Advertisement
  • বি। দে । শ
  • জুলাই ১০, ২০২৬

অবিরাম বৃষ্টি-পাহাড় ধসে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, বাড়ছে মৃত্যুমিছিল। জলবন্দি চট্টগ্রাম-টেকনাফ-কক্সবাজারে জারি ‘লাল সতর্কতা’

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অবিরাম বৃষ্টি-পাহাড় ধসে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ, বাড়ছে মৃত্যুমিছিল। জলবন্দি চট্টগ্রাম-টেকনাফ-কক্সবাজারে জারি ‘লাল সতর্কতা’

সক্রিয় ঘূর্ণাবর্ত। টানা কয়েক দিনের অতি ভারী বৃষ্টিতে বন্যা পরিস্থিতি, পাহাড় ধসের বিপর্যস্ত বাংলাদেশের বিস্তৃত এলাকা।  দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম, বান্দারবান, টেকনাফ, কক্সবাজার-সহ একাধিক এলাকায় পাহাড়ধসআকস্মিক বন্যা ও ভূমিক্ষয়ের ঘটনায় বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা। প্রশাসনউদ্ধারকারী সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠনগুলির হিসাব অনুযায়ীগত কয়েক দিনে দুর্যোগের কবলে পড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগযেখানে পাহাড়ধসে অন্তত ৩০ জনের প্রাণহানির খবর মিলেছে।

পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা কাদামাটি ও পাথরের স্রোতে মুহূর্তে মাটির নীচে চাপা পড়ে  গেছে  কক্সবাজারের  রোহিঙ্গা শিবিরগুলি ও বহু ঘরবাড়ি। বিপর্যয়ের নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে বান্দরবান ও কক্সবাজারে। বান্দরবানের লামা উপজেলায় পৃথক দুটি পাহাড়ধসের ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে চার বছরের এক শিশুও। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে,  বুধবার গভীর রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি চলছিল লামা এলাকায়। ভোররাতের দিকে আচমকাই ধসে পড়ে পাহাড়ের একাংশ। একই সময়ে কক্সবাজারের কাটাপাহাড়ি গ্রামেও নেমে আসে বিপর্যয়। পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারায় দুই শিশু শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন আরও এক তরুণী। প্রশাসনের তরফে ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া দফতর জানিয়েছেদেশের উপর সক্রিয় রয়েছে মৌসুমি বায়ু। তার উপর  ঘনীভূত হয়েছে ঘূর্ণাবর্ত। ফলে, আবহাওয়া যুগল প্রভাবে আগামী কয়েক দিনও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত চলবে। ইতিমধ্যেই চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ২১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের আশঙ্কাপরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা আপাতত নেই। খুলনাবরিশালচট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে আরও প্রবল বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই, টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারবান্দরবানখাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটির বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন। বহু গ্রামে বিদ্যুৎ নেইবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মোবাইল যোগাযোগও। নদনদীর জলস্তর বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গিয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। কয়েক হাজার হেক্টর জমির আমন ধানসবজিখেত এবং বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। বহু পরিবার ঘরছাড়া হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ত্রাণশিবিরে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গুলিতে। পাহাড় কেটে তৈরি অস্থায়ী বসতিগুলি প্রবল বর্ষণে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছেগত ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে শিবিরগুলিতে অন্তত ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। তাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৫ জন। আশ্রয়হীন হয়েছেন চার হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২৬ হাজার শরণার্থী। ফলে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলিতে আতঙ্কের আবহ স্পষ্ট। অনেকেরই অভিযোগ, মায়ানমারের নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও দুর্যোগের হাত থেকে রেহাই মিলছে না। বর্ষায় পাহাড়ধসশুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ড এবং সারা বছর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে তাঁদের।

বর্তমানে, বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শিবিরে ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বাস। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই পাহাড়ের ঢালে বা কেটে তৈরি করা বসতিতে থাকেন। ফলে প্রবল বর্ষণে বিপদের আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। ইতিমধ্যেই শতাধিক পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্থানীয় স্কুল ও বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁদের অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে। বান্দরবানে ২২০টিরও বেশি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে প্রায় দেড় হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশাসনের তরফে ত্রাণসামগ্রীবিশুদ্ধ পানীয় জল এবং শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বহু নদীর জল বিপৎসীমার উপর দিয়ে বইতে থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও বহু গ্রাম জলমগ্ন। বিভিন্ন সড়কে ধস নামায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। রাঙামাটিতে চার হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন।

উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশেও পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। সুনামগঞ্জমৌলভীবাজারহবিগঞ্জকিশোরগঞ্জ-সহ একাধিক জেলায় নদীর জল দ্রুত বাড়ছে। কোথাও বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে জল ঢুকেছেকোথাও আবার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নওগাঁ শহর কার্যত জলের তলায়। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস বলছেআগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতির সম্ভাবনা নেই। বরং আরও ভারী বৃষ্টির জেরে নতুন করে পাহাড়ধসআকস্মিক বন্যা এবং নদীভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দুর্যোগের ছায়া আরও গাঢ় হওয়ার আশঙ্কাই দেখছেন তারেক রহমানের প্রশাসন ও আবহাওয়াবিদেরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!