Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
  • জুলাই ১৪, ২০২৬

দ্বিসামুদ্রিক মিলনের কাহিনী

হিলাল উদ্দিন লস্কর
দ্বিসামুদ্রিক মিলনের কাহিনী

চিত্র সংগৃহীত

মানুষ মূলত অনন্ত সম্ভাবনার এক গতিময় উৎস। সে অতীতে কী ছিল, বর্তমানে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে— সেখানে তার মহত্ত্বের প্রকাশ ঘটে না; মানুষের প্রকৃত গৌরব লুকিয়ে আছে তার ভবিষ্যতের রূপান্তরের মধ্যে, আগামীতে সে কী হয়ে উঠতে পারে—সে-ই তার সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা। যখন সমাজের রক্ষণশীল ও পুনরুত্থানবাদী শক্তি বর্তমান থেকে কেবল অতীতের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন যাঁরা দূরদর্শী, তাঁদের স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। তাঁদের অন্বেষণ তখন একটাই— কীভাবে সমস্ত বাধা-বিপত্তি আর সংকটকে জয় করে মানুষ আরও সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে, কীভাবে নিজেদের সংকীর্ণ পরিচয়ের পরিধিকে প্রসারিত করে আরও উন্নত হতে পারে। যাঁরা সমাজকে এই উত্তরণের পথ দেখান, সংকটের মেঘ ফুঁড়ে আলোর দিশার দিকে দৃষ্টিপাতের নির্দেশ দেন, তাঁরাই প্রকৃত নায়ক। আজ আমাদের সবচেয়ে বড়ো সংকট এখানেই— আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পথ দেখানোর মতো তেমন কোনো মহানায়কের উপস্থিতি নেই।

ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বলতে হয়— ভারতবর্ষ একটি অপার বৈচিত্র্যের দেশ। তাসত্ত্বেও যে সত্যটি আমাদের মজ্জাগত, তা হলো— আমরা সবাই ভারতীয়। এই বোধ নির্মাণে এ দেশের প্রকৃতি আমাদের উদারহস্তে সাহায্য করেছে। অভিন্ন আলো-হাওয়ায়, একই মাটির রসদ নিয়ে আমাদের বৃদ্ধি ও বিকাশ। এই যৌথ চেতনার বিস্তৃতি কেবল প্রকৃতির দান নয়, একই সঙ্গে তা আমাদের দীর্ঘদিনের মন্থন ও অর্জনও বটে। ইতিহাসের এক নির্মম অধ্যায় হলেও, ঔপনিবেশিক শাসন বহু খণ্ডিত অঞ্চলের মানুষকে একটি অখণ্ড পরিচয়ে বেঁধে দিয়ে পরোক্ষভাবে শাপে বর হয়েছিল। সবাইকে বুকে টেনে নিয়ে গড়ে ওঠা এই যে বৃহত্তর পরিচয়, এরই নাম জাতীয়তা। আজ যাঁরা সংকীর্ণ পুনরুত্থানবাদের মন্ত্র জপে বহুমাত্রিক পরিচয়কে খণ্ডিত করতে চান, সুস্থ মনের মানুষ কিংবা সভ্যতার যাত্রাপথের প্রকৃত ইতিহাসবিদরা তা মেনে নিতে পারেন না। তাঁদের অন্তরে সদাই অনুরণিত হয় কবিগুরুর কালজয়ী আহ্বান: ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে/এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।’

এই আলোচনার সূত্র ধরেই এ দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ‘ভারতীয়ত্ব’ নিয়ে একটি অমোঘ সত্য উচ্চারণ করা প্রয়োজন। ব্যতিক্রমী দু-একজন মানুষ সব সমাজেই থাকে, সামগ্রিকভাবে ভারতীয় মুসলমানরা মজ্জাগতভাবেই এ দেশের সন্তান। এই মাটির জন্য, এই দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য প্রাণাহুতি দিতে তাঁরা কখনোই কুণ্ঠাবোধ করবেন না। তাঁদের দেশপ্রেম তাঁদের খোদ অস্তিত্বেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ভারতবর্ষের বুকে ইসলামের আগমন কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা বা রক্তাক্ত তরবারির ঝলকানিতে ঘটেনি। উত্তর ভারতের সমতলে তুর্কি বা আফগান ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পৌঁছানোর বহু শতাব্দী আগেই, ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমের সুনীল সমুদ্র উপকূল ছুঁয়েছিল ইসলামের বার্তা। তা ছিল মূলত এক মহাসামুদ্রিক মৈত্রী, বাণিজ্যিক সততা এবং সংস্কৃতির এক অপরূপ ও শান্তিপূর্ণ আদান-প্রদান

এখানে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে এই যে, আজ দেশপ্রেম পরীক্ষার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রায়ই ভুল ও কৃত্রিম মাপকাঠি প্রয়োগ করা হয়। তা হলো— রাষ্ট্রকে ঈশ্বরের আসনে বসিয়ে তার পূজা করা। রাষ্ট্রকে ঈশ্বরজ্ঞান করা আসলে এক ধরনের অন্ধ উগ্রতা, যা বৃহত্তর সামাজিক সহাবস্থানের জন্য অত্যন্ত ভয়ানক ও আত্মঘাতী। অন্ধ রাষ্ট্রপূজাকেই ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’ আখ্যা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো মনীষীরা একে উন্মাদনা ও আত্মবিনাশী পথ বলে হুঁশিয়ার করে গেছেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপজ্জনক প্রসঙ্গটি অবশ্য এক ভিন্ন আলোচনার দাবি রাখে। এই নিবন্ধে আমরা মূলত আলোকপাত করব এ দেশের মুসলিম মানসে জাতীয়তা এবং ভারতীয়তার ধারণাটি ঠিক কতটা গভীরে প্রোথিত এবং কীভাবে তা বিকশিত হয়েছে— তারই এক নির্মোহ ব্যবচ্ছেদে।

 চেরামন জুমা মসজিদ কেবল ভারতের বুকে নির্মিত প্রথম মসজিদই নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরই অনন্য প্রতীক। স্থানীয় ইতিহাস ও কিংবদন্তি অনুসারে, চেরাপেরুমল রাজবংশের তৎকালীন রাজা আরব বণিকদের কেবল ধর্ম প্রচার ও পালনের স্বাধীনতাই দেননি, এই উপাসনালয়টি নির্মাণের জন্য ভূসম্পত্তি ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতাও দান করেছিলেন

ভারতবর্ষের বুকে ইসলামের আগমন কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা বা রক্তাক্ত তরবারির ঝলকানিতে ঘটেনি। উত্তর ভারতের সমতলে তুর্কি বা আফগান ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পৌঁছানোর বহু শতাব্দী আগেই, ভারতের দক্ষিণ ও পশ্চিমের সুনীল সমুদ্র উপকূল ছুঁয়েছিল ইসলামের বার্তা। তা ছিল মূলত এক মহাসামুদ্রিক মৈত্রী, বাণিজ্যিক সততা এবং সংস্কৃতির এক অপরূপ ও শান্তিপূর্ণ আদান-প্রদান। সপ্তম শতকের প্রাক্কালে আরবের মরুভূমিতে ইসলাম উদিত হওয়ার অল্প কিছুকালের মধ্যেই, আরব বণিকেরা মৌসুমি বায়ুর হাত ধরে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের জলতরঙ্গ পেরিয়ে মালাবার, গুজরাট এবং বাংলার উপকূলে এসে পৌঁছান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা এই ভারত-আরব বাণিজ্যিক সম্পর্কের গভীরতা ও এর রূপান্তর সম্পর্কে ঐতিহাসিক তারা চাঁদ তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘ইনফ্লুয়েন্স অফ ইসলাম অন ইন্ডিয়ান কালচার’-এ এক অমোঘ সত্য উচ্চারণ করেছেন: ‘ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও আরবরা ভারতের সাথে বাণিজ্য করত। ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর এই বাণিজ্যের পরিধি ও গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় শাসকেরা তাঁদের পরম শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির সাথে গ্রহণ করেছিলেন।’

এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহনশীলতার সবচেয়ে জাজ্বল্যমান এবং জীবন্ত ঐতিহাসিক দলিল হচ্ছে কেরালার কোডুঙ্গালুরের ‘চেরামন জুমা মসজিদ’ (আনুমানিক ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দ)। এটি কেবল ভারতের বুকে নির্মিত প্রথম মসজিদই নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিরই অনন্য প্রতীক। স্থানীয় ইতিহাস ও কিংবদন্তি অনুসারে, চেরাপেরুমল রাজবংশের তৎকালীন রাজা আরব বণিকদের কেবল ধর্ম প্রচার ও পালনের স্বাধীনতাই দেননি, এই উপাসনালয়টি নির্মাণের জন্য ভূসম্পত্তি ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতাও দান করেছিলেন।

কেরালা বা মালাবার উপকূলের মতো গুজরাট ও বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলও ছিল তৎকালীন বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এম. এন. রায় এবং আর. সি. মজুমদার-এর মতো ঐতিহাসিকদের লেখাতেও বারবার উঠে এসেছে যে, উত্তর ভারতের সামরিক অভিযানের বহু পূর্বে প্রান্তিক সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে মুসলিম জনবসতি ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল। কালক্রমে, আরব বণিকেরা ভারতবর্ষের ঋতুচক্র, জল-হাওয়া এবং এখানকার উদার সামাজিক পরিবেশকে ভালোবেসে ভারতকে নিজেদের স্থায়ী আবাস হিসেবে বেছে নেন। তাঁরা কোনো বিজয়ী বা ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে আসেননি, এসেছিলেন সম্মিলিত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে। স্থানীয় নারীদের সাথে তাঁদের বৈবাহিক বন্ধন এবং সামাজিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ভারতে  সম্পূর্ণ নতুন, সমৃদ্ধ ও স্বতন্ত্র ধারার জন্ম হয়।

কেরালা উপকূলে এরকম মিলনের ফলে যে অনন্য সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, তা ‘মোপলা’ সংস্কৃতি নামে পরিচিত। মালয়ালম শব্দ ‘মাহাপিল্লাই’ থেকে ‘মোপলা’ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ ‘সম্মানিত জামাতা’ বা ‘মহান অতিথি’। এই শব্দই প্রমাণ করে তৎকালীন ভারতীয় সমাজ নবাগতদের কতটা পরম মমতায় ও শ্রদ্ধায় আপন করে নিয়েছিল। উপকূলীয় মুসলিম সমাজে একদিকে যেমন অক্ষুণ্ণ ছিল ইসলামের একেশ্বরবাদী চেতনা ও ধর্মীয় বিশ্বাস, অন্যদিকে প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা, স্থাপত্য, পোশাক এবং মাতৃভাষা হিসেবে যুক্ত হয়েছিল খাঁটি মালয়ালম উপাদান। ভারতের উপকূলীয় ইসলামের ইতিহাস কোনো জবরদস্তির ইতিহাস নয়; বরং তা হলো হৃদয় দিয়ে হৃদয় জয়ের, সভ্যতার সাথে সভ্যতার মিলনের এবং এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের মহাকাব্য।

খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে আরব সাগরের নীল জলরাশিতে ভেসে আসত একের পর এক বাণিজ্যিক তরী। ওই সুবর্ণ যুগে গুজরাটের খাম্বাত, ভারুচ এবং সুরাটের মতো বন্দরগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্য মানচিত্রে অনন্য মর্যাদায় ভূষিত হয়েছিল। গুজরাটের দূরদর্শী রাষ্ট্রকূট এবং সোলাঙ্কি (চালুক্য) রাজন্যবর্গ আরব বণিকদের— যাঁরা স্থানীয় সমাজে  ‘তাজিক’ বা ‘তুর্ক’ নামে পরিচিত ছিলেন— তাঁদের কেবল স্বাগতই জানাননি, বুকেই টেনে নিয়েছিলেন পরম মমতায়। তাঁদের স্থায়ী বসবাসের অধিকার, নিজস্ব আইন অনুযায়ী বিচারব্যবস্থা পরিচালনা এবং স্বাধীনভাবে আকাশছোঁয়া মিনারযুক্ত মসজিদ নির্মাণের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। দশম শতাব্দীর প্রখ্যাত আরব পর্যটক ও সমাজ-সন্ধানী ঐতিহাসিক আল-মাসুদি ৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে গুজরাটের ‘চৈমূর’ (আধুনিক চৌল) বন্দরে পদার্পণ করেছিলেন। তিনি তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে বিস্ময়ের সাথে লিপিবদ্ধ করেছেন যে, সে বন্দরে প্রায় দশ হাজার মানুষ স্থায়ীভাবে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতেন। তাঁদের মধ্যে এক বৃহৎ অংশ ছিলেন ‘বায়াসিরা’, অর্থাৎ যাঁরা ভারতীয় নারীদের বিবাহ করে এখানকার মাটির সাথে রক্ত ও সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং পরবর্তী প্রজন্ম এ দেশেই জন্ম নিয়েছিলেন। খাম্বাত বন্দরের প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ ও শিলালিপি আজও সে গৌরবোজ্জ্বল ও শান্তিপূর্ণ সমাজের সাক্ষ্য বহন করে। এরকম সৌহার্দ্যের এক অনুপম, ট্রাজিক ও মহান দলিল মেলে ইতিহাস থেকে: খাম্বাতের দাঙ্গায় একটি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, গুজরাটের প্রজাহিতৈষী রাজা সিদ্ধরাজ জয়সিংহ গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন এবং নিজের ব্যক্তিগত রাজকোষ থেকে অর্থ দান করে মসজিদটি পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেন। এভাবেই আরব সাগরের ঢেউয়ের সাথে মিশে গিয়ে, গুজরাটি ও মালয়ালম উপাদানের নিবিড় মেলবন্ধনে, রক্তপাতহীন অহিংস ও সমন্বয়ী ভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতির শক্তিশালী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।


যাঁরা বাইরে থেকে এসে এই মাটিকে আপন করেছিলেন, আর যাঁরা এই মাটির সন্তান হয়েই ইসলামকে বরণ করেছিলেন— উভয় ধারার মানুষ কালক্রমে ভারতবর্ষকে কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র হিসেবে দেখেননি, একে বরণ করেছিলেন নিজেদের ‘মাতৃভূমি’ হিসেবে। সুলতানি বা মুঘল আমলের রাজন্যবর্গ এ দেশের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে কোনো দূরদেশি বিদেশি ভূখণ্ডে পাচার করেননি; এ দেশের জল-হাওয়া, মাটি ও মানুষের সঙ্গে নিজেদের জীবন ও স্বপ্নকে একাকার করে দিয়েছিলেন


পশ্চিম উপকূলের সম্প্রীতির সমান্তরালে, উত্তর ভারতে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজির নদীয়া জয়ের (১২০৩ খ্রিষ্টাব্দ) বহু শতাব্দী আগেই, বাংলার দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলে— বিশেষ করে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী এবং সুন্দরবনের অরণ্য-ঘেরা সমতট ও হরিকেল জনপদে আরব বণিকদের পদচিহ্ন পড়েছিল। আরবের আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগ থেকেই সুলাইমান আল-তাজির এবং ইবন খুরদাদবেহর মতো কালজয়ী ভূগোলবিদদের কালিতে বাংলার ‘রূমি’– সম্ভবত পাল বংশের মহান রাজা ধর্মপালের সাম্রাজ্য এবং উপকূলীয় অঞ্চলের অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির কথা বিধৃত হয়েছে। আরব্য বণিকদের মায়াবী চোখে চট্টগ্রামের প্রাচীন বন্দরটি ধরা দিয়েছিল ‘শাতিল-গঙ্গা’ (গঙ্গার বদ্বীপ) নামে।

বাংলার নদীমাতৃক উপকূলে আসা আরবদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল— তাঁরা কেবল দাঁড়িপাল্লা হাতে ব্যবসায়ী ছিলেন না, তাঁদের অন্তরে ছিল সুফি ভাবাদর্শের মহাসমুদ্র। তৎকালীন বাংলার সমাজব্যবস্থায় বর্ণপ্রথার নিষ্ঠুর যাঁতাকলে পিষ্ট ও শোষিত নিম্নবর্ণের সাধারণ মানুষ বণিক ও সুফিদের অনুপম সততা, নিষ্কলুষ চরিত্র এবং সাম্যের অমোঘ বাণীতে মন্ত্রমুগ্ধ হন। তরবারির জোর নয়, বরং মানুষের আত্মিক ক্ষুধা মেটানোর এক ঐশ্বরিক টানে তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেন। সমুদ্রযাত্রায় তাঁদের কণ্ঠের আকুল প্রার্থনা ছিল: ‘আমীর সাধু, জমিন সাধু, গাঙের পানি লোনা,/ বদ্‌র বদ্‌র হেইও…পীর বদরের নাম লোনা!’ চট্টগ্রাম ও সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের লোকগাঁথায় আজও অম্লান হয়ে আছে ‘বদর মোকাম’ ও বারো আউলিয়ার পুণ্যস্মৃতি। আধ্যাত্মিক পুরুষ পীর বদর বা বদরউদ্দিন আল্লামার প্রভাব এতটাই অতলস্পর্শী ছিল যে, সমুদ্রযাত্রার উত্তাল মুহূর্তে ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত নাবিক ও মাঝিমাল্লারা সমস্বরে ‘গঙ্গা-বদর’ বা ‘পীর বদর’ বলে নদীর বুকে সঁপে দিতেন তাঁদের জীবন-তরী। বাংলার জনবিন্যাসে মুসলিমদের সংখ্যাবৃদ্ধি কোনো জবরদস্তির ইতিহাস নয়; তা হলো নদী ও সাগরের মোহনার মতোই প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা শান্তিময় রূপান্তরের অনন্য কাব্যগাথা।

ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে কোনো কোনো সভ্যতার মিলন ঘটে রক্তের নদীতে, আবার কোনো কোনো মিলন জন্ম দেয় সংস্কৃতির মহাসমুদ্রের। ভারতবর্ষে ইসলামের আগমন ও বিস্তার দ্বিতীয় ধারার অনুপম উদাহরণ। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ এম. এন. রায় তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য হিস্টরিক্যাল রোল অফ ইসলাম’-এ এই সত্যকেই উন্মোচন করেছেন গভীর মমতায়। তিনি দেখিয়েছেন,  ভারতের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বর্ণপ্রথার নিগড়ে পিষ্ট নিম্নবর্ণের অন্ত্যজ সমাজ, ইসলামকে কোনো আগ্রাসী বা বিজয়ী শক্তি হিসেবে দেখেনি; বরং তারা একে স্বাগত জানিয়েছিল সামাজিক মুক্তি ও এক নতুন মানবিক চেতনার আলোকবর্তিকা হিসেবে। এই সংযোগ কেবল আত্মিক ছিল না, ছিল বৈষয়িকও। নবাগত বণিকেরা ভারতবর্ষকে যুক্ত করেছিলেন তৎকালীন বিশ্ববাণিজ্যের সুবিশাল মহাসড়কে। বাংলার মসলিন, দাক্ষিণাত্যের সুগন্ধি মশলা আর রাজস্থানের মহামূল্যবান রত্ন তাঁদের হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল, যা ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে অনন্য সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে দেয়। তরবারির জোরে নয়, স্থানীয় রাজন্যবর্গের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় ও পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থে এই অঞ্চলের মুসলিমরা এখানকার মাটির সাথে এমনভাবে মিশে গিয়েছিলেন, যা কালক্রমে জন্ম দেয় অপূর্ব মিশ্র সংস্কৃতির— যার সার্থক রূপ আমরা দেখি গুজরাটি বা বাঙালি সংস্কৃতি চেতনার অবয়বে।

ভারতীয় ‘মুসলিম সমাজ’ একক, একমুখী বা বৈচিত্র্যহীন সমসত্ত্ব পাথুরে দেয়াল নয়। বিশ্বাসের একত্বে তাঁরা একই সুতোয় বাঁধা হলেও, তাঁদের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রা এক সুবিশাল ও বহুমাত্রিক ক্যানভাস। এ বৈচিত্র্যকে মূলত তিনটি প্রধান ধারায় অনুধাবন করা যায়:

ক) নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক বিভাজন : ঐতিহাসিকভাবে এই সমাজে দুটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। আরব, পারস্য, মধ্য এশিয়া বা আফগানিস্তান থেকে আগত বংশধরেরা ‘আশরাফ’ নামে পরিচিত ছিলেন। ভারতবর্ষের আদি অধিবাসী, যাঁরা কালক্রমে ইসলামের সাম্যের বাণীতে দীক্ষিত হয়েছিলেন, তাঁরা ‘আজলাফ’ বা ‘আরজাল’ নামে অভিহিত হন।

খ) ধর্মতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য : বিশ্বাসের অন্দরে সুন্নি ও শিয়া— দুই প্রধান স্রোত ছাড়াও রয়েছে হানাফি ও শাফেয়ি মতাদর্শের বিধিগত বৈচিত্র্য। এর সাথে যুক্ত হয়েছে চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়ার মতো সুফি তরিকার আধ্যাত্মিক সুবাস, যা এ দেশের মানুষকে পরমেশ্বরের চরণে নিবেদন করতে শিখিয়েছে।

গ) আঞ্চলিক ও ভাষাগত পরিচয় : এটিই ভারতীয় মুসলিমদের সবচেয়ে মধুর বৈচিত্র্য। একজন কাশ্মীরি, বাঙালি, তামিল বা মালাবালি মুসলিমের জীবনযাত্রা, পোশাকের ছাঁদ ও রোজকার অভ্যাসের সাথে উত্তর ভারতের উর্দুভাষী মুসলিমের আকাশ-পাতাল তফাত। একজন বাঙালি মুসলিমের লোকসংস্কৃতির পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে জারি-সারি বা বাউলের দেহতত্ত্ব, যা উত্তর ভারতের কোনো সমাজে কল্পনা করা যায় না। এ আঞ্চলিক স্বকীয়তাই প্রমাণ করে, এ সমাজ কৃত্রিম ছাঁচে ঢালাই করা সমাজ নয়।

যাঁরা বাইরে থেকে এসে এই মাটিকে আপন করেছিলেন, আর যাঁরা এই মাটির সন্তান হয়েই ইসলামকে বরণ করেছিলেন— উভয় ধারার মানুষ কালক্রমে ভারতবর্ষকে কেবল একটি ভৌগোলিক মানচিত্র হিসেবে দেখেননি, একে বরণ করেছিলেন নিজেদের ‘মাতৃভূমি’ হিসেবে। সুলতানি বা মুঘল আমলের রাজন্যবর্গ এ দেশের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করে কোনো দূরদেশি বিদেশি ভূখণ্ডে পাচার করেননি; এ দেশের জল-হাওয়া, মাটি ও মানুষের সঙ্গে নিজেদের জীবন ও স্বপ্নকে একাকার করে দিয়েছিলেন। এরই সুবর্ণ ফসল হিসেবে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে অত্যন্ত স্বতন্ত্র ও অনন্য আত্মপরিচয়ের বিকাশ ঘটে। তাঁরা একদিকে যেমন তাঁদের হৃদয়ের মণিকোঠায় অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাসকে, অন্যদিকে তাঁদের চিন্তা, মনন, লোকজীবন এবং প্রাত্যহিক আচরণ হয়ে উঠেছিল ষোলো আনা ‘ভারতীয়’। আরবের তপ্ত মরুভূমির শুষ্কতা নয়, বরং ভারতের নদীমেখলা প্রকৃতি, ষড়ঋতুর আবর্তন এবং সহনশীল সামাজিক পরিবেশ তাঁদের সত্তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। সমন্বয়ধর্মী সংস্কৃতির কারণেই ভারতীয় মুসলিমরা নিজেদের ‘ভারতীয়’ বলে পরিচয় দিতে পরম গৌরব অনুভব করেন। তাঁদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের সবচেয়ে বড়ো প্রকাশ ঘটেছে সুফি-ভক্তি আন্দোলনের উদার আধ্যাত্মিকতায় এবং শিল্প, স্থাপত্য ও সাহিত্যের আঙিনায়। যেমন ইসলামের একেশ্বরবাদ ও সাম্যের অমোঘ বাণীকে আঁকড়ে ধরেছেন, তেমনি ভারতের বহুত্ববাদ, উপনিষদীয় দর্শন এবং প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যকে পরম মমতায় আপন করে নিয়েছেন। ধর্মবিশ্বাসে মুসলিম আর জাতীয়তায় ও সংস্কৃতিতে খাঁটি ভারতীয়— এই দুইয়ের অপূর্ব ও নান্দনিক রসায়নই ভারতীয় মুসলমানদের ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর, শাশ্বত ও অনন্য বৈশিষ্ট্য।

ইতিহাসের গতিপথে ভারতবর্ষ বারবার আক্রান্ত হয়েছে, লুণ্ঠিত হয়েছে, আবার কখনো বা পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছে নবাগতদের। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে উত্তর ও মধ্য ভারতে যে রাজবংশগুলোর— প্রথমে দিল্লি সুলতানি এবং পরবর্তীতে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাদের চরিত্র ছিল পূর্ববর্তী বা পরবর্তী অন্যান্য বিদেশি আক্রমণকারীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রাচীনকালের শক, হুন কিংবা একাদশ শতকের সুলতান মাহমুদের মতো প্রাথমিক আক্রমণকারীরা এসেছিল প্রধানত এ দেশের ধন-সম্পদ লুণ্ঠন করতে। পরবর্তীকালের ব্রিটিশরা এসেছিল সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে, যাদের মূল লক্ষ্যই ছিল ‘ড্রেন অব ওয়েলথ’ বা ভারতের সম্পদ শোষণ করে নিজেদের মূল ভূখণ্ডে পাচার করা। দিল্লির সুলতানি ও মুঘল শাসকেরা যুদ্ধ জয় করে এ দেশে এলেও, ভারতবর্ষকে লুণ্ঠনের বস্তু বা উপনিবেশ বানাননি; একেই নিজেদের চিরস্থায়ী বাসস্থান এবং একমাত্র মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার তাঁর বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে এই অনন্য রূপান্তরকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে চিহ্নিত করেছেন। মনস্তাত্ত্বিক আত্মীকরণের সবচেয়ে জাজ্বল্যমান দলিল পাওয়া যায় ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’-তে। তিনি এই ঐতিহাসিক সত্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ব্যক্ত করেছেন: ‘গভীরতার মাপকাঠিতে বুঝতে হবে যে, মুসলিম শাসকরা ব্রিটিশদের মতো ভারতকে উপনিবেশ ভাবেনি, তাঁরা এখানকার সমাজের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন, ভারতকে তাঁদের আপন ঘর বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁদের ইতিহাস ভারতীয় ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল…’

এ আত্মীকরণের প্রক্রিয়াটি কেবল রাজনৈতিক নয়, গভীর মনস্তাত্ত্বিক। জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর যখন ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে মুঘল বংশের ভিত্তি স্থাপন করেন, প্রথমদিকে তাঁর মধ্য এশিয়ার ফরগনা বা কাবুলের শীতল হাওয়া আর ফলের জন্য মন কেমন করত। তাঁর পুত্র হুমায়ুন এবং বিশেষ করে পৌত্র জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের আমলে দূরদেশি চেতনা কর্পূরের মতো উড়ে যায়। তাঁরা ভারতবর্ষের জল-হাওয়া, ঋতুচক্র এবং মানুষের সাথে এমনভাবে মিশে যান যে, মুঘলদের ইরানি বা তুর্কি পরিচয়টি গৌণ হয়ে ওঠে এবং প্রধান হয়ে ওঠে তাঁদের ‘ভারতীয়’ সত্তা। এই শাসকেরা কর বা রাজস্ব হিসেবে যে অর্থ সংগ্রহ করতেন, তার একটি পয়সাও কোনো দিন ভারতের বাইরে পাঠাননি। আলাউদ্দিন খলজি, ফিরোজ শাহ তুঘলক, আকবর কিংবা শাহজাহানের আমলের সমস্ত অর্থ ব্যয় হয়েছিল এ দেশেরই কৃষি, সেচব্যবস্থা, দীর্ঘ রাস্তাঘাট, শিক্ষা এবং জনকল্যাণে। তাঁদের সংগৃহীত রাজস্বে এ দেশের বুকেই নির্মিত হয়েছিল তাজমহল, লালকেল্লা, ফতেহপুর সিক্রির মতো কালজয়ী সব স্থাপত্য।

রাজপুত ও অন্যান্য স্থানীয় রাজবংশের সঙ্গে মুঘলদের বৈবাহিক সম্পর্ক কেবল কোনো শুষ্ক রাজনৈতিক কৌশল ছিল না; তা ছিল রক্ত, হৃদয় ও সংস্কৃতির অভূতপূর্ব মিলন। সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং শাহজাহান— উভয়েরই মাতৃকুল ছিল রাজপুত। ফলে রক্তগত ও জন্মগতভাবেই তাঁরা ছিলেন এ দেশেরই সন্তান। ভারতের প্রকৃতির প্রতি এসব শাসকদের ভালোবাসা ছিল অসীম ও অতুলনীয়। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরি’-তে ভারতের ফুল, পাখি এবং কাশ্মীরের অপরূপ প্রকৃতির যেভাবে স্তুতি করেছেন, তা কোনো বিদেশি শাসকের কলমে অসম্ভব; কেবল স্বদেশের মাটিকে মনে-প্রাণে ভালোবাসার একজন মানুষের পক্ষেই এরকম আত্মনিবেদন সম্ভব। এই ধরনের সামাজিক মেলবন্ধনের ফলে তাঁদের জীবনধারা, পোশাক, খাদ্যসংস্কৃতি এবং উৎসব উদযাপনে নতুন মিশ্র বা সমন্বয়বাদী ভারতীয় সংস্কৃতির জন্ম হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে উপমহাদেশে জীবনের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁদের মন থেকে ‘বাইরের লোক’ হওয়ার চেতনা চিরতরে মুছে গিয়েছিল। তাঁরা আর বহিরাগত আগ্রাসী শক্তি হয়ে থাকতে পারেন নি; তাঁরা হয়ে উঠেছিলেন বহুত্ববাদী ও বৈচিত্র্যময় ভারতবর্ষের পরম গর্বিত স্থপতি ও সুযোগ্য সন্তান।

ভারতবর্ষের ইতিহাস কেবল বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতনের খতিয়ান নয়, তা হলো মূলত সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং আদান-প্রদানের এক বহমান নদী। নদীকে যিনি তাঁর সুর, বাণী ও প্রজ্ঞা দিয়ে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করেছিলেন, তিনি হলেন ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকের মহান সুফি সাধক, কবি ও সংগীতজ্ঞ হযরত আমির খসরু (১২৫৩–১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ)। মহাত্মা নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সুযোগ্য শিষ্যকে সমকালীন ইতিহাসে ‘তুতী-ই-হিন্দ’ বা ‘ভারতের তোতাপাখি’ বলে অভিহিত করা হয়। তিনি ছিলেন ভারতীয় মুসলমানদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির প্রথম, প্রধান এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলোকবর্তিকা। পারস্য ও মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্য তাঁর রক্তে থাকলেও, তাঁর অন্তরে স্পন্দিত হত সনাতন ভারতবর্ষের মহিমান্বিত রূপ। আমির খসরু তাঁর জীবন ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, কীভাবে ধর্মবিশ্বাসকে অক্ষুণ্ণ রেখেও, মন ও মননে সম্পূর্ণ  ভারতীয় হওয়া সম্ভব। আমির খসরু ছিলেন বিরল প্রতিভাদের একজন, যিনি ইরান ও মধ্য এশিয়ার ঐতিহ্য এবং ভারতের প্রাচীন সনাতন সংস্কৃতির মধ্যে মজবুত ও নান্দনিক সেতু নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর সেই অনন্য অবদানের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

ক) হিন্দুস্তানি সংগীতের রূপকার ও রাগ-রাগিণীর প্রবর্তনঃ আমির খসরুর হাত  ধরেই ভারতের প্রাচীন ‘মার্গ সংগীত’ এবং পারস্যের ‘সুফিয়ানা মৌসিকি’-র (সুফি সংগীত) অপূর্ব মিলনে জন্ম নেয় অনুপম সমন্বয়বাদী ধারা— যা ‘হিন্দুস্তানি সংগীত’ নামে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। প্রাচীন ধ্রুপদ গায়কির কঠোর ব্যাকরণের সাথে ইরানি সুরের চপলতা ও মাধুর্য মিশিয়ে ‘খেয়াল’ এবং ‘তারানা’ নামক নতুন দুটি গায়নশৈলীর প্রবর্তন করেন।  ইমন, সাযগিরি, বাহার ও কাওলের মতো বহু মিশ্র রাগের সৃষ্টি তাঁরই অনন্য কীর্তি।

খ) বাদ্যযন্ত্রের মেলবন্ধন: সেতার ও তবলার জন্ম–প্রচলিত বিশ্বাস ও  সংগীত- ইতিহাস অনুযায়ী, আমির খসরু বাদ্যযন্ত্রের জগতেও এক যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটান। ভারতের সনাতন ‘বীণা’ এবং পারস্যের ‘তম্বুরা’র নিখুঁত সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন ‘সেতার’ (ফারসি ‘সেহ-তার’, যার অর্থ তিন তারবিশিষ্ট যন্ত্র)। ঐতিহ্যবাহী গুরুগম্ভীর বাদ্যযন্ত্র ‘পাখোয়াজ’ বা মৃদঙ্গকে দ্বিখণ্ডিত করে তিনি আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান সহযোগী বাদ্যযন্ত্র ‘তবলা’ ও ‘বাঁয়া’-র রূপরেখা তৈরি করেন।

গ) ‘কাওয়ালি’ ধারার প্রবর্তন ও আধ্যাত্মিকতা : সুফি আধ্যাত্মিক ভাব ও ঐশ্বরিক প্রেমকে রাজদরবারের সীমানা ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের  আঙিনায় পৌঁছে দিতে তিনি প্রবর্তন করেন ‘কাওয়ালি’ ধারার। তাঁর দীক্ষাগুরু হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার স্মরণে ব্রজভাষায় রচিত কালজয়ী কাওয়ালি—‘ছাপ তিলক সব ছিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে’— দীর্ঘ সাতশত বছর ধরে এই উপমহাদেশের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য এবং চিরযৌবনা অঙ্গ হয়ে রয়েছে বহুত্ববাদী সঙ্গীতের কথা আর সুর।

ঘ) ‘হিন্দভি’ ভাষা ও আধুনিক উর্দু-হিন্দির ভিত্তি :  দরবারের আভিজাত্যে ঘেরা  ফারসি ভাষার সমান্তরালে, খসরু এ দেশের সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা— হিন্দি, ব্রজভাষা ও খড়িবুলির সঙ্গে ফারসি শব্দের চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন কাব্যিক ভাষার জন্ম দেন, যার নাম ‘হিন্দভি’ বা ‘হিন্দুই’। পরীক্ষামূলক এ ভাষাই পরবর্তীকালে উর্দু এবং উত্তর ভারতের হিন্দি ভাষার মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

আমির খসরুর সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার প্রধান বৈশিষ্ট্য : আমির খসরুর সৃষ্টিশীলতার  অন্দরে প্রবেশ করলে কিছু সুনির্দিষ্ট এবং অনন্য বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে, যেখানে তাঁর আরোহন সমকালীন  সমস্ত কবি-সাহিত্যিক থেকে সম্পুর্ণ আলাদা :

ক) ‘নুহ্ সিপির’; দেশপ্রেমের এক অমর মহাকাব্য : আমির খসরুর সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ভারতবর্ষের প্রতি তাঁর গভীর আর স্বতঃস্ফূর্ত অনুরাগ। তাঁর বিখ্যাত ফারসি মসনবি ‘নুহ্ সিপির’ (নয় আকাশ) কাব্যের একটি পুরো অধ্যায় জুড়ে তিনি ভারতবর্ষের স্তুতি গেয়েছেন। খসরু তাঁর প্রখর যুক্তি ও নান্দনিক ভাবনাচিন্তায় দেখিয়েছেন, কেন ভারতবর্ষ পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের— এমনকি তাঁর পিতৃভূমি খোরাসানের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। ভারতকে ‘পৃথিবীর স্বর্গ’ ঘোষণা করে তিনি লিখেছেন: ‘জানতে চাও কেন ভারত স্বর্গের সমতুল্য? শোনো তবে, এই দেশ তার জল-হাওয়া আর প্রকৃতির গুণে সাক্ষাৎ বেহেশত। এখানকার ফুল-ফল, পাখির ডাক আর মানুষের জ্ঞান পৃথিবীর আর কোথাও মেলা ভার।’ এই কাব্যে তিনি ভারতীয় প্রজ্ঞা ও বিদ্যার মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছেন। গ্রিক দর্শনের সঙ্গে ভারতের পণ্ডিতদের দর্শনের তুলনা করে তিনি সগর্বে উচ্চারণ করেছিলেন যে— জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুক্তিশাস্ত্র এবং বিশেষ করে গণিতে (শূন্য ও দশমিকের ব্যবহার) ভারতীয়রাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। খসরুর এই অমোঘ বাণী প্রমাণ করে, তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের মননে ভারতকে নিজেদের গর্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখার চেতনা কতটা সুদৃঢ় ছিল।

খ) সুফি দর্শন ও বৈষ্ণবীয় প্রেমচেতনার মেলবন্ধন: খসরুর আধ্যাত্মিকতা কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না। তাঁর সাহিত্যচর্চায় সুফিদের ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ (অস্তিত্বের একত্ববাদ) এবং ভারতীয় উপনিষদীয় বা বৈষ্ণবীয় প্রেমচেতনার এক অপূর্ব রসায়ন লক্ষ করা যায়। যখন তিনি ব্রজভাষার মাধুর্য মিশিয়ে আধ্যাত্মিক আর্তি প্রকাশ করেন: ‘খসরু রৈন সুহাগ কী, জাগি পিয়ু কে সং,/ তন মোরা মন পীয়ু কো, দোউ ভয়ে এক রং।’ (অর্থাৎ: খসরু প্রেমের রজনীতে প্রিয়ের সাথে জেগে রইলেন; শরীর আমার আর মন প্রিয়তমার, দুজনে মিলে আজ এক রঙে বিলীন হয়ে গেলাম)। এখানে তাঁর সুফি তাত্ত্বিক দর্শনের সাথে ভারতীয় বৈষ্ণবীয় প্রেমচেতনা এবং রাধা-কৃষ্ণের ভাবাবেগ যেন একই মোহনায় এসে একাকার হয়ে যায়।

গ) লোকজীবন ও গণমুখী সাহিত্য : খসরু কেবল রাজদরবারের উচ্চাঙ্গের সাহিত্য রচনা করেননি; তিনি সাধারণ মানুষের বিনোদনের জন্য তৈরি করেছিলেন অজস্র ধাঁধা, কৌতুকপূর্ণ কবিতা এবং ঋতুভিত্তিক গান (যেমন—বর্ষার গান)। খসরুর লোকসাহিত্যের একটি সুন্দর নিদর্শন হলো এই ধাঁধাটি: ‘তরবর সে এক তিরিয়া উতরি, উসনে বহুত রিঝায়া / বাপ কা উসনে নাম যো পুছা, আধা নাম বাতায়া।’ (উত্তর: নিম্বোলি বা নিমের ফল; ফারসিতে ‘নিম’ মানে আধা)।  এই গণমুখী মানসিকতাই তাঁর সৃষ্টিকে শত শত বছর ধরে আমাদের লোকস্মৃতিতে বাঁচিয়ে রেখেছে।

ঘ) বহুত্ববাদ ও বহুভাষিক দক্ষতা: খসরু ছিলেন একাধারে আরবি, ফারসি,  তুর্কি, সংস্কৃত এবং বিভিন্ন নব্য-ভারতীয় আর্যভাষায় (যেমন—হিন্দি, লহরি, সিন্দ্রি ইত্যাদি) অত্যন্ত পারদর্শী। তাঁর  বহুভাষিক দক্ষতার কারণে তিনি বিভিন্ন সংস্কৃতির ভেতরের নির্যাসটুকুকে গ্রহণ করে এক সর্বভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির রূপ দিতে পেরেছিলেন।

আমির খসরুর ইতিহাস একমুখী ধর্মাচরণের ইতিহাস নয়, হৃদয় দিয়ে হৃদয়কে স্পর্শ করার ইতিহাস। ধর্মবিশ্বাসে তিনি খাঁটি সুফি, আর জাতীয়তা, মনন ও সাংস্কৃতিক সত্ত্বায় আপাদমস্তক খাঁটি ভারতীয়। তরবারির রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও যে সুর, ভাষা এবং ভালোবাসার সাংস্কৃতিক শক্তি অনেক বেশি স্থায়ী— আমির খসরুর জীবন ও সৃষ্টিশীলতাই তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। আমির খসরুর দেখান সমন্বয়ের পথ ধরেই পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে বহু কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী ভারতকে নিজেদের আরাধ্য মেনে তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ষোড়শ শতাব্দীর বিশিষ্ট পাঠান কবি সৈয়দ ইব্রাহিম, যিনি ইতিহাসে ‘রসখান’ (১৫৪৮–১৬২৮ খ্রিষ্টাব্দ) নামে সুপরিচিত।


সুফি দর্শনের মূল কথা হলো ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ (অস্তিত্বের একত্ববাদ), যার মূল সুরের সঙ্গে ভারতের প্রাচীন উপনিষদীয় ‘অদ্বৈতবাদ’ দর্শনের আশ্চর্য ও গভীর তাত্ত্বিক মিল রয়েছে। উভয় দর্শনই মনে করে— পরম সত্তা এক এবং সৃষ্টিজগতের সমস্ত বৈচিত্র্যের অন্তরালে একক ব্রহ্ম বা ঈশ্বরেরই প্রকাশ ঘটে। ভাবগত ঐক্যের কারণে ভক্তি ও সুফি মতধারা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল


দিল্লির বনেদি পরিবারের এই সন্তান, রসখান ব্রজভূমির প্রেমে এবং শ্রীকৃষ্ণের ভক্তি-রসে এমনভাবে আপ্লুত হয়েছিলেন যে গোঁড়া সমাজকে তোয়াক্কা করেননি। ব্রজভাষায় তাঁর ‘সওয়ৈয়া’ কাব্য ভারতীয় সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। তিনি লিখেছিলেন:  ‘মানূষ হৌং তো ওই রসখানি, বসৌং ব্রজ গোকুল গাঁও কে গোয়ারন।/ জো পশূ হৌং তৌ কহা বসূ মেরো, চরৌং নিত নন্দ কী ধেনূ মঝারন।‘ (অর্থাৎ: আগামী জন্মে যদি আমি মানুষ হিসেবে জন্ম নিই, তবে যেন গোকুলের রাখালদের মাঝেই জন্মাই। আর যদি পশু হয়ে জন্মাই, তবে যেন প্রতিদিন নন্দের গাভীগুলোর সাথে ব্রজভূমিতেই বিচরণ করতে পারি।) সংকীর্ণতা পেরিয়ে স্বদেশের মাটি ও ঐতিহ্যের প্রতি এমন গভীর আত্মিক টান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এরপর যাঁর নাম উল্লেখ করতে হয়, তিনি হলেন মালিক মুহাম্মদ জায়সী। জায়সী সুফি দর্শন ও এ দেশের লোক-আখ্যানের অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়ে সমকালীন সমাজকে বিস্মিত করেছিলেন। ১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে অওধি (প্রাচীন অবধ অঞ্চলের ভাষা) ভাষায় রচিত জায়সীর মহাকাব্য ‘পদুমাবত’ ভারতীয় মুসলিম সাহিত্য-চিন্তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জায়সী চিতোরের রানি পদ্মাবতীর (যিনি লোককাহিনিতে পদ্মিনী নামেও পরিচিত) রূপক কাহিনীর আড়ালে মূলত সুফি দর্শনের ‘ইশকে হাকিকি’ (ঐশ্বরিক প্রেম)-কে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। কাব্যে চিতোররাজ রত্নসেনের পদ্মাবতীকে পাওয়ার যে ব্যাকুলতা, তা আসলে মানুষের আত্মার পরমাত্মাকে পাওয়ার চিরায়ত আধ্যাত্মিক আকুলতা। ভারতীয় রূপকথা, আবহমান জল-হাওয়া, লোকসংস্কৃতি আর হিন্দু পুরাণের রূপকগুলোকে যেভাবে জায়সী তাঁর কাব্যে ব্যবহার করেছেন, তা প্রমাণ করে এ দেশের লোক-মনস্তত্ত্বের সঙ্গে তাঁর সংযোগ কতটা নিবিড় ও গভীর ছিল।

তেমনি মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যেও এরকম মেলবন্ধন অত্যন্ত স্পষ্ট । শ্রীচৈতন্যের ভক্তি আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে বহু কবি চমৎকার রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদ রচনা করেছিলেন। কবি সৈয়দ মর্তুজা, আলী রাজা বা শেখ কবিরের পদাবলী আজও বাংলার ঘরে ঘরে গীত হয়। সৈয়দ মর্তুজার একটি বিখ্যাত পদের চরণ: ‘কহে সৈয়দ মর্তুজা কানুর চরণে।/ আমার পরাণ কানুর পিরীতি মরণে।’ এখানে ধর্মীয় পরিচয় ছাপিয়ে কবিমন হয়ে উঠেছে খাঁটি বাঙালি এবং আপাদমস্তক ভারতীয় ভাবধারার অনুসারী। আমির খসরু থেকে শুরু করে রসখান কিংবা বাংলার মুসলিম কবিদের এই যে সুদীর্ঘ পরম্পরা— তাঁরা প্রমাণ করেছেন যে, ভারতীয় মুসলমানদের ‘ভারতীয়তা’ কোনো আরোপিত রাজনৈতিক পরিচয় নয়। এটি তাঁদের রক্তে, তাঁদের সংগীতে, তাঁদের কাব্যে এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনায় মিশে থাকা এক গভীর অনুভূতি। তাঁরা স্বদেশের সংস্কৃতিকে কেবল গ্রহণই করেননি, বরং নিজেদের প্রতিভার ছোঁয়ায় তাকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য ও সমৃদ্ধ করে তুলেছেন।

সুফি ও ভক্তিবাদী আন্দোলনের আধ্যাত্মিক মেলবন্ধন ছিল ভারতীয় ভাবজগতের উৎকর্ষের চরম ও অনন্য নিদর্শন। ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক প্রেম এবং ঈশ্বরমুখী আকুলতার মাধ্যমে ভারতীয় চিন্তাধারা ও ইসলামি বিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল দুই আন্দোলনের হাত ধরে। উত্তর ও মধ্য ভারতে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি(র.) এবং হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া (র.)-র মতো চিশতিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া ধারার সুফি সন্তরা এবং বাংলায় হযরত শাহ জালাল (র.) কিংবা খান জাহান আলি (র.)-র মতো মহান সাধকেরা আধ্যাত্মিকতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। তৎকালীন সমাজের কঠোর বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যে ক্লিষ্ট, অবহেলিত সাধারণ মানুষকে তাঁরা পরম মমতায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন। খানকাহ্ বা লঙ্গরখানায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার একসাথে বসে অন্নগ্রহণের যে রীতি সুফি সন্তরা চালু করেছিলেন, তা ভারতের সামাজিক ইতিহাসের আরেক উজ্জ্বল নিদর্শন।

এই সমন্বয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত গভীর। সুফি দর্শনের মূল কথা হলো ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ (অস্তিত্বের একত্ববাদ), যার মূল সুরের সঙ্গে ভারতের প্রাচীন উপনিষদীয় ‘অদ্বৈতবাদ’ দর্শনের আশ্চর্য ও গভীর তাত্ত্বিক মিল রয়েছে। উভয় দর্শনই মনে করে— পরম সত্তা এক এবং সৃষ্টিজগতের সমস্ত বৈচিত্র্যের অন্তরালে একক ব্রহ্ম বা ঈশ্বরেরই প্রকাশ ঘটে। ভাবগত ঐক্যের কারণে ভক্তি ও সুফি মতধারা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। এই সমন্বয়ী ভাবনার শ্রেষ্ঠ প্রতীক ও প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিলেন সন্ত কবির, গুরু নানক এবং দাদু দয়ালের মতো সাধকেরা। পাশাপাশি, বহু কবি ও সাধক ভারতীয় ভক্তিভাবকে নিজেদের সৃষ্টির মাধ্যমে অমর করে রেখেছিলেন।

মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, হোসাইন আহমদ মদনী, উবাইদুল্লাহ সিন্ধি, আশফাকউল্লা খান

কেবল রাজনীতি, শাসন বা ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল মধ্যযুগীয় ভারতের সাংস্কৃতিক ও লৌকিক ভাবনাচিন্তা, তা প্রসারিত হয়েছিল প্রাত্যহিক জীবনের নান্দনিকতায়— সাহিত্য, সংগীত, শিল্প ও স্থাপত্যের আঙিনায়। তাঁদের হাত ধরেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক ভাষা ও সাহিত্যের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছিল। মধ্যযুগীয় বাংলার সুলতানদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারত এবং ভাগবত প্রথম বাংলায় অনূদিত হয়েছিল, যা বাংলা সাহিত্যকে নতুন উচ্চতা দেয়। মহাকবি আলাওল (পদ্মাবতী), সৈয়দ সুলতান (নবী বংশ) এবং মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলীতে শেখ কবির বা ওড়িশার সালবেগ-এর মতো কবিদের পদরচনা ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে ধর্মনিরপেক্ষ মেলবন্ধনের উদাহরণ। শিল্প ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রে এ যুগটি ছিল ইন্দো-ইসলামি স্থাপত্যশৈলীরও স্বর্ণযুগ। তাজমহল, ফতেহপুর সিক্রি বা দিল্লির লালকেল্লার মতো বিশ্ববিশ্রুত কীর্তিগুলোও প্রাচীন ভারতীয় (হিন্দু ও বৌদ্ধ) নির্মাণশৈলী এবং ইন্দো-ইসলামি রীতির অনন্য মিশ্রণ। চিত্রকলার ক্ষেত্রে বিকশিত হয়েছিল মুঘল চিত্রশৈলী। এ চিত্রকলা মধ্য এশিয়ার অনুকরণ ছেড়ে ভারতীয় প্রকৃতি, ঋতুচক্র, আবহাওয়া এবং ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিস্তৃত ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিল।

তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে মুঘল শাহজাদা দারা শিকোহ (১৬১৫–১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন ভারত ইতিহাসের সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি। তিনি গভীর অধ্যয়নের মাধ্যমে উপলব্ধি করেছিলেন যে, সুফি তত্ত্ব এবং ভারতীয় বেদান্ত দর্শনের লক্ষ্য এক ও অভিন্ন। এই সত্যকে প্রমাণ করতে তিনি ৫২টি উপনিষদের ফারসি অনুবাদ করেন, যার নাম দিয়েছিলেন ‘সির-ই-আকবর’ (মহা রহস্য)। তাঁর এই অনুবাদই পরবর্তীতে ল্যাটিন ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হয়ে বিশ্বমঞ্চে উপনিষদের মহিমাকে তুলে ধরে। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘মজমা-উল-বাহরাইন’ (দুই সমুদ্রের মিলন) নামক গ্রন্থ। এ গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের ভিন্নতা থাকলেও সুফিবাদ এবং বেদান্ত দর্শনের ভেতরের গভীর সত্যটি একই বিন্দুতে মিলিত হয়েছে। এটি ভারতীয় চিন্তাবিদদের সমন্বয়ী ও বহুত্ববাদী ভাবনার শ্রেষ্ঠ এবং ঐতিহাসিক দলিল।

আধুনিক যুগে এসে এই সমন্বয়ী সত্তা এক মহান দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় রূপান্তরিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সমাজ তাঁদের সর্বস্ব উজাড় করে দেয় এবং ‘ভারতীয়’ পরিচয়ে নিজেদের ধন্য ও গর্বিত মনে স্মরণ করতে থাকে। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, হোসাইন আহমদ মদনী, উবাইদুল্লাহ সিন্ধি, আশফাকউল্লা খান এবং সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুল গাফফার খান-এর মতো মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান ভারত ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।  জাতীয়তাবাদী নেতারা ব্রিটিশদের কুখ্যাত এবং বিভেদমূলক ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’-কে সম্পূর্ণ রূপে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের তীব্র বিরোধিতা করে অখণ্ড ভারতবর্ষকেই নিজেদের একমাত্র মাতৃভূমি হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁদের কাছে ভারতের বহুত্ববাদ ও অখণ্ডতা আপোসহীন এক বিশ্বাসের নাম। নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকে কীভাবে স্বদেশের স্বাধীনতা ও অখণ্ডতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা যায়, আধুনিক ভারতের ইতিহাসে তাঁরাই তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

♦–♦•♦–♦♦–♦•♦–♦

লেখক: অধ্যাপক, এস এস  কলেজ, হাইলাকান্দি, অসম

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!