- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৬, ২০২৬
বারুইপুরের ঘটনার প্রতিবাদে রাজপথে মমতা
বারুইপুরের সূর্যপুরে ১২ বছরের নাবালিকাকে যৌন নির্যাতন করে নৃশংস হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার সন্ধ্যায় কালীঘাটের বাসভবনের সামনে থেকে মোমবাতি হাতে প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দলের একাধিক সাংসদ, বিধায়ক, নেতা-কর্মী ও সমর্থক। কালীঘাটের সরু গলি থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া সে মিছিলে একের পর এক ধ্বনিত হতে থাকে— ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘তোমার সুর, আমার সুর— জাস্টিস ফর বারুইপুর’, ‘আমার সুর, তোমার সুর— জাস্টিস ফর বারুইপুর’।
তবে মিছিলের শুরু থেকেই তৈরি হয় উত্তেজনা। ৩০বি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গলির মুখে পৌঁছতেই পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে যায় মিছিল। প্রথমে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এগোতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তৃণমূলের। কিছু ক্ষণ ধরে পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে কথাবার্তার পরেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক না-হওয়ায় কর্মী-সমর্থকদের একাংশ ব্যারিকেড সরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মুহূর্তের মধ্যেই ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত মিছিলকে এগোনোর অনুমতি দেওয়া হয়। তার পর হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট পেরিয়ে হাজরা মোড়ের দিকে এগিয়ে যায় প্রতিবাদ মিছিল।
তৃণমূলের দাবি, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অযথা বাধা দিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তোলা হয়েছিল। দলের নেতাদের অভিযোগ, রবিবার যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বারুইপুরে যেতে দেওয়া হয়নি, সোমবারও তাঁর প্রতিবাদ কর্মসূচি আটকে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। যদিও প্রশাসনের তরফে এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। কালিঘাটের কর্মসূচির আগে সকালেই বারুইপুরে পৌঁছয় তৃণমূলের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। দলে ছিলেন প্রাক্তন বিধানসভা অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন এবং সাংসদ প্রতিমা মণ্ডল। নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তাঁরা। পরিবারের বক্তব্য শোনেন, ঘটনার খুঁটিনাটি জানেন এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বার্তা পৌঁছে দেন। প্রতিনিধি দল কলকাতায় ফেরার পরেই কালীঘাট থেকে প্রতিবাদ মিছিলের সূচনা করেন মমতা। তিনি নিজেও ফোনে নির্যাতিতার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
বারুইপুরে যাওয়াকে কেন্দ্র করে রবিবার থেকেই রাজনৈতিক টানাপড়েন শুরু হয়েছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ ছিল, তিনি একাই নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কালীঘাটের বাসভবনের সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করে কার্যত তাঁকে আটকে রাখা হয়। তাঁর ভাষায়, ‘মুখে না বললেও এটা হাউস অ্যারেস্টেরই নামান্তর।’ তৃণমূলও একই অভিযোগ তুলে বিজেপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের অভিযোগ আনে। যদিও প্রশাসন সেই অভিযোগ মানতে নারাজ। সোমবার সকালে অবশ্য কালীঘাটের ছবি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অতিরিক্ত বাহিনী তুলে নেওয়া হয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত বাহিনীই কেবল মোতায়েন ছিল।
রবিবার রাতে সমাজমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে মমতা বলেন, বারুইপুরের ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে নারী নির্যাতনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বারুইপুরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে বিস্ফোরণের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, নির্যাতিতার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল। সেই সুযোগও তাঁকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। সোমবারের মিছিলের ঠিক আগে সমাজমাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে নিশানা করে তৃণমূলের কড়া আক্রমণও রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র করে তোলে। দলের অভিযোগ, নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচিকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। একই সঙ্গে তৃণমূল দাবি করে, প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং সংবেদনশীলতার অভাবই মানুষের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, বারুইপুরের ঘটনাকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন বলেও দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, ঘটনার পরে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনি, ভাঙচুর, রেললাইন উপড়ে ফেলা কিংবা পুলিশের উপর হামলার ঘটনায় যুক্ত হয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে, বারুইপুরের নৃশংস ঘটনার তদন্ত যেমন এগোচ্ছে, তেমনই তার রাজনৈতিক অভিঘাতও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। কালীঘাটের মোমবাতি মিছিল সেই রাজনৈতিক লড়াইকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল। নারী নিরাপত্তা, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা— এই তিন প্রশ্নকে সামনে রেখেই আগামী দিনে শাসক-বিরোধী সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
❤ Support Us








