Advertisement
  • এই মুহূর্তে বৈষয়িক
  • জুলাই ৬, ২০২৬

হিমাচলে চরম জলবায়ুর অভিঘাত ! ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে আপেল উৎপাদন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
হিমাচলে চরম জলবায়ুর অভিঘাত ! ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে আপেল উৎপাদন

হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ে এ বছর বরফ ঠিক সময়ে নামেনি। বসন্তেও বৃষ্টি এসেছে খামখেয়ালি ছন্দে। তারই মধ্যে বারবার শিলাবৃষ্টিআকস্মিক বন্যাভূমিধস এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা। প্রকৃতির এ ধারাবাহিক বৈরিতার জেরে দেশের অন্যতম বৃহৎ আপেল উৎপাদক রাজ্য হিমাচল প্রদেশে এ বছরের ফলন গত বছরের তুলনায় ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা। যার সরাসরি অভিঘাত পড়তে চলেছে রাজ্যের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আপেল অর্থনীতিতে। উদ্বেগে প্রায় আড়াই লক্ষ আপেলচাষি পরিবার।

হিমাচল সরকারের প্রাথমিক হিসাব বলছে২০২৫ সালে যেখানে আপেল উৎপাদন হয়েছিল ৬.৯৯ লক্ষ মেট্রিক টনসেখানে ২০২৬ সালে তা নেমে আসতে পারে ৪.৩৬ লক্ষ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ প্রায় ২.৬৩ লক্ষ মেট্রিক টন উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে। বাক্সের হিসাবে যা প্রায় ২.১৫ কোটি বাক্স। তবে চাষিদের দাবিপ্রকৃত উৎপাদন এরও অনেক কম হবে। তাঁদের অনুমানফলন নেমে আসতে পারে ১.৮ কোটি বাক্সেঅর্থাৎ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ হ্রাস

হিমাচলের উদ্যানপালন অধিকর্তা সতীশ কুমার জানান, ‘রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ১.১৬ লক্ষ হেক্টর জমিতে আপেল চাষ হয়। এটি রাজ্যের মোট ফলচাষের জমির প্রায় ৪৯ শতাংশ। মোট ফলচাষের আওতা ২.৩৭ লক্ষ হেক্টর। ২০২৫ সালে আপেল উৎপাদন হয়েছিল ৬.৯৯ লক্ষ মেট্রিক টন। চলতি মরসুমে তা কমে প্রায় ৪.৩৬ লক্ষ মেট্রিক টনে নেমে আসতে পারে বলে আমাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন।’ হিমাচলের টি পাহাড়ি জেলার কৃষি অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিই আপেল। সে শিল্প এখন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান অভিঘাতের সামনে অসহায়। পর্যাপ্ত শীতকালীন তুষারপাত হয়নি। বসন্তের শুরুতে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিও মেলেনি। বরং সময়ে-অসময়ে শিলাবৃষ্টিঅতিবৃষ্টি এবং তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা ফুল ও ফলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিকে ব্যাহত করেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতেআপেল গাছে পর্যাপ্ত ফুল ও ফল ধরার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে নিম্ন তাপমাত্রা অত্যন্ত জরুরি। সে প্রয়োজনীয় ঠান্ডার অভাব এ বছর স্পষ্ট।

উদ্যানপালন দফতরের পরিসংখ্যানই দেখাচ্ছেগত কয়েক বছরে আপেল উৎপাদনে অস্বাভাবিক ওঠানামা তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ মরসুমে উৎপাদন হয়েছিল ৩.৪৯ কোটি বাক্স। তার আগের বছর ২০২৪-২৫ সালে তা নেমে গিয়েছিল ২.৫১ কোটি বাক্সে। ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন ছিল ২.১১ কোটি বাক্স। আবার ২০২২-২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ৩.৩৬ কোটি বাক্স। ২০২১-২২ সালে ৩.০৫ কোটি এবং ২০২০-২১ সালে ২.৪০ কোটি বাক্স আপেল উৎপাদিত হয়েছিল। অর্থাৎ বছরভেদে উৎপাদনের তীব্র ওঠানামা এখন নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। তবে উৎপাদনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও আপেল চাষের বিস্তার থেমে নেই। স্বাধীনতার পর ১৯৫০-৫১ সালে যেখানে মাত্র ৪০০ হেক্টর জমিতে আপেল চাষ হতো, বর্তমানে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে  ১,১৬,৩৩৮ হেক্টরে। কিন্তু আয়তন বাড়লেও উৎপাদনের স্থায়িত্ব ক্রমশ কমছে। জলবায়ু পরিবর্তন সে বৃদ্ধিকে কার্যত নিষ্ফলা করে দিচ্ছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

শুধু আপেল নয়, ‘স্টোন ফ্রুট বা আঁটিযুক্ত ফল— যেমন খুবানিচেরিপিচ ও বরই ইত্যাদি উৎপাদনেও একই ছবি। বর্তমানে প্রায় ১৭,৩০৬ হেক্টর জমিতে এই ফলগুলির চাষ হয়। গত বছর উৎপাদন ছিল ২৪,৬২২ মেট্রিক টন। চলতি বছরে তা কমে প্রায় ২৩ হাজার মেট্রিক টনে নেমে আসতে পারে। হিমাচলের ‘ফ্রুটভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্লাওয়ার গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি হরিশ চৌহান সরকারের উৎপাদন অনুমান নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘সরকার বলছে উৎপাদন ৪০ শতাংশ কমবে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব ছবি তার থেকেও ভয়াবহ। আমাদের হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। সরকার যেখানে ২.১৫ কোটি বাক্সের কথা বলছেআমরা মনে করছি মোট উৎপাদন ১.৮ কোটি বাক্সের আশেপাশেই থাকবে।

তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেনমরসুমের শুরুতে উৎপাদনের নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া সহজ নয়। তাঁর মতে, ‘প্রাথমিক মূল্যায়নে সব সময় কিছু না কিছু তফাত থাকে। ফলের আকারআবহাওয়া এবং পরবর্তী বৃদ্ধির উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আমরা রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার চাষিদের সঙ্গে কথা বলে একটি অনুমান করি। সরকার তাদের উদ্যানপালন আধিকারিকদের রিপোর্টের ভিত্তিতে হিসাব তৈরি করে।’ তবে তাঁর দাবি, ‘এ বছরের ক্ষতির মূল কারণ প্রতিকূল আবহাওয়া। সময়ে বরফ পড়েনিবৃষ্টিও আসেনি। অধিকাংশ বাগানেই সেচের ব্যবস্থা নেই। ফলে আমরা পুরোপুরি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। পাহাড়ি অঞ্চলে দ্রুত ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প গড়ে না তুললে আগামী দিনে আপেল চাষ আরও সঙ্কটের মুখে পড়বে।’

তিনি আরও জানানআপেল গাছে ফল ধরার জন্য নির্দিষ্ট সময় ধরে ঠান্ডা আবহাওয়া অপরিহার্য। প্রচলিত জাতের আপেলের ক্ষেত্রে ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে ১,২০০ থেকে ১,৬০০ ঘণ্টা তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। আগাম ফলনশীল জাতের জন্য প্রয়োজন প্রায় ৬০০ ঘণ্টা। কিন্তু এ বছর সে প্রয়োজনীয় চিলিং আওয়ার’ মিলেনি। তার উপর শিলাবৃষ্টিতে বহু বাগানের ফল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।  শুধু উৎপাদন কমাই নয়বাড়ছে চাষের খরচও। কীটনাশকছত্রাকনাশকসারকৃষিযন্ত্র এবং শ্রমিকের মজুরি— সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। অথচ ফলন কমে যাওয়ায় আয়ও কমছে। ফলে আপেল চাষের লাভজনকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অনেক চাষির মতেএই অবস্থায় শুধুমাত্র আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে চাষ চালিয়ে যাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

উদ্যানপালন অধিকর্তা সতীশ কুমারও স্বীকার করেছেনউৎপাদন কমলে রাজ্যের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার আপেল অর্থনীতিও অনুপাতে সঙ্কুচিত হবে। তাঁর মতেবিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে রাজ্যে গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ১ থেকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। তার প্রভাব শুধু আপেল নয়অন্যান্য ফলচাষেও পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতেহিমাচলের আপেল চাষ এখন আর শুধু কৃষির বিষয় নয়এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব অভিঘাতের এক স্পষ্ট উদাহরণ। পাহাড়ে বরফ কমছেবৃষ্টির চরিত্র বদলাচ্ছেতাপমাত্রা বাড়ছেআর সে পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন মূল্য দিচ্ছেন বাগান মালিকেরা। আগামী দিনে সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণজল সংরক্ষণজলবায়ু-সহনশীল আপেল জাতের উন্নয়ন এবং কার্যকর শস্যবিমা ছাড়া এ সঙ্কট মোকাবিলা করা কঠিন বলেই মনে করছেন কৃষি ও উদ্যানপালন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!