্যানিমের সম্পর্ক আদৌ কোথায়? এ প্রশ্নই তোলপাড় ফেলেছে জাপানের অনুরাগী মহলে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। সেখানে জনপ্রিয় জাপানি অ্যানিমে সিরিজ ‘নারুতো’-র নায়ক নারুতো উজুমাকির আদলে ট্রাম্পকে আঁকা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে তৈরি ওই ভিডিও প্রকাশ্যে আসতেই জাপানের অ্যানিমে ও মাঙ্গা-প্রেমীদের একাংশের ক্ষোভ উথলে উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রিয় সাংস্কৃতিক সৃষ্টিগুলিকে রাজনৈতিক প্রচার ও সামরিক বার্তার বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মূল স্রষ্টাদের ভাবনার পরিপন্থী।
বিতর্কের জেরে শুরু হওয়া ‘প্রটেস্ট জাপানি মাঙ্গা’ নামের একটি অনলাইন আবেদনে ইতিমধ্যেই ২৪ হাজারেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের উদ্দেশে আবেদন জানানো হয়েছে, জাপানি মাঙ্গা ও অ্যানিমের সাংস্কৃতিক গুরুত্ব, সৃষ্টিশীল প্রেক্ষাপট এবং স্রষ্টাদের অভিপ্রায়কে সম্মান জানাতে হবে। আবেদনকারীদের বক্তব্য, বহু দশক ধরে জাপানি মাঙ্গা ও অ্যানিমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি পাঠক-দর্শককে সাহস, বন্ধুত্ব, আত্মত্যাগ, মানবিকতা আর অধ্যবসায়ের শিক্ষা দিয়েছে। সেসব চরিত্র ও দৃশ্যকে রাজনৈতিক বা সামরিক বার্তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলে তার অর্থ ও তাৎপর্য বিকৃত হয়ে যায়। তাঁদের আশঙ্কা, জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
বিতর্কের সূত্রপাত অবশ্য গত মার্চ মাসে। সে সময় হোয়াইট হাউসের সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের ফুটেজের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল জনপ্রিয় অ্যানিমে সিরিজ ‘ড্রাগন বল’ এবং ‘ইউ-গি-ওহ!’-এর দৃশ্য। জাপানি অনুরাগীদের একাংশ তখনই আপত্তি তোলেন। তাঁদের মতে, যুদ্ধ বা সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মতো স্পর্শকাতর প্রসঙ্গে এ ধরনের বিনোদনমূলক সৃষ্টির ব্যবহার অত্যন্ত সমস্যাজনক। এরপর আর-একটি পোস্টে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’ স্লোগানের সঙ্গে পোকেমন-সংক্রান্ত একটি ভিডিও গেমের চিত্র ব্যবহার করা হয়। অভিযোগ ওঠে, সংশ্লিষ্ট স্বত্বাধিকারীদের অনুমতি ছাড়াই এসব ছবি ও ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রতিবাদীদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা জাপানের সরকারি মহলেও যোগাযোগ করেছেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রক পরবর্তীকালে মার্কিন দূতাবাসের কাছে হোয়াইট হাউসের সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টে ‘ইউ-গি-ওহ!’ এবং নিন্টেন্ডো-সম্পর্কিত উপাদানের অননুমোদিত ব্যবহারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিল। এবার, নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে ট্রাম্পের ‘নারুতো’ রূপ। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি এআই-নির্ভর সংগীত ভিডিওতে তাঁকে কখনো নারুতো উজুমাকির বেশে, কখনো সিংহের পিঠে চড়ে, কখনো আবার চাঁদে মার্কিন পতাকা পুঁততে দেখা যায়। ‘ ধন্যবাদ রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প’ শীর্ষক ওই গানের ভিডিওটি তৈরি করেছেন নিউ ইয়র্কের রিপাবলিকান নেতা অ্যান্তনি কনস্তান্তিনো। তিনি মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের প্রার্থীও। ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে কনস্তান্তিনোকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।
অনলাইন বিক্ষোভের উদ্যোক্তা জাপানের কানাগাওয়া প্রদেশের বাসিন্দা ৩৪ বছর বয়সি নানা সুজুকি। তিনি নিজেকে দীর্ঘদিনের অ্যানিমে ও মাঙ্গা অনুরাগী বলে পরিচয় দেন। তাঁর অভিযোগ, ‘এই সৃষ্টিগুলি শুধু বিনোদন নয়। এগুলির সঙ্গে মানুষের আবেগ, মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় জড়িয়ে রয়েছে। তাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হলে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করেন।’ বিশেষ করে ‘ইউ-গি-ওহ!’-এর স্রষ্টা কাজুকি তাকাহাশির প্রসঙ্গ তুলে সুজুকি বলেন, ‘তিনি অন্যের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন হারিয়েছিলেন। তাঁর কাজের মানবিক বার্তা সামরিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার হতে দেখা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’
প্রসঙ্গত, ‘নারুতো’ জাপানের অন্যতম সফল মাঙ্গা ফ্র্যাঞ্চাইজি। ১৯৯৯ সালে মাসাশি কিশিমোতোর হাতে শুরু হওয়া এ কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু এক কিশোর যোদ্ধা, যে সমাজের অবজ্ঞা সত্ত্বেও নিজের স্বপ্নপূরণের লড়াই চালিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে মাঙ্গাটি থেকে নির্মিত অ্যানিমে সিরিজ, চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন পণ্য বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ‘নারুতো’ মাঙ্গার ২৫ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। বিতর্কে কপিরাইট প্রশ্নও সামনে এসেছে। ‘ইউ-গি-ওহ!’-এর সরকারি অ্যানিমে অ্যাকাউন্ট ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের পোস্টে ব্যবহৃত ফুটেজের জন্য তাদের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছে ‘পোকেমন’ কোম্পানিও। সংস্থার তরফে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, তারা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ বা রাজনৈতিক প্রচারের সঙ্গে যুক্ত নয়।
অন্যদিকে, ‘নারুতো’ মাঙ্গার প্রকাশক সংস্থা ‘শুয়েইশা’ -র এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পোস্টে ব্যবহৃত অ্যানিমে-চিত্রগুলির স্বত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট অ্যানিমেশন প্রযোজনা কমিটির হাতে। তবে এ বিষয়ে স্রষ্টা মাসাশি কিশিমোতো ব্যক্তিগত ভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। সামাজিক মাধ্যমেও ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। এক অনুরাগী লিখেছেন, ‘অনুমতি নিয়ে ব্যবহার করা হলে আপত্তি নেই। কিন্তু অনুমতি ছাড়া সাংস্কৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা মানে সংস্কৃতির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন।’ আর-এক জনের কথায়, ‘আমরা চাই এ ব্যপারে জাপান সরকার আরও স্পষ্ট অবস্থান নিক।’
মাঙ্গা ও অ্যানিমে জাপানের অন্যতম শক্তিশালী ‘সফট পাওয়ার’, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর সে কারণেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রচারে নারুতো, ড্রাগন বল বা ইউ-গি-ওহ!-এর উপস্থিতি শুধু কপিরাইট বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকছে না; তা ক্রমশ সাংস্কৃতিক অধিকার, স্রষ্টার মর্যাদা এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। জাপানের অনুরাগীদের প্রশ্ন, বিশ্বজোড়া জনপ্রিয় চরিত্রগুলির বার্তা কি রাজনৈতিক স্লোগানের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া যায়? সে বিতর্কই এখন প্রশান্ত মহাসাগরের দু-প্রান্তে সমান তীব্রতায় জ্বলছে।
❤ Support Us








