- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১০, ২০২৬
সুড়ঙ্গ খননে সফল ‘দুর্গা’! জোকা-এসপ্ল্যানেড ‘পার্পল লাইন’ মেট্রোর কাজে নতুন গতি
দক্ষিণ কলকাতাকে শহরের প্রাণকেন্দ্রের সঙ্গে মেট্রোপথে জুড়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছে জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো প্রকল্প। সে পথে আরও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সাক্ষী থাকল শহর। শুক্রবার জোকা-এসপ্ল্যানেড করিডরের ভূগর্ভস্থ অংশে সুড়ঙ্গ খননের কাজে ব্যবহৃত টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) ‘দুর্গা’-র কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের মতে, সবচেয়ে জটিল ও প্রযুক্তিনির্ভর পর্যায়গুলির একটির সফল সমাপ্তি ঘটায় এখন বাকি কাজ দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ অনেকটাই প্রশস্ত হলো। ফলে, বহু প্রতীক্ষিত ‘পার্পল লাইন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথকে আরও মসৃণ করে দিল।
জোকা-এসপ্ল্যানেড মেট্রো করিডর কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহণ প্রকল্প। দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে শহরের কেন্দ্রস্থলকে দ্রুত ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। ইতিমধ্যেই জোকা থেকে মাঝেরহাট পর্যন্ত মেট্রো পরিষেবা চালু হয়েছে। তবে প্রকল্পের সবচেয়ে কঠিন ও প্রযুক্তিনির্ভর অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে খিদিরপুর থেকে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নির্মাণ। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, ভূগর্ভস্থ পরিকাঠামো ও নানাবিধ প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের কারণে এ অংশে কাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছে। সে কারণেই এ পর্যায়ে টানেল বোরিং মেশিনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নির্মাণে টিবিএম-ই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম হিসেবে বিবেচিত হয়।
মেট্রো রেলের তথ্য অনুযায়ী, খিদিরপুর থেকে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১০ জুলাই। প্রায় এক বছর ধরে চলা সেই কর্মযজ্ঞে নির্ধারিত সুড়ঙ্গপথ সফল ভাবে অতিক্রম করেছে ‘দুর্গা’। প্রায় ১.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ সফল ভাবে সম্পূর্ণ করেছে এই টিবিএম। ফলে, মেট্রো রেলের শীর্ষ আধিকারিকেরা, প্রকৌশলী ও নির্মাণকারী সংস্থাগুলির প্রতিনিধিদের মধ্যে এদিন উদযাপনের আবহ। মেট্রো রেলের জেনারেল ম্যানেজার প্রেমসাগর গুপ্ত এই সাফল্যকে ‘মাইলস্টোন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি শুধু প্রকল্পের অগ্রগতি নয়, কলকাতার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতারও বড়ো প্রমাণ।
তাঁর আশা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই অপর টিবিএম ‘দিব্যা’-ও নিজের কাজ সম্পূর্ণ করবে। পাশাপাশি ভূগর্ভে কর্মরত শ্রমিক ও প্রকৌশলীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সমস্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। খিদিরপুর থেকে পার্ক স্ট্রিট পর্যন্ত ২.৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যুগ্ম টিউব টানেল নির্মাণের দায়িত্বে রয়েছে দুটি টিবিএম— ‘দুর্গা’ এবং ‘দিব্যা’। আপ লাইনে, অর্থাৎ পার্ক স্ট্রিটমুখী সুড়ঙ্গ খননের দায়িত্বে রয়েছে ‘দুর্গা’। অন্য দিকে ডাউন লাইনে, জোকামুখী সুড়ঙ্গ নির্মাণের কাজ করছে ‘দিব্যা’। ‘দুর্গা’-র ব্রেকথ্রুর মাধ্যমে প্রকল্পের অন্যতম কঠিন ধাপ সম্পূর্ণ হল বলে মনে করছে মেট্রো কর্তৃপক্ষ। এখন সকলের নজর ‘দিব্যা’-র দিকে।
প্রায় ৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৬৫০ টন ওজনের ‘দুর্গা’ তৈরি হয়েছে চেন্নাইয়ে। আধুনিক ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নির্মাণে ব্যবহৃত এই টানেল বোরিং মেশিনকে প্রকৌশল প্রযুক্তির অন্যতম বিস্ময় বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা। সুড়ঙ্গ খননের পাশাপাশি মাটির চাপ সামলানো, দেওয়াল সুরক্ষিত রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো একাধিক জটিল কাজ একসঙ্গেই সম্পন্ন করে এই যন্ত্র। এ সাফল্যের গুরুত্ব আরও বেশি কারণ কলকাতার মেট্রো নির্মাণের ইতিহাসে অতীতে একাধিকবার বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে প্রকৌশলীদের। বিশেষ করে বউবাজার এলাকায় ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর সুড়ঙ্গ খননের সময় বারবার ধস, জল প্রবেশ ও বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। সে অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে ফোর্ট উইলিয়াম, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং পুলিশ ট্রেনিং স্কুলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণ ঘিরেও ছিল আশঙ্কা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কোনো রকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই কাজ সম্পন্ন হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সকলে।
মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, জোকা-এসপ্ল্যানেড করিডর সম্পূর্ণ চালু হলে দক্ষিণ কলকাতা এবং শহরের কেন্দ্রীয় ব্যবসায়িক এলাকার মধ্যে যাতায়াতের চিত্র আমূল বদলে যাবে। প্রতিদিনের যানজট কমবে, যাত্রীদের সময় বাঁচবে এবং গণপরিবহণ ব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে। বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবার রোড এবং শহরের দক্ষিণাংশ থেকে এসপ্ল্যানেডমুখী যাত্রীদের জন্য এই করিডর হয়ে উঠতে পারে অন্যতম ভরসার পরিবহণ ব্যবস্থা। কয়েক লক্ষ যাত্রী সরাসরি উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
❤ Support Us








