- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ১১, ২০২৬
নিউজিল্যান্ড সফরেও প্রধানমন্ত্রী মোদির নজরে ইন্দো-প্যাসিফিক, কৌশলগত অংশীদারিত্বে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সুরক্ষায় সিলমোহর
দীর্ঘ চার দশকের ব্যবধান পেরিয়ে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে পা রাখলেন ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী। আর সেই ঐতিহাসিক সফরেই ভারত-নিউজিল্যান্ড সম্পর্ক পেল নতুন মাত্রা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সনের বৈঠকের পরে দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এ উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে ঐকমত্য হয়েছে।
শনিবার অকল্যান্ডের গভর্নমেন্ট হাউসে মোদীকে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাগত জানানো হয় নিউজিল্যান্ডের মূলনিবাসী মাওরি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘পাওহিরি’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। কূটনৈতিক মহলের মতে, এ অভ্যর্থনা দু-দেশের সম্পর্কের গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে। মোদির এ সফরকে কেন্দ্র করে নিউজিল্যান্ড সরকার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। প্রায় ২৭ বছর পরে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এমন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় অস্ট্রেলিয়া থেকে বিশেষ বিমান ‘ইন্ডিয়া ওয়ান’-এ অকল্যান্ডে পৌঁছন প্রধানমন্ত্রী মোদি। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে প্রথাগত প্রোটোকল ভেঙে উপস্থিত ছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, এ সফরের মূল লক্ষ্য দু-দেশের কৌশলগত সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করা এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা। শীর্ষ বৈঠকের শুরুতেই মোদি বলেন, ভারত এবং নিউজিল্যান্ড ‘স্বাভাবিক মিত্র’। এই বন্ধুত্বকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই দুই দেশের লক্ষ্য বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী মোদির নিউজিল্যান্ড সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে দু-দেশের অবস্থান স্পষ্ট করা। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সহযোগিতার পিছনে রয়েছে সমুদ্র অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং কৌশলগত সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ। ভারত ও নিউজিল্যান্ড উভয়েই প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা, অবাধ নৌচলাচল এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রী একটি মুক্ত, উন্মুক্ত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক গড়ে তোলার বিষয়ে তাঁদের যৌথ অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক সহযোগিতা আরও বাড়াতে একটি নতুন সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংলাপ চালু করা হবে। এর মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান, সমন্বয় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দু-দেশের ভূমিকা আরও বাড়বে। এর পাশাপাশি ভারতীয় নৌসেনা এবং নিউজিল্যান্ড প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক লজিস্টিক সহায়তা সংক্রান্ত চুক্তিও হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পদক্ষেপ শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃহত্তর কৌশলগত সমীকরণের অংশ।
মোদি-লাক্সন বৈঠকের পরে দুই দেশ মোট ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ১০টি চুক্তি রয়েছে। আগামী চার বছরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিস্তার ঘটানোর জন্য একটি বিশেষ রোডম্যাপ তৈরির বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা, সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা বাড়ানো হবে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারত ও নিউজিল্যান্ড সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। ১৯৮২ সালের রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতার পক্ষেও মত প্রকাশ করেছে দুই দেশ।
বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে চলেছে ‘ভারত-নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি’। গত এপ্রিল মাসে দুই দেশ এই চুক্তিতে সই করেছিল। লক্ষ্য ছিল বিশ্ব বাণিজ্যে বাড়তে থাকা শুল্ক বাধা এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আমদানি-রফতানি ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল এবং নিউজিল্যান্ডের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী ডট ম্যাকলে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। সংসদীয় অনুমোদনের পরে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কথা। দিল্লির মতে, এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারতের শ্রমনির্ভর শিল্পগুলি বিশেষ ভাবে লাভবান হতে পারে। বস্ত্র, জুতো, চামড়াজাত পণ্য, গয়না-সহ একাধিক ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের বাজারে ভারতের সুযোগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। শনিবারের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ‘এফটিএ’ দ্রুত কার্যকর করার লক্ষ্যে যৌথ ভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে দুই দেশের পণ্য ও পরিষেবা বাণিজ্য দ্বিগুণ করে প্রায় ৭ বিলিয়ন নিউজিল্যান্ড ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারতের তরুণ কর্মশক্তি, দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অর্থনীতি, স্টার্টআপ ব্যবস্থা ও পরিকাঠামো উন্নয়ন নিউজিল্যান্ডের সংস্থাগুলির জন্য বড়ো সুযোগ তৈরি করছে।ভারতের পরিকাঠামো, পরিচ্ছন্ন শক্তি, নগর পরিবহণ, জল ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল ক্ষেত্রগুলিতে নিউজিল্যান্ডের বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নিউজিল্যান্ডের দুগ্ধ বিজ্ঞান, উদ্যানপালন এবং বনজ সম্পদ ব্যবস্থাপনার দক্ষতার সঙ্গে ভারতের বৃহৎ বাজার, কৃষি প্রযুক্তি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতার সমন্বয় হলে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
দুই নেতার আলোচনায় আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও উঠে আসে। পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সংযম দেখানো, উত্তেজনা কমানো এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে অবাধ নৌচলাচল বজায় রাখা এবং বিশ্ব বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মোদী ও লাক্সন। তাঁদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মানবিক দুর্ভোগের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতির উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য সংলাপ, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তাঁরা। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানও জানিয়েছেন দুই নেতা। সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ-সহ সব ধরনের জঙ্গি কার্যকলাপের নিন্দা করে সন্ত্রাসে অর্থ জোগানের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রপুঞ্জের সংস্কারের পক্ষেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত ও নিউজিল্যান্ড। নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
❤ Support Us







