Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৭, ২০২৬

প্রবল বৃষ্টিতে কেরালার টানেল প্রকল্পে ধস! বহু শ্রমিকের চাপা পড়ার আশঙ্কা, রাতভর উদ্ধার অভিযানে উদ্ধার ৩

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
প্রবল বৃষ্টিতে কেরালার টানেল প্রকল্পে ধস! বহু শ্রমিকের চাপা পড়ার আশঙ্কা, রাতভর উদ্ধার অভিযানে উদ্ধার ৩

কেরালার ওয়েনাড়ে ফের পাহাড়ধসের আতঙ্ক। মঙ্গলবার মেপ্পাডির কাছে কল্লাডিতে নির্মীয়মাণ টানেল সড়ক প্রকল্পের নির্মাণস্থলে বড়ো ধরনের ভূমিধসে ধ্বংসস্তূপের নীচে একাধিক শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দা আটকে পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। ইতিমধ্যে তিন জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। দমকল, পুলিশ এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-এর যৌথ বাহিনী যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। প্রবল বর্ষণের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে সম্ভাব্য আটকে পড়াদের খোঁজ চলছে। ২০২৪ সালের বিধ্বংসী ওয়েনাড় ভূমিধসের স্মৃতি এখনো টাটকা। তারই মধ্যে ফের এ দুর্ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে ওয়েনাড় জেলার মেপ্পাডির মিনাক্ষী সেতুর কাছে আচমকাই ধসে পড়ে পাহাড়ের একাংশ। ওই এলাকাতেই মালাপ্পুরম ও ওয়েনাড় জেলাকে যুক্ত করার লক্ষ্যে নির্মীয়মাণ আনাক্কোমপয়িল-মেপ্পাডি টানেল সড়ক প্রকল্পের কাজ চলছিল। ভূমিধসের অভিঘাতে প্রকল্পের নির্মাণস্থলের বিস্তীর্ণ অংশ মাটি, পাথর ও গাছের নীচে চাপা পড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েক জন শ্রমিক ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে পড়েছেন। পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি বাড়ি ও হোমস্টেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কালপেট্টা থেকে দমকল ও উদ্ধারকারী বাহিনীর একাধিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। পরে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় পুলিশ এবং এনডিআরএফ-এর বিশেষ দল। তবে সরকারি উদ্ধারকারী বাহিনী পৌঁছনোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা অসাধারণ তৎপরতার পরিচয় দিয়ে ধ্বংসস্তূপের নীচ থেকে তিন জনকে উদ্ধার করেন। তাঁদের দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা টানেল প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য তৈরি অস্থায়ী আবাসনে থাকতেন বলে প্রশাসন জানিয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শ্রমিকদের থাকার জায়গার পাশাপাশি কয়েকটি বসতবাড়ি ও হোমস্টেও রয়েছে। ফলে কেবল প্রকল্পের কর্মীরাই নন, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের অনুমান, ধ্বংসস্তূপের নীচে আরও কয়েক জন আটকে থাকতে পারেন। সে সম্ভাবনা মাথায় রেখেই ভারী যন্ত্রপাতি, উদ্ধার সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করা হয়েছে।

ভূমিধসে প্রকল্পে ব্যবহৃত একাধিক গাড়িও মাটির নীচে চাপা পড়েছে। শ্রমিকদের নির্মাণস্থলে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত কয়েকটি যানবাহন সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। প্রকল্পের যন্ত্রপাতি, নির্মাণ অবকাঠামোরও কতটা ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না বলে প্রশাসনের বক্তব্য। সরকারি সূত্রের খবর, প্রবল বৃষ্টির কারণে সোমবার থেকেই নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় প্রায় ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, অতি ভারী বর্ষণই পাহাড়ধসের অন্যতম কারণ। তবে চূড়ান্ত কারণ নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষা চালানো হবে। আবহাওয়ার প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে উদ্ধার অভিযানও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হচ্ছে।

ওয়েনাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী টি. সিদ্দিক এবং জেলার জেলাশাসক ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজের তদারকি করছেন। রাজ্য প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি এলাকা খুঁটিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, দমকল, পুলিশ এবং এনডিআরএফ-এর মধ্যে সমন্বয় রেখে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ভূমিধসের ঘটনার পর কেরলার মুখ্যমন্ত্রী জরুরি বৈঠক করেন। বৈঠকে পরিস্থিতির পর্যালোচনা করে উদ্ধার অভিযান দ্রুততর করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, রাজস্বমন্ত্রী এ. পি. অনিল কুমারকেও অবিলম্বে ওয়েনাড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে উদ্ধার, ত্রাণ এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের কাজ আরও জোরদার করা যায়। দুই মন্ত্রী ঘটনাস্থলে পৌঁছে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।

যে প্রকল্পের নির্মাণস্থলে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটি উত্তর কেরলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত। আনাক্কোমপয়িল-মেপ্পাডি তথা কোঝিকোড়-ওয়েনাড় যমজ টানেল প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ২,১৩৪ কোটি টাকা। মোট ৮.৭৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের এই সড়কের মধ্যে ৮.১১ কিলোমিটার অংশ হবে যমজ টানেল। পশ্চিমঘাটের পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল ভেদ করে নির্মিত ওই টানেল সম্পূর্ণ হলে ওয়েনাড়, মালাপ্পুরম, কোঝিকোড় এবং বেঙ্গালুরুর মধ্যে সড়ক যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে চারটি ঘাট সড়কের উপর নির্ভর করেই ওয়েনাড়ের সঙ্গে কেরলার বাকি অংশের যোগাযোগ বজায় থাকে। নতুন টানেল চালু হলে বর্ষাকালেও সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সরকারের দাবি। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে কনকন রেলওয়ে কর্পোরেশন। যমজ টানেলের মূল নির্মাণকাজ করছে ভোপালের ‘দিলীপ বিল্ডকন’ এবং সংযোগকারী সড়ক ও সেতুর নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে কলকাতার ‘রয়্যাল কনস্ট্রাক্ট’। চার বছরের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তবে প্রকল্পটি শুরু থেকেই পরিবেশগত কারণে বিতর্কের কেন্দ্রে। পশ্চিমঘাটের ভঙ্গুর পাহাড়ি অঞ্চলে বিস্ফোরণের মাধ্যমে সুড়ঙ্গ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে পরিবেশবিদদের একাংশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সে কারণেই কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ প্রকল্প সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি প্রথমে প্রকল্পটির পরিবেশগত ছাড়পত্রের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখেছিল। পরে কেরালা সরকারের জমা দেওয়া ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা, ভূমিধসের ঝুঁকি এবং জলনিকাশি সংক্রান্ত রিপোর্ট খতিয়ে দেখে একাধিক শর্তসাপেক্ষে পরিবেশগত ছাড়পত্রের সুপারিশ করা হয়। এ দিনের দুর্ঘটনা সে বিতর্ককেও নতুন করে উসকে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পশ্চিমঘাটের মতো অতি সংবেদনশীল পাহাড়ি অঞ্চলে যে কোনো বড়ো পরিকাঠামো প্রকল্পে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি, অতিবৃষ্টি ও ভূমিধসের সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

দুর্ঘটনা ঘটনাস্থলটি চুরালমালা থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রবল বর্ষণের জেরে ওয়েনাড়ের মেপ্পাডি, চুরালমালা এবং মুন্ডাক্কাই এলাকায় একের পর এক পাহাড়ধসে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান, একাধিক গ্রাম কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সে বিপর্যয় কেরালার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ ভূমিধস হিসেবে চিহ্নিত। মাত্র দু-বছরের ব্যবধানে একই অঞ্চলে ফের ভূমিধসের ঘটনা ঘটায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রবল বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় উদ্ধারকাজও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে চলছে। ধ্বংসস্তূপের নীচে আর কেউ জীবিত আটকে রয়েছেন কি না, তা জানতে প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এলাকাটি সম্পূর্ণ ঘিরে রাখা হবে। পরিস্থিতির উপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!