- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৬, ২০২৬
অবিরাম বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত মহারাষ্ট্র: পুণেতে পাহাড়ধসে চাপা পাঁচটি বাড়ি, আটকে তিন। বন্ধ একাধিক মহাসড়ক, মুম্বাইয়ে স্তব্ধ ট্রেন পরিষেবা
অবিরাম বর্ষণে বিপর্যস্ত মহারাষ্ট্র। বর্ষার তাণ্ডব ক্রমশ ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। অঝোর বৃষ্টিতে সোমবার ভোর থেকে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে মুম্বাই, পুণে, রায়গড়, থাণে-সহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। পুণে জেলার লোহাগড় দুর্গ সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসে অন্তত পাঁচটি বাড়ি মাটির নীচে চাপা পড়েছে। একটি বাড়িতে একই পরিবারের তিন সদস্য আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ধসের জেরে বন্ধ করে দিতে হয়েছে মুম্বাই-পুণে এক্সপ্রেসওয়ে এবং পুরনো মুম্বই-পুণে মহাসড়ক। তীব্র যানজট মুম্বাই-গোয়া মহাসড়কেও। পাহাড়ধসের প্রভাব পড়েছে রেল চলাচলেও। বাতিল হয়েছে অন্তত ১৬টি ট্রেন, পরিবর্তিত হয়েছে আরও ৯টি ট্রেনের রুট। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি চলবে। সে কারণেই পুণেতে ‘লাল’ এবং মুম্বাইয়ে ‘কমলা’ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
সরকারি সূত্রের খবর, সোমবার ভোরে টানা বর্ষণের জেরে পুনে জেলার মাভল এলাকার প্রত্যন্ত পাটন গ্রামে পাহাড়ের একাংশ ভেঙে পড়ে। পরপর তিনটি পৃথক স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে একটি ধসে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে যায় একটি বাড়ি। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, ধসের সময় বাড়ির ভিতরে একই পরিবারের তিন সদস্য ছিলেন। তাঁদের কোনো খোঁজ এ পর্যন্ত মেলেনি। লোনাভালা বিভাগের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ গজানন টোম্পে জানান, ভারী বৃষ্টির জেরে পাহাড়ি এলাকায় একাধিক ভূমিধস হয়েছে। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়াদের সন্ধান চালাচ্ছেন। উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় পুলিশ, দমকল, প্রশাসনিক আধিকারিক এবং স্বেচ্ছাসেবীরাও যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি বাড়ি সম্পূর্ণ ধসে চাপা পড়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের ভিতরে তিনজনের আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘটনার খবর মিলতেই জেলা প্রশাসন জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর (এনডিআরএফ) সাহায্য চায়। পুনে-ভিত্তিক ‘নডিআরএফ’-এর পঞ্চম ব্যাটালিয়নের ৩০ সদস্যের একটি বিশেষ দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় পুলিশ, দমকল এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবার কর্মীরাও যোগ দেন। ভারী বৃষ্টি ও নরম হয়ে যাওয়া পাহাড়ি মাটির কারণে উদ্ধারকাজে বারবার বিঘ্ন ঘটছে। তবু ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে নিরবচ্ছিন্ন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। প্রশাসনের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ায় অন্তত পাঁচটি বাড়ি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আশপাশের আরও কয়েকটি বাড়িও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় সেখানকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ভূমিধসের প্রভাব পড়েছে মহারাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও। মুম্বই-পুনে এক্সপ্রেসওয়ে এবং পুরনো মুম্বই-পুনে মহাসড়কে সোমবার সকাল থেকেই যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। এক্সপ্রেসওয়ের টানেল-২-এর বহির্গমন পথের কাছে ভূমিধসের ফলে খোপোলি-কুসগাঁও ‘মিসিং লিঙ্ক’-এর পুনেমুখী ক্যারেজওয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই অংশে যান চলাচল অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একই সময়ে পুরনো মুম্বই-পুনে মহাসড়কের একাধিক অংশ জলমগ্ন হয়ে পড়ে। কোথাও পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা ও পাথরে রাস্তা ঢেকে যায়, কোথাও আবার উপচে পড়া জলে সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ফলে দুই শহরের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ‘হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশের কন্ট্রোল রুম’ জানিয়েছে, খান্ডালা ঘাট এলাকায় জল জমা ও ভূমিধসের কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত উভয় সড়কপথে যান চলাচল বন্ধই থাকবে।
বর্ষার দাপট শুধু মুম্বাই-পুনে নয়, মুম্বাই-গোয়া মহাসড়কেও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। চিপলুনের কাছে খাভাটি এলাকায় বিশাল ভূমিধসের ফলে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে উভয় দিকের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর রাস্তার উপর এসে পড়ায় মহাসড়ক অবরুদ্ধ হয়ে যায়। আটকে পড়া যাত্রীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘক্ষণ ধরে রাস্তায় আটকে থাকায় খাবার, পানীয় জল এবং জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে। প্রশাসন ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করলেও অবিরাম বৃষ্টির কারণে সেই কাজ অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। অন্যদিকে, পারশুরাম ঘাট এলাকায় আরও একটি ভূমিধসের জেরে যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। রায়গড় জেলার সারসান ও ইসাম্বা ফাটার মধ্যবর্তী খোপোলি-পেন মহাসড়কও অতিরিক্ত জল জমে যাওয়ায় সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। মহারাষ্ট্র স্টেট রোড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (এমএসআরডিসি) জানিয়েছে, ভোর চারটে থেকেই বিকল্প রুটে যানবাহন ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মাভল ও তামহিনি ঘাট এলাকায় বন্যাসদৃশ পরিস্থিতির কারণে সে বিকল্প পথগুলিও বহু জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ পরামর্শ জারি করে বলা হয়েছে, একান্ত প্রয়োজন না হলে আপাতত মুম্বই ও পুনের মধ্যে যাতায়াত না করাই শ্রেয়। যাঁদের যাত্রার পরিকল্পনা রয়েছে, তাঁদের তা স্থগিত রেখে সরকারি ট্রাফিক আপডেট অনুসরণ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তবে, শুধু সড়ক নয়, স্তব্ধ হয়ে পড়েছে রেল পরিষেবাও। সোমবার ভোর প্রায় ৩টা ৫ মিনিট নাগাদ করজত-লোনাভালা ভোর ঘাট সেকশনের ঠাকুরওয়াড়ি এলাকায় প্রথম ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। কিছুক্ষণের মধ্যেই খান্ডালা ও মাঙ্কি হিলের মধ্যেও আর একটি ভূমিধস হয়। সেন্ট্রাল রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক স্বপ্নিল নীলা জানান, নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টির কারণে ভোর ঘাটের দুর্গম অংশে আপ, ডাউন এবং মধ্য— তিনটি লাইনই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঠাকুরওয়াড়ি ও মাঙ্কি হিল লুপ কেবিনের মধ্যবর্তী অংশে পাহাড়ধসের জেরে রেল চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সিএসএমটি-পুনে ইন্দ্রানী এক্সপ্রেস, ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস, ডেকান এক্সপ্রেস, ডেকান কুইন, প্রগতি এক্সপ্রেস, ধুলে এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। পুনে-সিএসএমটি সিংহগড় এক্সপ্রেসও বাতিল হয়েছে। অন্তত ১৬টি ট্রেন বাতিল এবং আরও ৯টি ট্রেনের রুট পরিবর্তন করা হয়েছে বলে রেল সূত্রে জানা গিয়েছে। বহু দূরপাল্লার ট্রেনকে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা অন্য রুটে ঘুরিয়ে চালানো হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত অংশে দ্রুত মেরামতির কাজ চলছে। তবে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় স্বাভাবিক পরিষেবা কবে ফিরবে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
পুনের পাশাপাশি প্রবল বর্ষণে বিপর্যস্ত মুম্বাই এবং সংলগ্ন থানে, রায়গড় ও পালঘর জেলাও। এসব অঞ্চলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বৃহন্মুম্বই পুরসভা জানিয়েছে, সোমবার দিনভর শহর ও শহরতলির বিস্তীর্ণ এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি চলবে। কিছু জায়গায় অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। নিচু এলাকা এবং জল জমার প্রবণতা রয়েছে এমন অঞ্চলের বাসিন্দাদের বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সমুদ্রে উচ্চ জোয়ারের আশঙ্কাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সোমবার বিকেলে ৪.০৮ মিটার এবং মঙ্গলবার ভোরে ৩.৪৪ মিটার উচ্চ জোয়ারের পূর্বাভাস রয়েছে বলে জানিয়েছে পুরসভা।
গত দু–দিনে মুম্বাইয়ে পৃথক দুটি গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনায় দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ৩০ জুন চলন্ত একটি স্কুলবাসের উপর গাছ উপড়ে পড়ায় প্রাণ হারায় ১১ বছরের এক ছাত্র। রবিবার মানখুর্দ এলাকায় একটি চাওল ভেঙে পড়ার ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে আরও ৬ জনের। সব মিলিয়ে বৃষ্টিজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় শুধু মুম্বই মহানগর অঞ্চলেই মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১০। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীস নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারের জন্য ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি দুর্গত এলাকাগুলিতে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধারকাজ চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। উদ্ধার ও ত্রাণকাজের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও রেলপথ দ্রুত সচল করার চেষ্টা চলছে। তবে আবহাওয়া দফতর আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়ায় আপাতত স্বস্তির কোনো ইঙ্গিত মিলছে না। বরং বর্ষার এই দাপটে মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অংশে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।
❤ Support Us







