Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুলাই ৭, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ সম্মান। কৌশলগত অংশীদারিত্বে জোর, প্রতিরক্ষা-বাণিজ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ সম্মান। কৌশলগত অংশীদারিত্বে জোর, প্রতিরক্ষা-বাণিজ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর

ইন্দোনেশিয়ার সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মঙ্গলবার জাকার্তার ইস্তানা মেরদেকা প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে আয়োজিত আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো তাঁর হাতে সে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান তুলে দেন। একই দিনে দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে প্রতিরক্ষাগুরুত্বপূর্ণ খনিজসামুদ্রিক নিরাপত্তাপ্রযুক্তিডিজিটাল সংযোগকৃষিস্বাস্থ্যমহাকাশনির্বাচন প্রযুক্তি এবং বাণিজ্য-সহ প্রায় এক ডজন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি একে ভারত-ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ের সূচনা’ বলে অভিহিত করেন।

বিনতাং রিপুবলিক ইন্দোনেশিয়া’ বা স্টার অব দ্য রিপাবলিক অব ইন্দোনেশিয়া’ দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান। ১৯৫৯ সালে প্রবর্তিত এ সম্মান বেসামরিক ও সামরিক— উভয় ক্ষেত্রেই সেই সব ব্যক্তিকে প্রদান করা হয়যাঁরা ইন্দোনেশিয়া রাষ্ট্রতার জনগণজাতীয় ঐক্যসার্বভৌমত্বধারাবাহিকতা এবং সমৃদ্ধির জন্য অসামান্য অবদান রেখেছেন। বিদেশি রাষ্ট্রনেতাদের ক্ষেত্রেও এটি অত্যন্ত বিরল মর্যাদার স্বীকৃতি। সম্মান গ্রহণের আগে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ইস্তানা মেরদেকায় পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার ও জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হয়। পরে তিনি প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন

ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেনপ্রধানমন্ত্রীকে জাকার্তার প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে যে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছেতা ভারত-ইন্দোনেশিয়া সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাঁর কথায়এ সফর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার পথ খুলে দেবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থাঅভিন্ন মূল্যবোধ ও বন্ধুত্বকে আরও দৃঢ় করবে।

তিন দেশের সফরের প্রথম পর্যায়ে ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী মোদি। এ সফরের পরবর্তী গন্তব্য অস্ট্রেলিয়া  নিউজিল্যান্ড। সফরে রওনা হওয়ার আগে নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলে, তাঁর এ সফরের লক্ষ্য ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি, ‘মহাসাগর’ ভাবনা এবং উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দাবিকে আরও শক্তিশালী করা। তিনি আরও বলেছেন, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’-এ উন্নীত করার পর এটিই তাঁর প্রথম ইন্দোনেশিয়া সফর। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রধান অতিথি হিসেবে প্রেসিডেন্ট সুবিয়ান্তোর নয়াদিল্লি সফরের পর এ সফর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

রাষ্ট্রীয় সম্মান গ্রহণের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী মোদি মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়ার সংসদের যৌথ অধিবেশনেও ভাষণ দেন। প্রেসিডেন্ট সুবিয়ান্তোমন্ত্রিসভার সদস্য  সাংসদদের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘ভারতের লক্ষ্য উন্নয়নসম্প্রসারণবাদ নয়।’ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং দক্ষিণ চিন সাগরে চিনের সম্প্রসারণবাদী কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগের আবহে তাঁর এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে ভাষণে নরেন্দ্র মোদি বলেনভারত একটি মুক্তউন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দৃঢ় সমর্থক। ভারত সমুদ্রপথে অবাধ নৌ-চলাচলের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। তিনি আরও বলেনভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সম্মিলিত অগ্রযাত্রা শুধু দুদেশের নাগরিকদের জন্যই নয়সমগ্র বিশ্বের কাছেও গণতন্ত্রের শক্তির নতুন উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের ১৪০ কোটি এবং ইন্দোনেশিয়ার ২৯ কোটি মানুষের যৌথ উদ্যোগ ইতিহাস সৃষ্টি করতে সক্ষম বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন১৯৫৫ সালের বান্দুং সম্মেলন’-এ ভারত ও ইন্দোনেশিয়া একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সদ্য স্বাধীন এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯টি দেশের নেতাদের সে সম্মেলনই পরবর্তীকালে নিরপেক্ষ জোট আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তিনি বলেনদুই দেশের সামনে এখনো অসংখ্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত রয়েছে। মোদির মতে,  ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার কাছে সমুদ্র কখনো দূরত্বের প্রতীক নয়, বরং দুদেশের মধ্যে সংযোগের সেতু হিসেবেই কাজ করে চলেছে। ভারতইন্দোনেশিয়া এবং ভারত মহাসাগরের নামের মধ্যেই দুদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতিফলন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। গণতন্ত্রের মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেনভারত ও ইন্দোনেশিয়া একসঙ্গে দাঁড়ালে বিশ্ব আরও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে যে গণতন্ত্র সুযোগ সৃষ্টি করেআস্থা গড়ে তোলেভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করে।

তিনি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় দুই দেশের বিদ্যমান যৌথ কর্মপ্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করে বলেনসাইবার হুমকিসন্ত্রাসে অর্থায়ন, উগ্রপন্থা রুখতে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আর বিলম্বিত করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন। এদিন, রাষ্ট্রীয় বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে যে সমঝোতাগুলি স্বাক্ষরিত হয়েছেতার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ভারতের তৈরি ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রায় ২০ কোটি মার্কিন ডলারের এ চুক্তির মাধ্যমে ফিলিপিন্স ও ভিয়েতনামের পর ইন্দোনেশিয়া হবে তৃতীয় দেশযেখানে ব্রহ্মোস রফতানি করবে ভারত।

সূত্রের খবর, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ সফল ব্যবহারের পর ভারতের তৈরি অস্ত্রা’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার সিদ্ধান্তও নিয়েছে জাকার্তা। প্রতিরক্ষা চুক্তিতে শুধু অস্ত্র কেনাবেচাই নয়যৌথ উৎপাদনপ্রযুক্তি হস্তান্তর আর প্রতিরক্ষা শিল্পে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানির ক্ষেত্রে এটিকে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক ও কৌশলগত সাফল্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারিত্ব আজ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। উন্নয়ননিরাপত্তাপ্রযুক্তিসংস্কৃতি এবং শিক্ষা— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেছে। তাঁর কথায়, ‘আমি নিশ্চিতআজ থেকেই ভারত-ইন্দোনেশিয়া অংশীদারিত্বের এক সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হলো।’

তিনি জানানপ্রতিরক্ষা বিনিময়দুর্যোগ মোকাবিলাপ্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে। পাশাপাশি ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে উভয়  দেশের কোস্ট গার্ড সংস্থাগুলিও একসঙ্গে কাজ করবে। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোও বলেনভারত ও ইন্দোনেশিয়া এমন একটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল চায়যা উন্মুক্তস্বচ্ছ  আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক শৃঙ্খলার উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বড়ো অগ্রগতি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে যৌথ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারতের বিনিয়োগে ইন্দোনেশিয়ার ইস্পাতনিকেল   বিরল মৃত্তিকা চুম্বক উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি এবং উন্নত উৎপাদন শিল্পে প্রয়োজনীয় কৌশলগত খনিজের বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ চুক্তি ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এ ছাড়া মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত অবস্থানে থাকা সাবাং বন্দর যৌথভাবে উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুই দেশ। ভারতের গ্রেট নিকোবর প্রকল্প’-এর খুব কাছাকাছি অবস্থিত এ বন্দর ভবিষ্যতে ভারত-ইন্দোনেশিয়া সামুদ্রিক সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি’,  সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বন্দর উন্নয়নেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রযুক্তি ও শিক্ষা ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট বেঙ্গালুরু ইন্দোনেশিয়ায় একটি ক্যাম্পাস স্থাপন করবে। ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই)-কে ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করা হবেযাতে সীমান্ত পেরিয়ে লেনদেন আর ভ্রমণ আরও সহজ হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেনএ উদ্যোগ ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের যাতায়াতকেও আরও সুবিধাজনক করে তুলবে।

জানা যাচ্ছে, দুই দেশের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে নির্বাচন প্রযুক্তিমানবসম্পদ উন্নয়নসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বোত্তম নির্বাচন পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী  কাস্টমাইজড ইভিএম রফতানির সম্ভাবনাও সহযোগিতার আওতায় রাখা হয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও দুই নেতার মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেবর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্ব আগের যেকোনো  সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারত এখনও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে এবং স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে তার সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!