Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
  • জানুয়ারি ১, ২০২৬

ঐতিহ্যের দীপ্তি আর বর্তমানের সংকল্পে শতবর্ষের উদযাপন বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়

শিবপ্রিয় দাশগুপ্ত
ঐতিহ্যের দীপ্তি আর বর্তমানের সংকল্পে শতবর্ষের উদযাপন বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় বিদ্যালয়

বিদ্যাঙ্গনের সিংহদুয়ার অতিক্রম করলেই, বাঁদিকে দাড়িয়ে বিশাল বটবৃক্ষ । শতাব্দী প্রাচীন সেই মহীরুহই মহানগরের শতবর্ষী শিক্ষাঙ্গনের ঐতিহ্য আর গৌরবকে যেন ব্যক্ত করছে নিজের অবয়বে । ১৯২৭, ৩ জানুয়ারি । তৎকালীন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড লিটন সূচনা করেছিলেন বালিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের । এরপর তরুর মতোই ক্রমশ প্রসারিত হয়েছে কলকাতার বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাঙ্গনের সাফল্য, বিশ্বজুড়ে স্কুলের ছাত্ররা তুলে ধরেছেন তাঁদের পাঠকৃতীকে ।

সরকারি এবং রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যাঙ্গনগুলির সবুজ যখন ক্রমশ মৃয়মান, তখন নিজেদের নিষ্ঠা আর স্বকীয়তা দিয়ে আলো ছড়ানোর প্রচেষ্টায় বদ্ধপরিকর বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় । ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের যে সমস্যা ক্রমশ রুগ্ন করছে বাংলামাধ্যমের পঠন-পাঠনকে । সেখানে নিজেদের শিক্ষামানের ঐতিহ্যকে আটুট রাখতে চান বর্তমান শিক্ষকমণ্ডলী

১৯২৮, প্রথম বছরেই স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়েছিল বালিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা । ক্রমশই সেই উত্তরণের অভিমুখ প্রসারিত হয়েছে । ২৬ এর শেষ হতেই শতবর্ষ স্পর্শ করবে, রাজ্যের এই উজ্জ্বল শিক্ষাঙ্গন । শুধুই মেধায় নয়, মননে, কৃষ্টিতে, সামাজিক দৃষ্টান্তে দৃঢ় স্বাক্ষর রেখেছে স্কুলের ছাত্র এবং শিক্ষকদের সম্মিলিত অভিযাত্রা । শতকপূরণের মুহূর্তেও সেই বর্ণময়তা, বৈচিত্রকেই ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত স্কুলের প্রাক্তনী এবং বর্তমান ।

রাজ্যের স্কুল শিক্ষায় যখন সরকারি এবং রাজ্যের সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যাঙ্গনগুলির সজীবতা যখন ক্রমশ মৃয়মান, তখন নিজেদের নিষ্ঠা আর স্বকীয়তা দিয়ে আলো ছড়ানোর প্রচেষ্টায় বদ্ধপরিকর বালিগঞ্জ রাষ্ট্রীয় উচ্চ বিদ্যালয় । ছাত্র-শিক্ষক অনুপাতের যে সমস্যা ক্রমশ রুগ্ন করছে বাংলামাধ্যমের পঠন-পাঠনকে । তার প্রতিফলনে, এই বিদ্যাঙ্গনের মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকের মেধাতালিকার ধার কিছুটা কমালেও শিক্ষামানের ঐতিহ্যকে আটুট রাখতে চান বর্তমান শিক্ষকমণ্ডলী । প্রাথমিক আর হাইস্কুল, দুই বিভাগ মিলিয়ে স্কুলে ৪১ জন শিক্ষক । স্কুলে এই মুহূর্তে কোনো প্রধানশিক্ষক নেই । অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার ইন চার্জ পদের গুরু দায়িত্বে রঞ্জিত গরাং ।

প্রসারিত মাঠ, ইন্দো-বৃটিশ স্থাপত্যের বিরাট জানালার প্রশস্ত ক্লাসঘর, দেয়াল চিত্র, ঐতিহাসিক হলঘর, স্কুল বারান্দা, পাঠাগার, ল্যাবরেটরি সমন্বিত বিদ্যাঙ্গনের যে কৌলিন্য, তাতে রুগ্ন পঠন-পাঠনের সংক্রমণ রুখতে দৃঢ় সংকল্পের প্রতিধ্বনি রঞ্জিতবাবু ও অন্যান্য সহকারি শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের কন্ঠে । বর্তমান ছাত্র আর অবিভাবকরাও আশাবাদী, আস্থাশীল । শতবর্ষ উদযাপনের প্রাক মুহুর্তে দাঁড়িয়ে, স্কুলের শিক্ষা সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে রঞ্জিতবাবু বলেছেন, তাঁর ৩৩ বছরের শিক্ষক জীবনের নিরিখে তিনি জানিয়েছেন, নব্বই এর দশকে সরকারি বা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত স্কুলই ছিল রাজ্যের সেরা বিদ্যাঙ্গন । মেধার ভিত্তিতে স্কুলে পড়তে আসতো ৯০ শতাংশ ভালো ছাত্র, ১০ শতাংশ সাধারণ ছাত্র ফার্স্ট ডিভিশন পেতো । মেধার ঔজ্জ্বল্য এখন খানিকটা কমলেও, আলো নিভে যায়নি । স্কুলের গন্ডি অতিক্রম করে, এখনো বিশ্বঅঙ্গনে দ্যুতি ছড়াচ্ছে ছাত্রদের প্রতিভা । প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি মিলিয়ে ছাত্র সংখ্যা ১২৬৫ জন । ৭৫ শতাংশের বেশি ছাত্র উচ্চমাধ্যমিক এবং মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়ে পাশ করে । উচ্চমাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান বিভাগে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াবার ব্যবস্থা আছে । সেখানেও শহরের অনেক ইংরেজি মাধ্যমের ছাত্ররা এসে ভর্তি হয় । রঞ্জিতবাবু জানিয়েছেন, তাঁদের স্কুলে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব বিষয়ের জন্য শিক্ষক আছেন । প্রাক প্রাথমিকে শিক্ষক সংখ্যার কিছুটা ঘাটতি আছে, সেটা পূরণের চেষ্টা চলছে । ১০০ বছরের শিক্ষা ঐতিহ্যে যাতে আঁধার না আসে, তা নিয়ে প্রশাসনিক সক্রিয়তার দাবিও করেছেন পড়ুয়াদের অবিভাবক এবং স্কুলের প্রাক্তনীরা ।

২০২৭ এর তিন জানুয়ারি, শতবর্ষে পদার্পণ করবে এই বিদ্যাঙ্গন । এক শতাব্দী ধরে নিরবচ্ছিন্ন পথচলায় বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধ নির্মাণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র । সত্যজিত রায়, ঋত্বিক ঘটক, শম্ভু মিত্র, রাহুলদেব বর্মণ, ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী, কবি নবারুণ ভট্টাচার্য এই স্কুলের প্রাক্তনী হিসেবে বিশ্বঅঙ্গনে যে দৃষ্টান্ত গড়েছেন, সেই ধারাবাহিকতা অটুট রাখছে পরবর্তী প্রজন্মও

২০২৭ এর তিন জানুয়ারি, শতবর্ষে পদার্পণ করবে এই বিদ্যাঙ্গন । এক শতাব্দী ধরে নিরবচ্ছিন্ন পথচলায় বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, সংস্কৃতি এবং মানবিক মূল্যবোধ নির্মাণেরও এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র । সত্যজিত রায়, ঋত্বিক ঘটক, শম্ভু মিত্র, রাহুলদেব বর্মণ, ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী, ভারতের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অন্যতম স্থপতি সুখময় চক্রবর্তী, কবি নবারুণ ভট্টাচার্য এই স্কুলের প্রাক্তনী হিসেবে বিশ্বঅঙ্গনে যে দৃষ্টান্ত গড়েছেন, সেই ধারাবাহিকতা অটুট রেখেছেন চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্র, পরমাণু বিজ্ঞানী শেখর বসু, শিল্পী অভিরূপ গুহঠাকুরতা, রূপঙ্কর বাগচী, সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায়, গৌতম ভট্টাচার্য, সব্যসাচী সরকার, অভিনেতা কৃষ্ণ কিশোর মুখার্জি, রজতাভ দত্ত সহ বহু বিশিষ্ট । বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, বিচার, প্রশাসন, চিকিৎসা এবং প্রকৌশল বিভাগের বিভিন্ন অঙ্গনেও সেই ঔজ্জ্বল্য প্রতীয়মান । পরবর্তী প্রজন্মও এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে ।

শতবর্ষ উদযাপন প্রসঙ্গে স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার ইন চার্জ রঞ্জিত গরাং জানিয়েছেন, ২০২৬ এর ৩ জানুয়ারি থেকে ২০২৭ এর শুরু পর্যন্ত প্রাক শতবর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠান চলবে । অনুষ্ঠানের সূচনা হবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা দিয়ে । তিন জানুয়ারি প্রভাতফেরি শুরু হবে সকাল সাড়ে সাতটায় । বহুবর্ণে শোভিত পদযাত্রায় ছাত্র, শিক্ষক উপস্থিত থাকবেন । থাকবেন রাজ্যের প্রাক্তন দুই শীর্ষ আমলা, স্কুলের দুই উজ্জ্বল ছাত্র অশোকমোহন চক্রবর্তী ও প্রসাদরঞ্জন রায় । গানের দলের নেতৃত্বে থাকবেন শিক্ষাঙ্গনের প্রাক্তনী শিল্পী সৈকত মিত্র, বর্তমান ছাত্র ঈশান রায় । ১২০০ ছাত্র এই মিছিলে হাঁটবে । শোভাযাত্রাটি শিক্ষাঙ্গন পেড়িয়ে পদ্মপুকুর, শরৎ বসু রোড, হাজরা রোড হয়ে ম্যাডক্স স্কোয়ারের পাশ দিয়ে স্কুলে ফিরে আসবে । ৩.৩ কিলোমিটার যাত্রাপথে ছাত্রদের হাতে থাকবে ১০০ ফেস্টু়ন । সরস্বতী পুজোর দিন, ২৩ জানুয়ারি স্কুলে একটি বড়ো প্রদর্শনী হবে বিজ্ঞান ও কলা বিষয়কে কেন্দ্র করে । প্রতি বছরের মতো ওইদিন স্কুলে একটি সংগীতানুষ্ঠান হবে । শতবর্ষ উদযাপনে, স্কুল প্রাঙ্গনের প্রাচীন বটবৃক্ষের পাশে তৈরি হচ্ছে মঞ্চ ।সেখানে সংগীতানুষ্ঠানে যোগ দেবে বর্তমান ছাত্র এবং প্রাক্তনীরা । বছর জুড়েই চলবে আন্তঃস্কুল ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, সেপ্টেম্বর মাসে হবে পুরস্কার বিতরণ । যাঁরা একসময় ছিলেন এই স্কুলের ছাত্র, প্রাক্তন শিক্ষক, তাঁদেরকেও শতবর্ষের উদযাপনে সামিল করার পরিকল্পনা রয়েছে ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!