Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ১৬, ২০২৬

সার-নিরাপত্তায় নীরব প্রস্তুতি ! ‘আত্মনির্ভর’ ইউরিয়া নীতিতে অনুমোদন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার, আমদানির নতুন পথের খোঁজ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সার-নিরাপত্তায় নীরব প্রস্তুতি ! ‘আত্মনির্ভর’ ইউরিয়া নীতিতে অনুমোদন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার, আমদানির নতুন পথের খোঁজ

কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে চাষাবাদের ক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ‘অপরিবর্তনীয়’। ভারত এ মুহূর্তে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার-ব্যবহারকারী দেশ। ইউরিয়া ও ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) আমদানির ক্ষেত্রেও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাজার। দেশের মোট ডিএপি চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। পাশাপাশি ফসফেট শিলাফসফরিক অ্যাসিড এবং পটাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ক্ষেত্রেও বিদেশি উৎসের উপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। এদিকে দেশে বছরে প্রায় ৩ কোটি টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়। কিন্তু চাহিদা প্রায় ৪ কোটি টন। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি টন ইউরিয়া বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ীইউরিয়ার চাহিদা বছরে প্রায় ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতার আবহে সার আমদানি ক্ষেত্রে প্রবল সঙ্কট দেখা দিয়েছে। খরচও বাড়ছে উত্তরোত্তর। যা কৃষি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে, আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ শৃঙ্খলের চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রয়োজন ‘আত্মনির্ভরতা’। আর সে লক্ষ্যেই বড়ো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র।

বুধবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে ন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পলিসি ফর ইউরিয়া-২০২৬’ (এনআইপিইউ-২০২৬)। নতুন নীতির আওতায় দেশে ৮ থেকে ৯টি গ্যাসভিত্তিক ইউরিয়া কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছেযেগুলির সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা হবে বছরে ১ কোটি টন। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ সার সরবরাহ ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্র। বিভিন্ন রাজ্যে সময়মতো সার পৌঁছে দেওয়ামজুত ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং কৃষকদের কাছে সারের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বপন মরসুমে যাতে কোনো ধরনের ঘাটতি না তৈরি হয়সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেন, ‘দেশের ইউরিয়া উৎপাদনে যে ঘাটতি রয়েছেতা দূর করাই এ নীতির মূল লক্ষ্য। দীর্ঘমেয়াদে সার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির পথও প্রশস্ত হবে।’ ২০১২ সালের বিনিয়োগ নীতির সংশোধিত রূপ হিসেবে আনা হয়েছে এনআইপিইউ-২০২৬। নতুন নীতিতে স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল ব্যয়কে পৃথক করা হয়েছেযাতে মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা বাড়ে। পাশাপাশি নতুন প্রকল্পগুলির জন্য ১২ থেকে ১৬ শতাংশ রিটার্ন অন ইকুইটি’ (আরওই)-র ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা থেকে প্রকল্পগুলিকে সুরক্ষা দিতে  বছর পর স্থায়ী ব্যয়কে তৎকালীন বিনিময় হার অনুযায়ী ভারতীয় মুদ্রায় রূপান্তরের সুযোগও রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের দাবি, নয়া কাঠামোর ফলে আগের নীতির তুলনায় প্রতিটি নতুন কারখানার ক্ষেত্রে ২৫০ কোটিরও বেশি টাকা সাশ্রয় হবে।

গত এক দশকে ২০১২ সালের নীতির আওতায় দেশে মোট ৬টি নতুন ইউরিয়া কারখানা গড়ে উঠেছে। তার মধ্যে চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এবং দুটি বেসরকারি ক্ষেত্রের উদ্যোগে। কেন্দ্রের দাবিএ প্রকল্পগুলির ফলে ইউরিয়া আমদানির উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমেছে। নতুন ৮ থেকে ৯টি কারখানা চালু হলে আমদানির প্রয়োজন প্রায় সম্পূর্ণ ভাবে শেষ হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে দেশে ৩৩টি ইউরিয়া উৎপাদনকারী ইউনিট চালু রয়েছে। তাদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ২৬৯.৪২ লক্ষ মেট্রিক টন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে সে সক্ষমতা যথেষ্ট নয় বলেই মনে করছে কেন্দ্র। অশ্বিনী বৈষ্ণব জানান, কেন্দ্রীয় সার মন্ত্রকের কাছে ইতিমধ্যেই একাধিক নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব জমা পড়েছে। সে কারণেই নতুন বিনিয়োগ নীতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। তিনি আরও বলেনসরকারিবেসরকারি এবং সমবায়— সব ক্ষেত্রের উদ্যোগের জন্য একই ধরনের নিয়ম বজায় থাকবে।

সারের আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করাবিকল্প পরিবহণ-পথ খুঁজে বের করার কাজে হাত দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বা ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ফলে যাতে দেশের সার সরবরাহ ব্যাহত না হয়তার জন্য একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের বক্তব্যকাঁচামালমধ্যবর্তী উপাদান এবং প্রস্তুত সারের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সর্বোত্তম বিকল্প আমদানি-পথ ও সরবরাহ উৎস খুঁজে দেখা হচ্ছে। এ থেকে স্পষ্টসার আমদানির ক্ষেত্রে সীমিত কয়েকটি দেশ বা নির্দিষ্ট সামুদ্রিক রুটের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে কেন্দ্র। কারণ আন্তর্জাতিক সংঘাত বা বাণিজ্যিক অস্থিরতার ফলে ওই সব রুটে বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের কৃষিক্ষেত্রে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশে প্রায় ১ কোটি ৯০ লক্ষ টনের কিছু বেশি সার মজুত ছিল। অন্যদিকেখরিফ মরসুমে সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লক্ষ টন। ফলে চাহিদা মেটাতে আমদানির উপর নির্ভরতা এখনো যথেষ্ট। সে কারণেই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ধাক্কা সামলাতে কেন্দ্রের নীরব প্রস্তুতি ভবিষ্যতের কৃষি নিরাপত্তার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!