- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১১, ২০২৬
প্রবল বৃষ্টিতে হিমাচল, উত্তরাখণ্ডে ধস, যোগাযোগ বিছিন্ন। বন্যা পরিস্থিতির সঙ্গে লড়ছে ত্রিপুরা-অসম-মিজোরাম
বিগত কয়েক দিনে উত্তর-থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম দেশের একাধিক রাজ্য প্রবল বৃষ্টি, বন্যা পরিস্থিতি, ভূমি ও পাহাড় ধসে বিপর্যস্ত। মহারাষ্ট্র, গুজরাট, রাজস্থান, ত্রিপুরা, অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম-সহ বিভিন্ন রাজ্যে বহু প্রাণহানির ঘটনা সামনে এসেছে, চাষের জমি ভেসে গেছে, বাস্তুচ্যূত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এই মুহূর্তে ভয়াবহ দুর্যোগের সঙ্গে লড়ছে রাজ্যগুলি। এরইমধ্যে হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ডে ভূমিধসে বহু ব্রিজ, রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত নতুন করে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। দুই রাজ্যের বহু জেলার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
হিমাচল প্রদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির কারণে বহু এলাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ব্যবহত। ভূমি ধসের কারণে অবরুদ্ধ সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক ব্রিজ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা দল ও রাজ্য প্রশাসন। অনির্দিষ্ট কালের বন্ধ রাখা হয়েছে অনেক স্কুল-কলেজ। কুল্লু জেলায় বুয়ান্ডা-ছোয়াই সড়কে পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া পাথরের আঘাতে ৭০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। সোলান জেলার আরকি এলাকায় একটি গাড়ির ওপর পাথর পড়ায় দু-জন আহত হয়েছেন। সিমলায় ২৭টি সংযোগকারী সড়ক যান চলাচলের জন্য বন্ধ থাকায় যাত্রীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কালকা-সিমলা জাতীয় সড়ক, ওয়াকনাঘাট ও কান্ডাঘাটের মধ্যে এবং ধরমপুর ও চাক্কি মোড়ের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে পাথর ধসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্নর জেলার সাংলা সেতুর ওপর ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত বছর বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় নির্মিত সেতুটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাংলা উপত্যকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে সিরমৌর ও সোলান জেলায় সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। উত্তরাখণ্ডেও গত ২৪ ঘণ্টায় প্রবল বৃষ্টির জেরে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে, কয়েকজন আহত হয়েছেন। ভারী বর্ষণের ফলে ভূমিধস নেমে যমুনোত্রী জাতীয় সড়ক-সহ ১১৮টি সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবহাওয়া দফতরের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের পর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। উত্তরকাশী জেলার স্যানাচট্টির কাছে যমুনোত্রী জাতীয় সড়কের প্রায় ১০০ মিটার অংশ ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে মেরামতির কাজ চলছে। নাগুন ও নালু পানিতে পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়ায় গঙ্গোত্রী জাতীয় সড়কে বারবার যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। অবিরাম বৃষ্টির কারণে গঙ্গা, যমুনা এবং তাদের উপনদীগুলির পাশাপাশি একাধিক ছোটো পাহাড়ি নদীর জলস্তরও বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টির জেরে আকস্মিক বন্যায় জম্মু ও কাশ্মীরের পুঞ্চ জেলার মেন্ধর উপ-বিভাগের আরি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে বহু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু মানুষ আটকে পড়েছেন। পুলিশ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে অন্তত ২৫ জনকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
একদিকে উত্তরের পাহাড়ে যখন ভূমিধসের তাণ্ডব চলছে, দেশের অন্য প্রান্ত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিজোরামের লুংলেই জেলায় গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে খাওথলাংতুইপুই নদীর জল উপচে পড়ায় ৮০টিরও বেশি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। রাজ্যের ২৯টিরও বেশি স্থানে ভূমিধস, পাথর ধস এবং বৃষ্টিজনিত অন্যান্য ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। তবে এ পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। লুংলেই জেলার বুয়ালতে গ্রামের উপকণ্ঠে বিশাল ভূমিধসের কারণে জাতীয় সড়ক ৫৪ অবরুদ্ধ। এর ফলে গত চার দিন ধরে বেশ কয়েকজন পর্যটক সেখানে আটকে রয়েছেন বলে জানা গেছে। ভূমিধসের কারণে রাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলের লংতলাই ও সিয়াহা জেলাগুলির সঙ্গে বাকি রাজ্যের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। আইজল-থেনজাওল-লুংলেই মহাসড়কও আইজলের দক্ষিণ প্রান্তের নগাইজেল এলাকায় বড়ো ধরনের পাথর ধস ও ভূমিধস ঘটেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকায় এই মুহূর্তে বন্যা পরিস্থিতি। বন্যায় প্লাবিত হয়েছে ঊনকোটি, ধলাই এবং খোয়াই জেলা। ৪ হাজারেও বেশি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত। প্রায় ১১ হাজার মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। এখনো পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ এখনো না দেখা যাওয়ায়, আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে মনু নদী বিপদ সীমার উপরে বইছে । ফলে নিম্নবর্তী এলাকাগুলি নতুন করে প্লাবিত হতে পারে। খোয়াইয়ে বহু জায়গায় ধস নেমেছে। প্রশাসন সূত্রে খবর, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ঊনকোটি জেলা। তার পরেই খোয়াই এবং ধলাই জেলা। ঊনকোটিতে ৩৫টি ত্রাণশিবির তৈরি করা হয়েছে। খোয়াইয়ে ২৪টি ও ধলাইয়ে ২০টি শিবির গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও উত্তর ত্রিপুরায় শিবির তৈরি করা হয়েছে।
অরুণাচল প্রদেশেও গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিম কামেং, আপার সুবনসিরি এবং তিরাপ— তিন জেলায় বাড়িঘর, সড়ক এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাপুম পারে জেলায় নিখোঁজ এক মহিলার দেহ উদ্ধার হওয়ার পর অরুণাচল প্রদেশে চলতি বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৮। জাতীয় আবহাওয়া দফতরের আগামী কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের পর অসমের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ রাজ্যের মানুষকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। এই পূর্বাভাসে গুয়াহাটি-সহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় শুক্রবার থেকে কয়েক দিন ধরে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। শুক্রবার প্রকাশিত ‘আইএমডি’র বুলেটিনে বলা হয়েছে, ১০ থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে অরুণাচল প্রদেশ, অসম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম এবং ত্রিপুরায় মোটামুটি বিস্তৃত থেকে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ৬–৭ দিন মধ্য ও দক্ষিণ উপদ্বীপীয় ভারতে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, মহারাষ্ট্র, গুজরাট সহ দেশের পশ্চিম প্রান্তের রাজ্যগুলিতে ব্যাপক দুর্যোগ চলছে। জলমগ্ন সুরাট, আমেদাবাদ, পুণে, মুম্বাই সহ মহানগরীগুলি। বহু প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও সামনে এসেছে। গুজরাট সরকার সুরাটে বৃহৎ পরিসরে ত্রাণ ও পুনর্বাসন অভিযান শুরু করেছে বলে শুক্রবার রাজ্য সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। হরিয়ানা ও পাঞ্জাবের বিভিন্ন এলাকাতেও বৃষ্টি হয়েছে। চণ্ডীগড়ে দিনের বেলায় হালকা বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কেরালার ওয়েনাড় ভূমিধসের ঘটনাস্থল থেকে আরও এক শ্রমিকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭। উত্তর প্রদেশে বৃষ্টি-সংক্রান্ত ঘটনায় দু-জনের মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়া দফতর -এর মতে, উত্তর প্রদেশের মধ্যাঞ্চলের ওপর একটি ঊর্ধ্ববায়ু ঘূর্ণাবর্ত এবং উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশের ওপর একটি সুস্পষ্ট নিম্নচাপ অবস্থান করায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয় হয়েছে। দিল্লিতে টানা দু-দিনের অবিরাম বৃষ্টির পর শুক্রবার আকাশ পরিষ্কার ছিল। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে দিল্লিতে শুষ্ক ও তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া বজায় থাকবে এবং মাসের পরবর্তী সময়ে আবার মৌসুমি বৃষ্টি সক্রিয় হবে। রাজস্থানের আবহাওয়া দফতরও জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে রাজ্যে মৌসুমি বায়ু দুর্বল হতে শুরু করবে, যার ফলে চলমান ভারী বৃষ্টির পর্বে বিরতি আসবে।
১০-১১ জুলাই থেকে একাধিক রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় দুর্বল মৌসুমি পরিস্থিতি বিরাজ করবে। তা প্রায় এক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। এ সময়ে রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকবে, যদিও বিচ্ছিন্ন কয়েকটি স্থানে হালকা বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। গত কয়েকদিনে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কোচবিহারে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বাধিক ১৪৩ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
❤ Support Us







